‘আধুনিক ক্রীতদাস’ প্রথা ‘কাফালা’ রদ! রেহাই পাবেন লক্ষাধিক ভারতীয়, কীভাবে অত্যাচার চলত বিদেশে?
পেটের দায়ে ও সংসার চালাতে মানুষ কতকিছুইনা করে থাকেন। কেই নিজের এলাকায়, নিজের দেশে কাজ করেন আবার কেউ বিদেশে পাড়ি দেন। বিশেষ করে যারা শ্রমিকের কাজ করেন তাঁদের বিদেশের মাটিতে বহু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কারণ, সব দেশের শ্রম আইন সমান নয়। যে কারণে বিভিন্নভাবে নিপীড়ন এবং অত্যাচারের শিকার হতে হয় বিদেশি শ্রমিকদের। তাই এই অত্যাচার থেকে রেহাই দিতে ৫০ বছরের বেশি পুরনো 'কাফালা' ব্যবস্থার অবলুপ্তি ঘটাল সৌদি আরব।

অবশেষে সৌদি আরবে আনুষ্ঠানিক ভাবে রদ হল 'কাফালা' ব্যবস্থার। এই ব্যবস্থায় চাকরি দেওয়ার নামে বাইরের দেশের শ্রমিকদের বিভিন্ন নিয়মকানুনের বেড়া-জালে বেঁধে ফেলা হত। শুধু এখানেই শেষ নয়, এই নিয়মকানুনে একবার বাঁধা পড়লে সেখান থেকে সহজে বেরোনোরও উপায় থাকত না। বহু ক্ষেত্রে অত্যাচারিত হতে হতো শ্রমিকদের। তাই এই 'কাফালা'-কে 'আধুনিক ক্রীতদাসপ্রথা' বলেও বর্ণনা করেছেন বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। এই আইনের অবলুপ্তি-তে আনুমানিক ১.৩ কোটি পরিযায়ী শ্রমিক 'দাসত্ব' থেকে মুক্তি পেতে চলেছেন। যার মধ্যে অন্তত ২৩ লক্ষ ভারতীয় উপকৃত হবেন বলেই অনুমান করা হচ্ছে। জর্ডন, লেবানন, বাহারিন, কুয়েত, ওমান, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতেও যুগ যুগ ধরে এই ক্রীতদাসপ্রথা চালু রয়েছে।
'কাফালা' ব্যবস্থা কী?
কাফালা ব্যবস্থায় ওই দেশের সরকার স্থানীয় কোনও ব্যক্তি বা কোম্পানিকে বাইরের দেশ থেকে শ্রমিক নিয়ে আসার পারমিট দেয়। আর এরা মানুষদের ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার প্রলোভন দেখিয়ে বাইরে থেকে নিজের খরচায় তাঁদের নিয়ে আসে। যারা নিয়ে আসেন তাদের স্পনসর বা মালিক বলা হয়। একবার তাঁদের কথায় চলে আসলে তাঁদের হেফাজতেই থাকতে হয় শ্রমিকদের। নার্স, বাড়ির পরিচারক বা পরিচারিকার কাজ, কনস্ট্রাকশন(নির্মাণ), তেলের খনি এই ধরণের বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত করা হয়। তবে এই সব মানুষদের পাসপোর্ট-ভিসা জমা রাখতে হয় স্পনসরের কাছে। যার ফলে কাজে ইচ্ছে না থাকলে পালিয়ে আসা, সেই দেশে স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরার অধিকারও থাকেনা কারোর কাছে। খিদে পেটে হাড় ভাঙা খাটুনি, কোনও কিছুর প্রতিবাদ করলে মারধর, অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা, মানসিক নিপীড়ন, সব ধরণের অত্যাচার চলে শ্রমিকদের উপর।
২০২২ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপের আগে কাফালা ব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী মানুষের কাছে দৃষ্টি-আকর্ষণ করে। কারণ, স্টেডিয়াম এবং বাইরের কাঠামো নির্মাণের সময় অত্যন্ত কঠোর কর্মপরিবেশ সহ্য করতে না পেরে হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিক, বিশেষ করে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা শ্রমিকরা প্রাণ হারান। তারপর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন।
'কাফালা'র অবলুপ্তিতে কি কি সুবিধা পাবেন?
সৌদি আরবে বর্তমানে আনুমানিক ১.৩৪ কোটি বিদেশী শ্রমিক রয়েছেন। সেই রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় ৪২ শতাংশ। কারণ নির্মাণ কাজ, কৃষিকাজ, গৃহস্থালির কাজ এবং আরও অনেক কিছুর জন্য অভিবাসীদের উপর নির্ভরশীল হতে হয় এই দেশের মানুষদের। আর এই ১.৩৪ কোটি শ্রমিকের মধ্যে বেশিরভাগই বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং ফিলিপাইনের। চলুন জেনে নেওয়া যাক কোন কোন সুবিধা পেতে পারেন-
১. শ্রমিকরা যদি খারাপ কাজের পরিবেশ বা খারাপ আচরণের সম্মুখীন হয়, তাহলে তারা আরও সহজেই চাকরি পরিবর্তন করতে সক্ষম হবেন কারও অনুমতি ছাড়া।
২. এক্সিট ভিসা এবং ট্রান্সফারের উপর নিয়োগকর্তার নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।
৩. পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত বা অনাদায়ী মজুরির ঘটনা হ্রাস পেতে পারে।
৪. কাজের উপর ভিত্তি করে কোম্পানিগুলি আরও প্রতিযোগিতামূলক বেতন এবং কাজের পরিবেশ ভালো তৈরি করতে পারে।
৫. চুক্তি সম্পন্ন করার পর অথবা যথাযথ নোটিশ দেওয়ার পর নিয়োগকর্তার অনুমোদন ছাড়াই চাকরি পরিবর্তন করতে পারবেন।












Click it and Unblock the Notifications