সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি: বিবিসি বাংলার জরিপে সপ্তম স্থানে জগদীশ চন্দ্র বসু- ভারতীয় উপমহাদেশে বিজ্ঞান চর্চ্চার জনক

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি: বিবিসি বাংলার জরিপে সপ্তম স্থানে জগদীশ চন্দ্র বসু- ভারতীয় উপমহাদেশে বিজ্ঞান চর্চ্চার জনক

দু'হাজার চার সালে বিবিসি বাংলা একটি 'শ্রোতা জরিপ'-এর আয়োজন করে। বিষয়টি ছিলো - সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কে? তিরিশ দিনের ওপর চালানো জরিপে শ্রোতাদের ভোটে নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ ২০জনের জীবন নিয়ে বিবিসি বাংলায় বেতার অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয় ২০০৪-এর ২৬শে মার্চ থেকে ১৫ই এপ্রিল পর্যন্ত।

বিবিসি বাংলার সেই জরিপে শ্রোতাদের মনোনীত শীর্ষ কুড়িজন বাঙালির তালিকায় সপ্তম স্থানে আসেন জগদীশ চন্দ্র বসু। আজ তাঁর জীবন-কথা।

বৈজ্ঞানিক জগদীশ চন্দ্র বসুর অবদান মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তিনি একাধারে পদার্থবিজ্ঞান এবং উদ্ভিদবিদ্যায় অসামান্য অবদান রেখে নিজের নাম শুধু বাঙালির ইতিহাসে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেও স্বর্ণাক্ষরে লিখে গিয়েছেন।

বিজ্ঞানের একজন অমর প্রতিভা জগদীশ চন্দ্র বসু প্রথম মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির ওপর সফল গবেষণা করেন যার ফলশ্রুতিতে আবিষ্কৃত হয় রেডিও।

তাঁর উল্লেখযেযাগ্য আবিষ্কারের মধ্যে রয়েছে মাইক্রোওয়েভ রিসিভার ও ট্রান্সমিটারের উন্নয়ন, এবং ক্রেসকোগ্রাফ যন্ত্র যা দিয়ে গাছের বৃদ্ধি নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা যায় । উদ্ভিদের জীবনচক্র তিনি প্রমাণ করেছিলেন।

জগদীশ চন্দ্র বসুর জন্ম ১৮৫৮ সালের ৩০শে নভেম্বর ময়মনসিংহে। তাঁর পরিবারের আদি বাসস্থান ছিল ঢাকা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে বিক্রমপুরের রাঢ়িখালে।

তিনি তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন ফরিদপুরের একটি স্কুল থেকে। এরপর ১১ বছর বয়সে তিনি কলকাতা চলে যান এবং সেখানে সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ১৮৭৫ সালে এন্ট্রাস পাশ করেন।

বিজ্ঞানের স্নাতক হন তিনি ১৮৭৯ সালে এবং এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যান ইংল্যাণ্ডে। ইংল্যাণ্ডের কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বিষয়ে বি.এ. পাশ করেন। ১৮৮৪ সালে লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এস.সি. ডিগ্রি লাভ করেন।

ইংল্যাণ্ড থেকে স্বদেশে ফেরার পর তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন।

বৈদ্যুতিক তরঙ্গের ওপর তাঁর গবেষণার কাজ তিনি শুরু করেন ১৮৯৪ সালে। এর ফলশ্রুতিতে ১৮৯৬ সালে লণ্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টর অফ সায়েন্স উপাধি পান।

জগদীশ চন্দ্র বসুকে বলা হয় ভারতীয় উপমহাদেশে বিজ্ঞান চর্চ্চার জনক। বাংলাদেশের উদ্ভিদ বিজ্ঞানী দ্বিজেন শর্মা মনে করেন বেতার যন্ত্রের প্রথম উদ্ভাবক হিসাবে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

"যদিও বেতারের আবিষ্কারক হিসাবে বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন মার্কনি, কারণ জগদীশ বসু এটার আবিষ্কারকে নিজের নামে পেটেন্ট করেননি। এ কারণেই এই আবিষ্কারের জন্য তাঁর দাবি স্বীকৃত হয়নি," বলেন দ্বিজেন শর্মা।

বেতার কাজ করে বৈদ্যুতিক চুম্বক তরঙ্গের ভিত্তিতে, যে তরঙ্গ নিয়ে জগদীশ বসু গবেষণা করেছিলেন। যদিও তাঁর আগে এবং তাঁর সময়ে এই তরঙ্গ নিয়ে গবেষণার কাজ করছিলেন মার্কনিসহ বিভিন্ন দেশে একাধিক বিজ্ঞানী। কিন্তু কলকাতার বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান বসু বিজ্ঞান মন্দিরের গবেষক ড. দিবাকর সেন বিবিসি বাংলাকে বলেন জগদীশ বসুই প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গ বা মাইক্রোওয়েভ।

"মাইক্রোওয়েভ আবিষ্কারের ব্যাপারটা ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আজকের দিনে মহাকাশ বিজ্ঞানে, চিকিৎসা বিজ্ঞানে, টেলিভিশন সম্প্রচারে এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতিতে মাইক্রোওয়েভ কাজে লাগে। কম্যুনিকেশনের (যোগাযোগ) ক্ষেত্রে আরও বিশেষ করে এই তরঙ্গ কাজে লাগে।"

"দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় যখন সাবমেরিন এলো, রাডার এলো, তখন মানুষ বুঝতে পারল এই মাইক্রোওয়েভের গুরুত্ব কতখানি। তিনি যখন এই আবিষ্কার করেছিলেন, তখন তার কোন ব্যবহারিক প্রয়োগ ছিল না। মার্কনি এবং তদানীন্তন বিজ্ঞানীরা যোগাযোগের জন্য যে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ ব্যবহার করেছিলেন তা তারা করেছিলেন লঙ্গার ওয়েভ (দীর্ঘ তরঙ্গ) ব্যবহার করে- মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করে নয়।"

অর্থাৎ জগদীশ বসুর আবিষ্কার ছিল অতি ক্ষুদ্র বেতার তরঙ্গ, যার থেকে তৈরি হয়েছে আজকের মাইক্রোওয়েভ, যা পরবর্তীতে 'সলিড স্টেট ফিজিক্স'-এর বিকাশে সাহায্য করেছিল। পরে তিনি পদার্থ বিজ্ঞানের আরও গুরুত্বপূর্ণ নানা আবিষ্কার করেন যেমন 'ডিটেক্টর', 'রিসিভার' ইত্যাদি।

"চৌকো মুখ ফানেল আকৃতির একটি হর্ন অ্যান্টেনা তিনি আবিষ্কার করেছিলেন, যা আজ বিশ্বে যুদ্ধকালীন যোগাযোগ, বা রাডার যোগাযোগের জন্য অপরিহার্য। এছাড়াও অনেক ধরনের রিসিভার উনি তৈরি করেছিলেন যা আজও বহুল ব্যবহৃত," বলেছেন ড. দিবাকর সেন।

আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞানের অত্যন্ত দুরূহ বিষয়ে তাঁর আবিষ্কার নিয়ে ইংল্যাণ্ডে বক্তৃতা দিয়ে বিশ্ব-খ্যাত বহু বিজ্ঞানীকে চমকে দিয়েছিলেন জগদীশ চন্দ্র বসু। লণ্ডনের একটি দৈনিক পত্রিকা ডেইলি এক্সপ্রেস তাঁকে গ্যালিলিও-নিউটনের সমকক্ষ বিজ্ঞানীর স্বীকৃতি দিয়েছিল।

{image-"গাছকে আঘাত করলে গাছ কীভাবে সাড়া দেয়, সেটা জগদীশ বসু যন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ করে দেখান, যা ছিল উদ্ভিদ বিজ্ঞানের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা আবিষ্কার।", Source: ড. দ্বিজেন শর্মা, Source description: উদ্ভিদ বিজ্ঞানী , Image: এক ব্যক্তি কুঠার দিয়ে গাছ কাটছে। bengali.oneindia.com}

কিন্তু পদার্থ বিজ্ঞানে এমন অসাধারণ অবদান সত্ত্বেও জগদীশ চন্দ্র বসু সারা বিশ্বে খ্যাতিলাভ করেছিলেন উদ্ভিদবিজ্ঞানী হিসাবে।

ড. দিবাকর সেন বলেন জগদীশ বসু আদৌ উদ্ভিদবিজ্ঞানী ছিলেন না। কিন্তু ওয়্যারলেস রিসিভিং ইন্সট্রুমেন্ট (তার-বিহীন গ্রাহক যন্ত্র) নিয়ে কাজ করতে করতে তিনি একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলেন।

"তিনি দেখলেন একটা টিনের তারকে মোচড় দিলে তার ভেতরে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মাত্রায় যেমন বিদ্যুত তরঙ্গ তৈরি হয়, তেমনই আঘাত করলে গাছের ভেতরেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, একই ঘটনা ঘটে প্রাণী দেহেও। উনি তখন প্রশ্ন তুললেন তাহলে জীবনের সংজ্ঞা কী হবে? এবং এখান থেকেই জন্ম নিল আধুনিক জৈব-পদার্থ বিজ্ঞান।"

জনপ্রিয় ধারণা হল তিনি সবার আগে আবিষ্কার করেছিলেন গাছপালার প্রাণ আছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানী দ্বিজেন শর্মা বলেছেন অতি প্রাচীন কাল থেকে ভারতবর্ষের মানুষ বিশ্বাস করতো গাছ একটা জীবন্ত স্বত্ত্বা। একই বিশ্বাস ছিল অ্যারিস্টটলেরও। তাহলে জগদীশ বসুর আবিষ্কারে নতুনত্ব কোথায় ছিল?

"গাছের যে প্রাণ আছে তার কিছু স্থূল লক্ষ্মণ সম্পর্কে মানুষ জানত, যেমন গাছ জন্ম নেয়, বড় হয়, একদিন মরেও যায়। কিন্তু বাইরের কোন উদ্দীপক বস্তু ব্যবহার করলে বা গাছকে আঘাত করলে গাছ কীভাবে সাড়া দেয়, সেটা জগদীশ বসু যন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ করে দেখান, যা উদ্ভিদ বিজ্ঞানের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা আবিষ্কার," বলেন ড. শর্মা।

গাছ যে বাইরের আঘাতে বা তাকে উত্তেজিত করলে তাতে সাড়া দেয় সেটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করার জন্য জগদীশ বসু সূক্ষ্ম সব যন্ত্র্র সাধারণ কারিগর দিয়ে তৈরি করেছিলেন যেগুলি কলকাতার বসু বিজ্ঞান মন্দিরে সংরক্ষিত রয়েছে।

এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেছিলেন তিনি যা দিয়ে দেখিয়েছিলেন একটা গাছ এক সেকেণ্ডে কতটা বাড়ে। তাঁর আবিষ্কৃত 'ক্রেসকোগ্রাফ' যন্ত্র উদ্ভিদদেহের সামান্য সাড়াকে লক্ষগুণ বৃদ্ধি করে প্রদর্শনের ক্ষমতা রাখত।

তাঁর গবেষণা জড় ও জীব জগত সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দিয়েছিল।

"তিনি বলেছিলেন জড় এবং জীব জগতের মধ্যে পার্থক্য খুবই সামান্য। এতই সামান্য যেখানে জড় পদার্থ জীবের মত আবার জীব জড় পদার্থের মত ব্যবহার করে," বলেছেন ড. দ্বিজেন শর্মা।

জগদীশ বসু ১৮৯৯ থেকে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত জীব ও জড় বস্তুর প্রতিক্রিয়ার ওপর গবেষণার কাজ করেছিলেন।

গবেষক ড. দিবাকর সেন বলেন জগদীশ চন্দ্র বসু ভারতে বিজ্ঞান চর্চ্চা ও গবেষণার প্রসার ঘটাতে কলকাতায় ১৯১৭ সালে যে বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেটি সম্ভবত ভারতের অন্যতম সবচেয়ে প্রাচীন বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র।

এই কেন্দ্র ভারতের বহু নামকরা বিজ্ঞানীকে গবেষণার কাজে অনুপ্রাণিত করেছিল যেমন সিভি রামান, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বোস, প্রফুল্ল চন্দ্র রায় প্রমুখ।

ড. দ্বিজেন শর্মা বলেন জগদীশ চন্দ্র বসু সবার আগে বিজ্ঞান বিষয়ে বাংলায় লিখেছিলেন, যা এখনও বাংলা ভাষায় লেখা আদর্শ বিজ্ঞান বিষয়ক বই হিসাবে বিবেচিত। তার মতে তাঁর 'অব্যক্ত' গ্রন্থের লেখাগুলো "বিজ্ঞান এবং সাহিত্যের একটি অপূর্ব সংশ্লেষ"।

"আমার ধারণায় বিজ্ঞান বিষয়ে বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয় গ্রন্থ তাঁর এই বই।"

বিজ্ঞানও যে একটা সংস্কৃতি সেটা প্রমাণ করে গেছেন জগদীশ চন্দ্র বসু, বলেছেন ড. দ্বিজেন শর্মা, "তিনি আমাদের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। বিজ্ঞানে তাঁর অবদান সেই অর্থে একটা বিরাট মূল্যবান সাংস্কৃতিক অবদান।"

জগদীশ চন্দ্র বসু মারা যান কলকাতায় ১৯৩৭ সালের ২৩শে নভেম্বর।

মুন্সীগঞ্জের রাঢ়িখালে তাঁর পৈত্রিক বাড়িটি ১৯৯৪ সালে একটি স্কুল ও কলেজে পরিণত করা হয়, যার বর্তমান নাম সার জগদীশ চন্দ্র বসু ইন্সটিটিউশন ও কলেজ। কলেজ ভবনটির ঠিক মাঝখানে অবস্থিত একতলা বাড়িটি হচ্ছে জগদীশ চন্দ্র বসুর আদি বাড়ি। বাড়িটিতে জগদীশ চন্দ্র বসুর স্মৃতি রক্ষার্থে তাঁর ছবি, তাঁর লেখা চিঠি ইত্যাদি দিয়ে একটি সংরক্ষণাগার তৈরি করা হয়েছে।


সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকা

BBC
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+