মার্কিন রক্তচক্ষুর ভয়ে ইরান থেকে আর তেল কিনবে না ভারত: কী হল নরেন্দ্র মোদীর সাহসী বিদেশনীতির?
গত মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল, ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান জানান যে নয়াদিল্লি এবার থেকে ইরানের বদলে অন্য দেশ থেকে তেল আমদানি করবে।
গত মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল, ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান জানান যে নয়াদিল্লি এবার থেকে ইরানের বদলে অন্য দেশ থেকে তেল আমদানি করবে। ভারতের পক্ষ থেকে এই অবস্থান জানানো হয় ইরান থেকে তেল আমদানি করার ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেতাবনি আসার পর। সে-দেশের ডোনাল্ড প্রশাসন তাদের পয়লা নম্বর দুশমন ইরান থেকে তেল আমদানি করার ব্যাপারে কোনও দেশকে আর ছাড় দিতে রাজি নয়, এমনকী, বন্ধু দেশ ভারতকেও নয়।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের অন্যতম বড় মক্কেল ভারত এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। আর যেহেতু এক বছর আগেও ভারত জোর গলায় দাবি করেছিল যে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার সে তোয়াক্কা করে না, তাই এখন এই উল্টো সুর অনেক পর্যবেক্ষককেই বিস্মিত করেছে। প্রশ্ন এটাও উঠছে যে: এবার কি তবে ওয়াশিংটনের লাল চক্ষুর ভয়ে পুরোনো মিত্র রাশিয়ার থেকে এস-৪০০ সামরিক অস্ত্র কেনার ব্যাপারেও পিছিয়ে যাবে ভারত?
গতবছর মে মাসে ইরানের সঙ্গে বহুপাক্ষিক পরমাণু চুক্তি থেকে পিছিয়ে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাঁর পূর্বসূরি বারাক ওবামা প্রশাসনের নীতিকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে তাদের পরমাণু পরিকল্পনা নিয়ে আক্রমণে যায়। পরে নভেম্বর মাসে কয়েকটি দেশকে ইরান থেকে তেল আমদানিতে সাময়িক ছাড়পত্র দিলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবারে সে বিষয়েও কড়া অন্যস্থান নিয়েছে।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আমরা মানি না, বলেছিল ভারত
ইরানের উপরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লাগু হওয়ার পরে ভারত অবশ্য তাকে বিশেষ আমল দিতে রাজি হয়নি। অন্তত সামনাসামনি। দেশের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেন যে ভারত শুধুমাত্র রাষ্ট্রসংঘের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলবে, কোনও দেশের একবগ্গা নীতি নয়। প্রধানও গতবছরের শেষের দিকে বলেন যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারত ইরান থেকে তেল কিনবে; এমনকী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও তিনি এর কৃতিত্ব দেন। ভারত এও ঠিক করে যে ইরান থেকে তারা তেল ডলার-এর বদলে টাকা দিয়ে কিনবে। ইরান তাতে রাজিও হয়।
কিন্তু এখন ডিগবাজি খেয়ে ভারত প্রমাণ করল যে যতটা তারা গর্জন করেছিল, ততটা বর্ষণ দেখা গেল না। আর ভারতের এই নীতিগত অবস্থান অনেক দিক থেকেই তার বিদেশনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রভাবিত হতে পারে ভারতের চাবাহার কূটনীতি
যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে বলা হয়েছে যে ইরান থেকে তেল আমদানিতে ছাড় না দেওয়ার বিষয়টির জন্যে ভারত ও ইরানের মধ্যে ভূ-কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চাবাহার বন্দর প্রকল্প প্রভাবিত হবে না। কিন্তু মার্কিনিরা যাই বলুক না কেন, ইরানের সঙ্গে তাদের পুরোনো তেল কূটনীতি ব্যাহত হওয়ার পরে তেহরান ও নয়াদিল্লির মধ্যে সম্পর্ক কতটা স্বাভাবিক থাকবে তা বলা মুশকিল। আর চাবাহার নিয়ে ভারত, ইরান এবং আফগানিস্তানকে ঘিরে যে ত্রিমুখী সম্ভাবনা তৈরী হয়েছিল দক্ষিণ-মধ্য এশিয়ায়, বিশেষ করে পাকিস্তান ও চিনের জোটের বিরুদ্ধে, তাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে সেখানে যান এবং স্বীকার করে নেন যে অতীতে সন্ত্রাসবাদীরা পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করে সে দেশে আক্রমণ চালিয়েছে। ইমরানের এই মন্তব্যে পাকিস্তানের বিরোধীপক্ষ গর্জে উঠলেও ইমরান যে এই কথা বলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক একলপ্তে অনেকটাই মেরামত করে ফেলতে চেয়েছেন, সে কথা অনস্বীকার্য। ভারতের পক্ষে এই বার্তা খুব সুখকর নয়।
অন্যদিকে, ভারতের পাশাপাশি চিন ও তুরস্কও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞার কোপে পড়লেও তারা জনসমক্ষেই এই বিষয়ে তাদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছে। তাহলে, প্রশ্ন উঠতেই পারে, যদি বেইজিং এবং আঙ্কারা মার্কিন রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করার সাহস দেখাতে পারে, ভারত কেন নয়? কী হল ছাপ্পান্ন ইঞ্চির বুকের পাটার?

ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কও কি এবারে ধাক্কা খাবে?
আশঙ্কা আরও রয়েছে। ইরানের সঙ্গে তেল ব্যবসা বন্ধ করে ভারত এখন উদ্বিগ্ন করবে রাশিয়াকেও কারণ আমেরিকার নিষিদ্ধের তালিকায় রয়েছে তারাও। রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্ভার কেনার সম্পর্ক ভারতের অনেক দিনের আর তাই ট্রাম্পের 'ক্যাটসা' আইনের ভয়ে নয়াদিল্লি যদি মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ককেও লাগাম দেয়, তাহলে রাশিয়া তার অস্ত্র কেনার পরবর্তী খদ্দের হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নিতেই পারে আর সেটিও ভারতের পক্ষে দারুন আনন্দের খবর হবে না।












Click it and Unblock the Notifications