কাশ্মীর নিয়ে চিনের চূড়ান্ত নাকগলানো কি আদতে ভারতকে সুবিধা দেবে! এগিয়ে কি নয়াদিল্লিই
কাশ্মীর যে শুধু ভারত পাকিস্তানের সমস্যা, তা নয়। দুই দেশের অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্যে বহুদিন ধরে নাক গলিয়ে আসছে আর এক প্রতিবেশী দেশ চিন।
কাশ্মীর যে শুধু ভারত পাকিস্তানের সমস্যা, তা নয়। দুই দেশের অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্যে বহুদিন ধরে নাক গলিয়ে আসছে আর এক প্রতিবেশী দেশ চিন। মূলত বড় দাদা চিনের প্রশ্রয় পেয়েই কাশ্মীর নিয়ে বড় বেশি আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে পাকিস্তান। ভারত বিশ্বাস করে চিন-পাকিস্তানের অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপিইসি এদেশের জাতীয় সুরক্ষায় বড় বিপদ বয়ে আনতে পারে। চিন এই অঞ্চলে দাপাদাপি করবে বলে শুধু নয়, পাকিস্তানের সুবিধা হবে ইরান থেকে ভারতকে অনেকটা দূরে সরিয়ে দেওয়ার। আরব সাগর ও মধ্য এশিয়া থেকে তেল ও খনিজ গ্যাস যা সরবরাহ হচ্ছে তাতে চিনের প্রভাব অনেক বেড়েছে এবং তা ক্রমবর্ধমান।

২০১৬ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইরান সফরে যান। ভারত সেই সফরের মধ্য দিয়ে স্থির হয়েছে চাবাহারে বন্দর গড়তে ভারত ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করবে। এর ফলে পাকিস্তানকে কাটিয়ে ভারতের আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় যাতায়াত আরও মসৃণ হবে। এর ফলে ভারত-ইরান-আফগানিস্তানের মধ্যে বাণিজ্য মজবুত হবে। চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে শুধু এই দুই দেশ নয়, মধ্য এশিয়ায় ভারতের যাতায়াত বাড়বে। ইরান ও আফগানিস্তানও ভারতকে শুল্কে ছাড়া দেওয়া ছাড়া আরও অনেক সুবিধা দিচ্ছে। ২০১৭ সালের অক্টোবরে গম রপ্তানিও হয়েছে এই বন্দরের মাধ্যমে।
শুধু গদর বা চাবাহার নিয়েই ভারত-চিন দ্বন্দ্ব সীমিত নেই। ২০১৭ সালের জুন মাসে চিনা সেনারা ভারত-ভূটান-চিন তিন দেশের সীমান্তের মাঝের এলাকা ডোকলামে ঢুকে পড়েছিল। সেখানে চিনের দাপাদাপি দেখে সিঁদুরে মেঘ আশঙ্কা করে ভারতও সেনা নামিয়ে দেয়। সেই নিয়ে দীর্ঘ কয়েক মাসের উত্তাপ দক্ষিণ এশিয়ায় কূটনৈতিক উত্তাপ তৈরি করেছিল।

ডোকলাম থেকে শিলিগুড়ির চিকেনস নেক একেবারে অদূরে। ডোকলামে চিন সেনা ঢুকিয়ে কব্জা করলে ভারতের পুরো উত্তর-পূর্ব অংশ অরক্ষিত ও যোগাযোগশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। টিকেনস নেক বলে যে জায়গা বলা হচ্ছে সেখানে একদিকে বাংলাদেশ ও অপরদিকে নেপালের আন্তর্জাতিক সীমান্ত। মাঝে দূরত্ব মাত্র ১৭ কিলোমিটার। মনে করা হচ্ছিল, চিন এই অংশে দাপট বাড়িয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতকে আলাদা করার কৌশল নিয়েছে। যেমন অরুণাচল প্রদেশকে ভারতের অংশ বলেই মেনে নিতে চায় না চিন। এই রাজ্যকে তিব্বতের দক্ষিণ অংশ বলে দাবি করে। সেভাবেই গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতকে অশান্ত করতে চিনের আলাদা পরিকল্পনা রয়েছে।

চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই নিয়ে ভারত আপত্তি জানিয়েছে। এরই একটি অংশ যা চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর হিসাবে শোনা গিয়েছে, তা পাক অধীকৃত কাশ্মীরের গিলগিট ও বালটিস্তানের মধ্যে দিয়ে গিয়ে বন্দরে পড়ছে। ফলে ভারতের সীমান্ত এলাকার সার্বভৌমত্ব কতটা বজায় থাকবে তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
ঘটনা হল, পাক অধীকৃত কাশ্মীরের বুক দিয়ে অর্থনৈতিক করিডোর তৈরি হলে পরে তা আর শুধু ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্বের বিষয় থাকবে না। পাশাপাশি বড় অর্থনীতি হিসাবে নিজেদের দৌড় অব্যাহত রাখতে গেলে ভারতকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে সচেতন হতে হবে ও সাপ্লাই চেনকে ঠিক রাখতে হবে।

বিআরআই নিয়ে চিন অঙ্ক কষতে ভুল করেছে প্রথম থেকে। বেজিং ভেবেছে রাশিয়া বা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি এতে রাজি হয়েছে। ফলে ভারতকে বাধ্য হয়ে রাজি হতেই হবে। তবে সেটা হয়নি। চিনের কথা ভারত শোনেনি। তার থেকেও বড় কথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশকে নিজেদের ভাবনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পেরেছে নয়াদিল্লি। আর তাই ভারতের সমস্ত দাবি বা ভাবনাকে বারবার নস্যাৎ করা চিনকে খুব বেশি সুবিধা দেয়নি।
দক্ষিণ এশিয়ায় এই তিন দেশ বাদে বাকী দেশগুলি ঐতিহাসিক ও পরম্পরাগতভাবে ভারতের দিকে ঝুঁকে রয়েছে। নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মলদ্বীপ বরাবর ভারতকে বড় দাদা মেনে চলেছে।

আর এখন বিশ্বের অর্থনীতি বা কূটনীতির যা অবস্থা তাতে ভারত কোনও কিছুতে বেঁকে বসলে তাদের বাদ দিয়ে বড় সিদ্ধান্ত রাশিয়া, আমেরিকা বা অন্য দেশ নিতেও পারবে না। বলা যায় ভারত মধ্যমণি হয়ে রয়েছে। তা সে চিন যতই আর্থিক ও সামরিকভাবে এদেশের চেয়ে শক্তিশালী হোক।
চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নিয়ে ফলে ভারত ধীরে চলো নীতি নিয়েছে। একদিকে পাকিস্তান ঋণের ভারে ন্যুব্জ হয়ে রয়েছে। অন্যদিকে চিন এই বিআরআই-কে সফল করতে গিয়ে চিনকে অনেক বেশি টাকা ঢালতে হচ্ছে। এত বেশি অর্থ এদিকে যোগান দিতে গিয়ে একদিকে ধীরগতি হয়ে পড়া চিনের অর্থনীতি আরও বেহাল হওয়ার দিকে এগোনোর আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ভারত গোটা প্রক্রিয়ায় কতটা লাভবান হবে বা আদৌও ক্ষতি হবে কিনা তা সময়ই বলবে। তবে ভারতের পিছিয়ে আসা যে চিনের পক্ষে শুভ হয়নি তা বেজিং ভালোই বুঝতে পারছে।












Click it and Unblock the Notifications