সোলেইমানি হত্যা: মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ হলে তেলের বাজারে কী হতে পারে?

২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পরপরই চরম অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছিল তেলের বাজার।
Getty Images
২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পরপরই চরম অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছিল তেলের বাজার।

২০০৪ সালে আমেরিকা ইরাকে দ্বিতীয় দফায় যুদ্ধ শুরু করলো, বিশ্বের বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম রাতারাতি ১০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল।

যেসব ব্যবসায়ী আগে তেল কিনে রেখেছিলেন, বড় ধরনের মুনাফা তৈরির সুযোগ তৈরি হয়ে যায় তাদের।

নিউইয়র্কের মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জ (এনওয়াইএমইএক্স)- যেখানে জ্বালানি তেলের কেন-বেচা হয় - সেখানে তখন ট্রেডার হিসাবে কাজ করতেন মিচ কান।

মি. কান স্মৃতিচারণ করছিলেন - "সেদিন যখন অপরিশোধিত তেলের ট্রেডিং শুরু হলো সাথে সাথে দালালদের চিৎকারে কানে তালা লাগার জোগাড় হয়েছিল।"

দাম বেড়ে যাওয়ায় মুনাফার লোভে আগের দামে কেনা তেল বিক্রির চেষ্টা করছিলো সবাই। পরিণতিতে, দাম বাড়লেও কয়েক মিনিটের মধ্যে এক ব্যারেল তেলের দাম ২০ মার্কিন ডলারেরও বেশি পড়ে যায়।

"বিক্রির চাপে বাজারটা যেন ধসে পড়লো।"

মানুষ বুঝতে পারছিল না তেলের বাজারে কী হচ্ছে।

এখন যদি ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটা সামরিক লড়াই বেধে যায় তেলের বাজারে তার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে?

মি. কান মনে করেন, ১৬ বছর আগে যে অস্থিরতা দেখা গিয়েছিল এখন তেমন হয়তো হবেনা।

তিনি বলেন, যদিও শুক্রবার অপরিশোধিত তেলের বাজারে দাম চার শতাংশের মত বেড়ে গিয়েছিল, কিন্তু দ্বিতীয় ইরাক যুদ্ধের সময়ের তুলনায় তেলের বাজার এখন অনেকটাই আলাদা।

"বাজারের চরিত্র বদলে গেছে," বলছেন তিনি।

যেসব দেশে এখন তেল উৎপাদন করে, যেভাবে এখন তেল পরিশোধিত হয়, যেভাবে কেনা-বেচা হয়, তা এখন অনেকটাই ভিন্ন। ট্রেডিং এক্সচেঞ্জে দালালদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বা ধারনা দিয়ে এখন আর বিশ্বের তেলের বাজারের দাম নির্ধারিত হয়না।

নিউ-ইয়র্কের মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জে চলছে তেলের কেনা-বেচা (ফাইল ফটো)
Getty Images
নিউ-ইয়র্কের মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জে চলছে তেলের কেনা-বেচা (ফাইল ফটো)

কীভাবে বদলেছে বাজারের চরিত্র

শুক্রবার যখন মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানী জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হবার খবর জানাজানি হলো , অপরিশোধিত দেলের দাম ব্যারেল প্রতি চার শতাংশ বেড়ে ৬৯.৫০ ডলারে দাঁড়ায়।

ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি) এবং শেল কোম্পানির শেয়ারের দাম এক লাফে দেড় শতাংশ বেড়ে যায়।

কিন্তু বিশাল কোনো অস্থিরতা তেলের বাজারে নেই।

সেটি কেন? ব্যাংক অব আমেরিকায় কর্মরত বাজার বিশেষজ্ঞ মাইকেল উইডমার বলছেন, প্রধান কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখন জ্বালানি তেলে স্বয়ংসম্পূর্ণ। যা তার প্রয়োজন সেই পরিমাণ তেল তারা নিজেরাই উত্তোলন করে।

মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর আমেরিকার নির্ভরতা এখন আর নেই। "পরিস্থিতি বদলে গেছে," বলছেন মি উইডমার।

উদাহরণ হিসাবে তিনি গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেলের স্থাপনায় ড্রোন হামলার প্রসঙ্গ টানেন।

"বিশ্বের তেলের বাজারের ওপর বিশাল একটি আঘাত ছিল সেটি। কিন্তু তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া আমরা দেখিনি।"

হামলার দিন তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০ ডলার বেড়ে যায়, কিন্তু তারপর আর তেমন কিছু হয়নি।

ইউক্রেনের বন্দরে মার্কিন তেলের ট্যাংকার। প্রচুর তেল তুলছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা এখন আর মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর নির্ভরশীল নয়।
Getty Images
ইউক্রেনের বন্দরে মার্কিন তেলের ট্যাংকার। প্রচুর তেল তুলছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা এখন আর মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর নির্ভরশীল নয়।

আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে তখন থেকে হুমকি-পাল্টা হুমকি চলতে থাকা স্বত্বেও দু সপ্তাহের মধ্যে দাম কমে এক ব্যারেলের দাম গিয়ে দাঁড়ায় ৬০ ডলার।

কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে অনেক দেশই এখন অনেক তেল উত্তোলন করছে।

প্রধানত মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদকদের জোট ওপেক আগে তেলের বাজারের ওপর যে প্রভাব রাখতো, এখন তা আর নেই।

"এখন ওপেক তেলের উৎপাদন কমালে সাথে সাথে অন্যান্য কিছু দেশ উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়।"

প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবসার শীর্ষস্থানীয় পরামর্শক সংস্থা উড ম্যাকেনজির গবেষণা সেলের প্রধান অ্যালান গেলডার বলছেন, একসময় ওপেক জোটের দেশগুলোর বিশ্বের জ্বালানি তেলের অর্ধেক উৎপাদন করতো। কিন্তু তা কমে দাঁড়িয়েছে এক-তৃতীয়াংশ।

১৯৯০ সালে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় দুটো সূত্র থেকে বাজারে তেল আসতো - ওপেক, আর উত্তর-সাগরের মত কিছু সূত্র থেকে যেগুলোর ওপর ভরসা করা শক্ত ছিল এবং সেগুলো কেনার খরচও ছিল অনেক বেশি।

চল্লিশ বছর আগে গভীর সমুদ্রের তল থেকে তেল তোলা ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং খরচ-সাপেক্ষ।

কিন্তু এখন উত্তর আমেরিকায় ফ্রাকিং পদ্ধতিতে ওঠানো তেলে বাজার সয়লাব।

মি. গেলডার বলছেন "এখন বাজারে অনেক বিক্রেতা।'

তাছাড়া বাজারের পরিস্থিতি নিয়ে তথ্য পাওয়াও অনেক সহজ।

যেমন সেপ্টেম্বরে সৌদি তেলক্ষেত্রে হামলার ঘটনার পর স্যাটেলাইটে তোলা ছবিতে বন্দরে জাহাজের গতিবিধি দেখে সহজের সবাই বুঝে গিয়েছিল যে ঐ স্থাপনায় তেল উৎপাদন এবং রপ্তানি আবার শুরু হয়ে গেছে।

ফলে বাজারে অস্থিরতা দ্রুত চলে গিয়েছিল।

"কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি জানতে মানুষ পাগলের মতো নানা সূত্র থেকে খবর জানার চেষ্টা করতো। এখন তা করতে হয়না।"

সেপ্টেম্বরে সৌদি এই তেলের স্থাপনায় ড্রোন হামলা হয়। কিন্তু তারপরও তেলের বাজারে তেমন বড় কোনো অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়নি।
Getty Images
সেপ্টেম্বরে সৌদি এই তেলের স্থাপনায় ড্রোন হামলা হয়। কিন্তু তারপরও তেলের বাজারে তেমন বড় কোনো অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়নি।

কতটা উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ

বর্তমানে ওপেক দেশগুলো এবং রাশিয়া সহ আরো কয়েকটি দেশ যথেচ্ছ তেলের উৎপাদন না করার ব্যাপারে একটি সমঝোতা করেছে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ লাগলে তেলের বাজারে প্রতিক্রিয়া ঠিক কী হবে - ধারণা করা কিছুটা কঠিন হচ্ছে।

সিটি ব্যাংকের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্বল্প-মেয়াদে দাম কিছুটা উঁচুর দিকে থাকবে।

তবে সাময়িক এই অস্থিতিশীলতার সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের মত দেশগুলো যাদের জ্বালানির প্রায় শতভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে।

রাষ্ট্রীয় খাতের জ্বালানি তেল প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান শামসুর রহমান বিবিসিকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির এবং তেলের বাজারের ওপর গভীরভাবে চোখ রাখছেন তারা।

তবে তিনি বলেন, ভরসার কথা যে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও বিকল্প সূত্র থেকেও তেল আমদানির সুযোগ এখন অনেক বেড়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের তেলের প্রায় অর্ধেকটাই এখন ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে আমদানি করা হয়, ফলে বিকল্প সূত্র থেকে তেল আনার সুযোগ এখন অনেক বেশি।

"ইরাক যুদ্ধের সময়ও আমরা মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প সূত্র থেকে তেল এনেছি। বড় কোনো সঙ্কট তখন হয়নি।"

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর পাইপলাইনে বা পশ্চিমা বিনিয়োগে নতুন যেসব ক্ষেত্র থেকে তেল উৎপাদনের চেষ্টা হচ্ছে সেগুলোতে হামলা হলে সাময়িকভাবে অপরিশোধিত তেলের দাম হয়তো বাড়বে।

কিন্তু মধ্য বা দীর্ঘমেয়াদে সেটি বিশাল কোনো সঙ্কট তৈরি করবে, সে সম্ভাবনা কম।

BBC
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+