বাংলাদেশের যশোরের গদখালী কীভাবে ফুলের রাজ্যে পরিণত হলো?

বাংলাদেশের যশোর জেলার ঝিকরগাছার একটি এলাকা বিখ্যাত হয়ে উঠেছে ফুল চাষের কারণে। হাজার হাজার একর জমিতে নানা জাতের ফুল চাষ হচ্ছে সেখানে।

গদখালী গ্রাম ও আশেপাশের এলাকায় বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা মূল্যের ফুল উৎপাদন হয়
BBC
গদখালী গ্রাম ও আশেপাশের এলাকায় বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা মূল্যের ফুল উৎপাদন হয়

বাংলাদেশের যশোর জেলার ঝিকরগাছার একটি এলাকা বিখ্যাত হয়ে উঠেছে ফুল চাষের কারণে।

গদখালী নামের ওই গ্রাম ও আশপাশের হাজার হাজার একর জমিতে বছর জুড়ে উৎপাদন হচ্ছে দেশী বিদেশী নানা জাতের ফুল যার বার্ষিক বাজার মূল্য প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।

এই গ্রামের ফুল সারাদেশ তো বটেই, যাচ্ছে বিদেশেও।

কিন্তু এই গ্রামটি কি করে সাধারণ ধান পাটের বদলে ফুল চাষের জন্য বিখ্যাত হয়ে ফুলের রাজ্যে পরিণত হলো?

যশোর সদর থেকে প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার দুরে ঝিকরগাছার এই গদখালী গ্রাম।

খুব ভোরেই এখানে জমে উঠে বাংলাদেশের বৃহত্তম ফুলের বাজার। ঢাকাসহ নানা জায়গার ব্যবসায়ীরা এসে ট্রাক বা পিক আপ ভর্তি করে ফুল নিয়ে যান আর এসব ফুল বিক্রি হয় সারাদেশে বিশেষ করে শহর এলাকাগুলোতে।

কিন্তু এতো ফুল হয় কোথায়। সেটি দেখতেই আমি গিয়েছিলাম গদখালী গ্রামে।

রাস্তার দু'পাশে তখন চোখ ও প্রাণ জুড়ানো অসংখ্য ফুলের বাগান ।

একজন চাষি বাগানে কাজ করছিলেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন প্রতিদিন তার বাগান থেকে ৪/৫ হাজার গোলাপ হয় আবার কখনো সেটি পাঁচশও হয়।

"জানুয়ারিতে ফুল আসবে। সেই প্রস্তুতি নিচ্ছি এখন"।

প্রতিদিনই এই গদখালী ও আশপাশের এলাকায় ফুলের রাজ্য দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসেন অসংখ্য নারী পুরুষ।

বিশেষ ঘর যার নাম পলি হাউজ--চলছে ফুল চাষ
BBC
বিশেষ ঘর যার নাম পলি হাউজ--চলছে ফুল চাষ

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা একজন নারী বলেন, "চারপাশে ফুল আর ফুল। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে গোলাপ নেই এখন। জারবেরা, গ্লাডিওলাস এগুলো দেখেও শান্তি পেলাম"।

আরেক জন বলেন, "একটা হচ্ছে অনেক ধরণের ফুল আরেকটা হলো অনেক বেশি পরিমাণ ফুল। বাংলাদেশের বেশিরভাগ ফুল এখান থেকেই যায়"।

অপর একজন বলেন, "কোথা থেকে এতো ফুল আসে সেটি দেখতেই গদখালীতে এলাম"।

গদখালীতে ফুল চাষের ইতিহাস

গদখালীতে ফুল চাষ শুরু হয়েছিলো কিভাবে তার খোঁজ নিতে গিয়ে সন্ধান মিললো শের আলী সরদারের।

তার দাবি চার দশক আগে তার হাত ধরে এখানে শুরু হয় ফুলের চাষ আর এলাকার ক্ষেতখামার থেকে বিদায় নিতে শুরু করে ধান পাট বা এ ধরণের প্রচলিত শস্য।

তিনি বলেন, "১৯৮২ সালে এরশাদ আমলে এক বিঘা জমিতে রজনীগন্ধা দিয়ে শুরু করেছিলাম। আমার বাবার নার্সারি ছিলো এবং আমি সেখানেই বসে ছিলাম। ভারত থেকে আসা এক ভদ্রলোক এসে পানি চেয়েছিলো।"

"তার হাতে ফুল। তিনি বললেন এই ফুল পশ্চিমবঙ্গে অনেক হয়। তো আমি ভাবলাম পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের মাটি তো এক। তখনই শুরু করলাম রজনীগন্ধা দিয়ে"।

শের আলী সরদার ও স্থানীয় অন্যদের ভাষ্যমতে এভাবে প্রায় চার দশক আগে ফুল চাষের যে যাত্রা শুরু হয়েছিলো তার এখন বিস্তার ঘটেছে পুরো অঞ্চল জুড়ে। এখন আসছে নিত্য নতুন জাতের ফুল।

ফুল চাষ দেখতে আসা দু শিক্ষার্থী
BBC
ফুল চাষ দেখতে আসা দু শিক্ষার্থী

কোন ধরণের ফুল বেশি হয়

গদখালীর যেকোনো দিকে তাকালেই চোখে পড়ে একটার পর একটা ফুলের বাগান।

বিশেষ করে গোলাপ, গাঁদা আর অর্কিড, পাতাবাহার, রজনীগন্ধার বাগান রয়েছে অসংখ্য।

এর বাইরেও চোখে পরে পলি হাউজ বা ফুল চাষের বিশেষ ঘর।

এসব ঘরে হয় জারবার ফুলের চাষ যার চাহিদা এখন অনেক বেশি বেড়েছে বলে জানা শের আলী সরদার।

স্থানীয় চাষিদের একজন শাজাহান কবীর বিবিসি বাংলাকে বলেন এসব ফুলের বাইরেও লিলিয়ামসহ নানা জাতের ফুল চাষ করছেন তারা।

গদখালীতে ভারত ও চীন থেকে বিশেষজ্ঞ চাষীরা এসেে স্থানীয় কৃষকদের সহায়তা করেন
BBC
গদখালীতে ভারত ও চীন থেকে বিশেষজ্ঞ চাষীরা এসেে স্থানীয় কৃষকদের সহায়তা করেন

বিদেশ থেকে আসছে বিশেষজ্ঞ চাষিরা

গদখালীতে ফুল বাগান ঘুরে দেখার সময়ই দেখা হলো বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি মো: আব্দুর রহিমের সাথে।

তিনি বলছেন, ভারত ও চীন থেকে বিশেষজ্ঞ চাষিদের আনা হচ্ছে স্থানীয় কৃষকদের সহায়তার জন্য বিশেষ করে পলি হাউজগুলো তৈরিতে সহায়তার জন্য।

"ভারত ও চীন থেকে কৃষকরা আসেন আমাদের সহায়তায়। আবার বিএডিসি যে গবেষণা করে সেখানেও তারা সহায়তা করেন"।

কৃষক শাজাহান কবীর বলেন, নিত্য নতুন জাতের ফুলের চাষের জন্য আলাদা জ্ঞানের দরকার হয় এবং সেটি তারা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পাচ্ছেন।

এর ফলে ফুলের বাজার এখন গোলাপ, গাঁদা আর রজনীগন্ধার ওপর নির্ভরশীল নেই।

পাতা বাহার বাগান
BBC
পাতা বাহার বাগান

কৃষকরা কেমন লাভবান হচ্ছেন?

ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিমের ভাষ্যমতে, ফুলের বাজার এখন প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার।

প্রবীণ চাষি শের আলী সরদার বলছেন ধান ও পাটের চেয়ে ফুলেই বেশি লাভ আর এখন অনুষ্ঠান বা দিবস বেশি হয় বলে ফুলের চাহিদাও অনেকে বেড়েছে।

শাজাহান কবীর বলেন, "সামনে ১৪ই ফেব্রুয়ারি আসছে। গ্রামের সবাই জানে তার আগেই প্রচুর ফুল সরবরাহ করতে হবে। সঙ্গত কারণেই দামও বাড়বে।"

"আবার তার কদিন পরেই একুশে ফেব্রুয়ারি তখন ফুল লাগবে একেবারে তৃণমূল গ্রাম পর্যন্ত। এ ধরণের আরও কিছু দিবস আছে যেগুলোতে ফুলের ব্যবহার দিন দিন বাড়বে। তাই ফুল চাষে বিনিয়োগ নিরাপদ"।

মিস্টার রহিম বলছেন, এসব বিষয় মাথায় রেখেই ফুল চাষ এবং নিত্য নতুন ফুলের জাত নিয়ে সরকারী বেসরকারি গবেষণাও শুরু হয়েছে।

"আর এতসব উদ্যোগের কারণেই অন্য ফসলের চেয়ে ফুল চাষেই চার পাঁচ গুন বেশি লাভবান হচ্ছে কৃষকরা।"

ফলে চাষিদের ফুল চাষে সম্পৃক্ত হওয়ার সংখ্যাও প্রতিবছরই বাড়ছে বলে মনে করেন তিনি।

ফলে গদখালীর ফুলের সুবাসও ছড়িয়ে পড়ছে দেশ দেশান্তরে।

BBC
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+