'বিকিনি কিলার' চার্লস শোভরাজ যেভাবে নেপালে ধরা পড়েন

নেপালি পুলিশের ঘেরাটোপে চার্লস শোভরাজ
BBC
নেপালি পুলিশের ঘেরাটোপে চার্লস শোভরাজ

সেপ্টেম্বর ২০০৩।

কাঠমান্ডুর থামেল এলাকায় ক্যামেরা, জুম লেন্স নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন রাজেশ গুরুং।

বছর ২৬এর মি. গুরুং তখন ছিলেন কাঠমান্ডুর ইংরেজি দৈনিক দা হিমালয়ান টাইমসের চিত্র সাংবাদিক। এখন তিনি ওই কাগজেরই প্রধান চিত্র সাংবাদিক।

তার ওপরে দায়িত্ব পড়েছিল এক রহস্যময় ব্যক্তির ছবি তোলার। সেই ব্যক্তিকে চেনার জন্য একটা পাসপোর্ট মাপের ছবি তাকে দেওয়া হয়েছিল।

তার এক সহকর্মী বলেছিলেন ছবিটা খুব সম্ভবত চার্লস শোভরাজের।

বিভিন্ন দেশে অন্তত ২০টি খুনের অভিযোগ ছিল চার্লস শোভরাজের বিরুদ্ধে
Getty Images
বিভিন্ন দেশে অন্তত ২০টি খুনের অভিযোগ ছিল চার্লস শোভরাজের বিরুদ্ধে

কে এই সিরিয়াল কিলার চার্লস শোভরাজ

১৯ বছর নেপালের জেলে থাকার পরে শুক্রবার মুক্তি পেলেন আদতে ফরাসী নাগরিক চার্লস শোভরাজ।

মুক্তির পরে তাকে ফ্রান্সে পাঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট।

চার্লস শোভরাজের বিরুদ্ধে ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, ইরানসহ বিভিন্ন দেশে অন্তত ২০জনকে খুন করার অভিযোগ আছে।

১৯৮০ সালে প্রকাশিত রিচার্ড নেভিল ও জুলি ক্লার্কের লেখা চার্লস শোভরাজের জীবনী 'দা লাইফ এন্ড ক্রাইমস অফ চার্লস শোভরাজ' বইতে এই সিরিয়াল কিলারের অপরাধগুলির বিস্তারিত লেখা হয়েছে।

বিবিসি ও নেটফ্লিক্স ২০২১ সালে চার্লস শোভরাজকে নিয়ে একটি সিরিজ করে 'দা সার্পেন্টোইন' নামে।

তার শিকারদের মৃতদেহগুলির মধ্যে অনেককেই বিকিনি পড়া অবস্থায় পাওয়া যায়, তাই তার আরেক নাম বিকিনি কিলার।

সুদর্শন এই পুরুষ মূলত হত্যা করতেন পশ্চিমা পর্যটকদের, যারা সস্তায় বিশ্ব ভ্রমণ করে বেরায়, সেই সব 'ব্যাকপ্যাকার'দের। তাদের কাছে থাকা অর্থ তো হাতিয়ে নিতেনই তিনি, আর সঙ্গে নিহতদের পাসপোর্টগুলোও সংগ্রহ করতেন।

ভারতের অতি সুরক্ষিত তিহার জেল থেকে পালানোর কিছুদিনের মধ্যেই ধরা পড়েন চার্লস শোভরাজ
Getty Images
ভারতের অতি সুরক্ষিত তিহার জেল থেকে পালানোর কিছুদিনের মধ্যেই ধরা পড়েন চার্লস শোভরাজ

চার্লস শোভরাজ ভারতে দুবার গ্রেপ্তার হন

খুন করার পরে তার শিকারদের পাসপোর্ট ব্যবহার করেই পরিচয় গোপন করে তিনি অন্য দেশে হাজির হতেন, নতুন শিকারের খোঁজে।

ভারতে বেড়াতে আসা একদল ফরাসী ছাত্রছাত্রীকে মাদক খাইয়ে তাদের লুঠপাট করার চেষ্টা করেন মি. শোভরাজ ও তার দুজন সঙ্গী। ওই ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে একজন মারা যান, কিন্তু অন্য তিনজনের দেওয়া খবরের ভিত্তিতে পুলিশ গ্রেপ্তার করে তাকে।

১৯৭৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পরে তাকে দিল্লির অতি সুরক্ষিত তিহার জেলে রাখা হয়েছিল। কিন্তু দশ বছর পরে তিনি নিজের জন্মদিন পালনের অছিলায় জেল রক্ষীদের মাদক মেশানো বিস্কুট, ফল ইত্যাদি খাইয়ে বেহুঁশ করে পালিয়ে যান। জেল পালানোর সময়ে মূল ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ছবিও তুলেছিলেন চার্লস শোভরাজ।

মনে করা হয় তিনি আবারও ভারতেই ধরা পড়ার উদ্দেশ্যেই জেল থেকে পালিয়েছিলেন।

তিনি বুঝেছিলেন যে জেল পালানোর অপরাধে তার ভারতেই বিচার হবে, আর তা নাহলে ১২ বছরের জেলের মেয়াদ শেষ হলে তাকে ভারত থেকে থাইল্যান্ডে প্রত্যর্পণ করা হবে, যেখানে তার বিরুদ্ধে হত্যার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করে আছে।

কিছুদিনের মধ্যেই গোয়াতে ধরা পড়ে যান চার্লস শোভরাজ।

টাইমস অফ ইন্ডিয়া শুক্রবার এমন এক অবসরপ্রাপ্ত মুম্বাই পুলিশ অফিসারের সাক্ষাতকার ছেপেছে, যিনি চার্লস শোভরাজকে দুবারই গ্রেপ্তার করেন।

১৯৭১ সালে প্রথমবার মুম্বাইতে এক পাতি চোরের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ অফিসার মধুকর জেন্ডে গ্রেপ্তার করেন চার্লস শোভরাজকে। আবার তিহার জেল থেকে পালানোর পরে ১৯৮৬ সালে গোয়ার এক রেস্তোরা থেকেও মি. জেন্ডেই ধরে ফেলেন শোভরাজকে।

জেল পালানোর অপরাধের সাজা খাটার পরে ১৯৯৭ সালে অবশেষে ভারতের জেল থেকে মুক্তি পান চার্লস শোভরাজ। ততদিনে থাইল্যান্ডের আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে হত্যার সাজা তামাদি হয়ে গেছে।

বিবিসি আর নেটফ্লিক্স চার্লস শোভরাজকে নিয়ে দা সার্পেন্টাইন নামের একটি সিরিজ করেছে
Getty Images
বিবিসি আর নেটফ্লিক্স চার্লস শোভরাজকে নিয়ে দা সার্পেন্টাইন নামের একটি সিরিজ করেছে

জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় জেলে

ভারত থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি ফ্রান্সেই ফিরে গিয়েছিলেন।

সেই সময়ে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে সাক্ষাতকার দিতেন মি. শোভরাজ। তার জীবনের ওপরে বই লেখার জন্যও অনেক টাকা নিতেন তিনি।

৭৮ বছর বয়সী মি. শোভরাজ তার জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন জেলেই।

কিন্তু কাঠমান্ডুর চিত্র সাংবাদিক রাজেশ গুরুং জানতেন না এতসব, যে কে চার্লস শোভরাজ।

কিন্তু যখন শুনলেন এই শোভরাজ একজন সিরিয়াল কিলার, তখন তিনি বেশ ভয় পেয়েছিলেন।

তিনদিন অপেক্ষা করেছিলেন রাজেশ গুরুং চার্লস শোভরাজের জন্য।

বিবিসি নেপালিকে মি. গুরুং বলছিলেন, "ওই তিনদিন রোজ সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত আমি থামেল এলাকায় যেতাম। নয়াবাজারের গার্ডেন হোটেলের কাছে অপেক্ষা করতাম চার্লস শোভরাজ কখন বাইরে বেরয়, তার জন্য।"

বিবিসি আর নেটফ্লিক্স চার্লস শোভরাজকে নিয়ে দা সার্পেন্টাইন নামের একটি সিরিজ করেছে
Rajesh Gurung
বিবিসি আর নেটফ্লিক্স চার্লস শোভরাজকে নিয়ে দা সার্পেন্টাইন নামের একটি সিরিজ করেছে

যেভাবে নেপালে পাওয়া গেল চার্লস শোভরাজকে

"তিনদিন পরে দুপুরের দিকে একজন বিদেশি বাইরে বেরলেন, যাকে দেখতে অনেকটা আমার কাছে থাকা পাসপোর্ট মাপের ছবির ব্যক্তির মতোই। কাছে যেতে ভয় পাচ্ছিলাম। আবার জুম লেন্স দিয়ে অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই ছবি পাচ্ছিলাম না। অবশেষে সুযোগটা এল যখন শোভরাজ একটা টেলিফোন বুথে ঢুকেছিলেন," মনে পড়ছিল রাজেশ গুরুংয়ের।

চার্লস শোভরাজ টেলিফোন বুথ থেকে বেরনোর আগেই ক্যামেরা সেট করে ফেলেছিলেন রাজেশ গুরুং। গোটা পাঁচেক ছবি তোলার পরেই মাঝে একটা বাস এসে যায় আর সেই সময়ের মধ্যেই চার্লস শোভরাজ কারও একটা মোটরসাইকেলে উঠে চলে যান।

"আমিও মোটরসাইকেলে পিছু নিয়েছিলাম, আরও ভাল কয়েকটা ছবি তোলার আশায়। কিন্তু তাদের আর খুঁজে পাই নি," আক্ষেপ করছিলেন মি. গুরুং।

ছবিটা মি. গুরুং তুললেও তার কয়েকদিন আগে চার্লস শোভরাজকে খুঁজে পেয়েছিলেন প্রতিবেদক যোসেফ নাথান।

দা হিমালয়ান টাইমসের ওই সাংবাদিক একটি ক্যাসিনোতে প্রথম দেখেন মি. শোভরাজকে। নিশ্চিত হওয়ার পরেই ছবি তোলার জন্য ডাক পরে রাজেশ গুরুংয়ের।

পরের দিন দা হিমালয়ান টাইমস আর তাদের সহযোগী নেপালি পত্রিকা অন্নপূর্ণা পোস্টে ছাপা হয়েছিল সেই ছবি।

'সিরিয়াল কিলার', 'বিকিনি কিলার' বা 'দা সারপেন্ট' ইত্যাদি নামে পরিচিত চার্লস শোভরাজকে যে কাঠমান্ডুতে দেখা গেছে, সেই খবরটা ছিল একটা 'স্কুপ'। খবরটা ছাপা হয় সাংবাদিক যোসেফ নাথানের নাম দিয়ে। কিন্তু চিত্র সাংবাদিকের নাম ছাপা হয় নি।

দা হিমালয়ান টাইমস কাগজে প্রকাশিত সেই স্কুপ
The Himalayan Times
দা হিমালয়ান টাইমস কাগজে প্রকাশিত সেই স্কুপ

'চার্লস শোভরাজের জন্যই গোয়েন্দা হয়ে উঠি'

ঘটনাচক্রে রাজেশ গুরুং যেমন তিন দিন অপেক্ষা করেছিলেন চার্লস শোভরাজের ছবি তোলার জন্য, তেমনই ২৩ বছর ধরে চার্লস শোভরাজের জন্য অপেক্ষা করছিলেন সেই সময়ে কাঠমান্ডু পুলিশে গোয়েন্দা বিভাগের ডেপুটি পুলিস সুপারিন্টেডেন্ট গণেশ কে সি।

তার গোয়েন্দা হয়ে ওঠাই যে শোভরাজকে খুঁজে বের করার জন্য।

মি. গণেশ সংবাদ সংস্থা পিটিআই কে বলেছেন, "১৯৭৫ সালে আমার যখন ১২ বছর বয়স, তখন একটা ঝোপের মধ্যে এক যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এক নারীর মৃতদেহ দেখতে গিয়েছিলাম আরও অনেকের সঙ্গে। আধপোড়া ওই মৃতদেহটি ছিল কনি জো ব্রনঝিখের। তার সঙ্গী, কানাডার নাগরিক লরেন কেরিরকেও চার্লস শোভরাজ হত্যা করেছিল শুনেছিলাম। ওই ঘটনাটার জন্যই পরবর্তী কালে গোয়েন্দা হয়ে উঠি আমি।"

রাজেশ গুরুংয়ের তোলা ছবি আর যোসেফ নাথানের খবর ছাপা হতেই নেপাল সহ সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হৈ চৈ পড়ে যায়।

কাঠমান্ডু পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তা মি. গণেশ তার দলবল নিয়ে শহরের পর্যটন কেন্দ্র থামেলের বিভিন্ন হোটেলে হানা দেন। কিন্তু প্রতিবারই পালিয়ে যেতে সক্ষম হন চার্লস শোভরাজ।

মি. গণেশ বিবিসি নেপালি বিভাগকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, "আমরা চার পাঁচটা হোটেলে হানা দিয়েছিলাম। অবশেষে খবরটা ছাপা হওয়ার পরের দিন একটা ক্যাসিনো থেকে তাকে আমরা গ্রেপ্তার করি। কিন্তু তাকে জেরা শুরুর পরে আমরা বুঝতে পারি যে তার অপরাধ প্রমাণ করার জন্য আমাদের হিমালয় অতিক্রম করতে হবে। "

হাতকড়া আর শিকল পড়া অবস্থায় অনেক দেশের জেল পালানো আসামী চার্লস শোভরাজ
Getty Images
হাতকড়া আর শিকল পড়া অবস্থায় অনেক দেশের জেল পালানো আসামী চার্লস শোভরাজ

ধরা পড়েও চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসী

পুলিশের ডি আই জি পদ থেকে অবসর নেওয়া মি. গণেশ কে সি জানিয়েছেন প্রথমে মি. শোভরাজ স্বীকারই করছিলেন না যে তিনি আগে কখনও নেপালে এসেছেন।

"আমরা জানতাম যে সে আমাদের ভুল বোঝানোর চেষ্টা করছে। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস ছিল তার। অন্যদিকে আমাদের কাছে প্রমাণের অভাব ছিল। জেরার সঙ্গেই আদালতের পুরনো নথি খোঁজা চলতে থাকে। একই ব্যক্তি দুবার দুটো আলাদা পাসপোর্ট নিয়ে নেপালে প্রবেশ করেছে, এই অভিযোগে মামলা রুজু করি আমরা। অবশেষে দিল্লিবাজার আদালত থেকে পুরনো মামলার নথি উদ্ধার করা হয়," জানিয়েছেন গণেশ কে সি।

১৯৭৫ সালের দুটি খুনের দায়ে ২০০৩ সালে নেপালের আদালত ২০ বছরের জেলের সাজা দেয় চার্লস শোভরাজকে।

নেপালের জেলে থাকাকালীনই চার্লস শোভরাজ বিয়ে করেন নিহিতা বিশ্বাসকে (বাঁ দিকে)
Getty Images
নেপালের জেলে থাকাকালীনই চার্লস শোভরাজ বিয়ে করেন নিহিতা বিশ্বাসকে (বাঁ দিকে)

নেপালের জেল জীবনেও শিরোনামে চার্লস শোভরাজ

কিন্তু এটা কখনই পুলিশের কাছে পরিষ্কার হয় নি, যে কেন খুন করার অত বছর পরে চার্লস শোভরাজ নেপালে ফিরে গিয়েছিলেন ২০০৩ সালে।

নেপালের জেল জীবনেও বারে বারেই শিরোনামে এসেছেন চার্লস শোভরাজ।

তিনি জেলে থাকাকালীনই তার উকিলের মেয়ে, প্রায় ৪৪ বছরের ছোট নিহিতা বিশ্বাসকে বিয়ে করেন।

আবার জেল থেকেই তিনি কি করে এক বিদেশি সাংবাদিককে সাক্ষাতকার দিলেন, প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়েও।

বারে বারে তিনি আদালতের কাছে, কখনও আবার জাতি সংঘ মানবাধিকার কমিশনের কাছে মুক্তির আবেদন করতে থাকেন।

অবশেষে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, যেহেতু তার বয়স ৭৮ বছর হয়ে গেছে, আর ১৯ বছর জেলে থাকাকালীন তার ব্যবহারও ভদ্র ছিল, তাই তাকে মুক্তি দিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে ফ্রান্সে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।

BBC
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+