সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি: বিবিসি বাংলার জরিপে ১৮ নম্বরে অতীশ দীপঙ্কর

পনের বছর আগের এই জরিপে বিবিসি বাংলার শ্রোতারা নির্বাচন করেছিলেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কুড়িজন বাঙালিকে। ১৮তম স্থানে বিজয়ী অতীশ দীপঙ্কর তিব্বত থেকে মালয়েশিয়া পর্যন্ত মানুষের মন জয় করেছিলেন তার অসীম জ্ঞ

দু'হাজার চার সালে বিবিসি বাংলা একটি 'শ্রোতা জরিপ'-এর আয়োজন করে। বিষয়টি ছিলো - সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কে? তিরিশ দিনের ওপর চালানো জরিপে শ্রোতাদের ভোটে নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ ২০জনের জীবন নিয়ে বিবিসি বাংলায় বেতার অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয় ২০০৪-এর ২৬শে মার্চ থেকে ১৫ই এপ্রিল পর্যন্ত।

বিবিসি বাংলার সেই জরিপে শ্রোতাদের ভোটে শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় ১৮তম স্থানে আসেন অতীশ দীপঙ্কর। আজ তাঁর জীবন-কথা।

দার্শনিক অতীশ দীপঙ্কর, তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়ে মানুষের মন জয় করেছিলেন - তিব্বত থেকে মালয়েশিয়া পর্যন্ত।

তিনি জন্মেছিলেন প্রায় এক হাজার ৪০ বছর আগে আজকের বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার বজ্রযোগিনী গ্রামে। বাবা ছিলেন গৌড়ীয় রাজ পরিবারের রাজা কল্যাণশ্রী, মা প্রভাবতী।

বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন চর্চ্চা এবং প্রচার প্রসারের ক্ষেত্রে পূর্ব এশিয়া জুড়ে স্মরণীয় অতীশ দীপঙ্কর। তাঁর প্রভাব আজও বিরাজ করছে পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে।

পনের বছর আগে বিবিসি বাংলার এই অনুষ্ঠান তৈরির সময় ভিক্ষু শুদ্ধানন্দ মহাথেরো ছিলেন ঢাকার বৌদ্ধ মহাবিহারের আচার্য।

"অতীশের বাস্তুভিটা নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা নামে পরিচিত ছিল। ১৯৫২/৫৩ সালে কিছুটা চিহ্ণ সেখানে ছিল। আমরাও দেখেছি একটা মন্দির ছিল সেখানে," বলছিলেন শুদ্ধানন্দ মহাথেরো।

"উনি যখন সন্ন্যাস গ্রহণ করেন, তখন তৎকালীন বিভিন্ন সমাজ ব্যবস্থায় ওনাকে নাস্তিক হিসাবে অভিহিত করা হয়। যেহেতু বৌদ্ধরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না।"

দীপঙ্করের শিক্ষার শুরু হয় তন্ত্র চর্চ্চা দিয়ে। পরে তিনি বৌদ্ধ শাস্ত্র পাঠ করেন। হয়ত শৈশবেই তিনি ঘর ছেড়েছিলেন।

নওগাঁতে পাহাড়পুরের প্রাচীন বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ। এই সোমপুর বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পালবংশীয় রাজা ধর্মপাল সপ্তম শতাব্দীতে।
Getty Images
নওগাঁতে পাহাড়পুরের প্রাচীন বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ। এই সোমপুর বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পালবংশীয় রাজা ধর্মপাল সপ্তম শতাব্দীতে।

কিন্তু তান্ত্রিক আচারে আবদ্ধ না থেকে তিনি বৌদ্ধধর্মের হীনযান, মহাযান ও বজ্রযান শাখায় পূর্ণ জ্ঞান আয়ত্ত করেন।

এক হাজার এগারো কি বারো সালে গভীরতর জ্ঞানের খোঁজে তিনি গেলেন সুবর্ণদ্বীপে যা সম্ভবত আজকের ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপ।

বারো বছর পর ভারতে ফিরে দীপঙ্কর নিযুক্ত হলেন ভাগলপুরে বিক্রমশীলা বিহারের আচার্য হিসাবে।

ভারতের বিহার বা মগধ রাজ্যের রাজা তখন বৌদ্ধ পাল রাজবংশীয় নয়পাল। পাল সম্রাটরা বৌদ্ধধর্মের মহাযান ও তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের অনুগামী ছিলেন।

খ্রিস্টীয় ৯বম শতাব্দীর প্রথম ভাগে পাল সাম্রাজ্য সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। ওই সময় পাল সাম্রাজ্যই ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি।

{image-"অতীশ দীপঙ্কর মহান হয়ে আছেন বহু দেশে। বুদ্ধের পরেই হচ্ছে অতীশের স্থান। ", Source: বিপ্রদাস বড়ুয়া , Source description: অতীশ দীপঙ্করের জীবনীকার, Image: বৌদ্ধগয়ায় মন্ত্র পাঠ করছেন শ্রমণরা। bengali.oneindia.com}

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও পালির অধ্যাপক নিরঞ্জন অধিকারী বলছেন নয়পাল দীপঙ্করকে খুব সম্মান করতেন এবং দীপঙ্করের সঙ্গে তাঁর পত্রালাপ চলত।

"বলা যায় তিনি অনেকটা রাজার উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেছেন। তবে যে ঘটনাটা খুব বড় ছিল মনে হয় সেটা হল নয়পালের সঙ্গে কলচুরি রাজ লক্ষ্মীকর্ণের যে যুদ্ধ হয়, দীপঙ্করের মধ্যস্থতায় তার অবসান ঘটে। এবং দুই রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হয়।"

পাল রাজারা মগধে রাজত্ব করতেন। আর মগধের দক্ষিণ-পশ্চিমে নর্মদাতীরে ছিল চেদি রাজ্য, যেখানে রাজত্ব করতেন কলচুরি রাজ লক্ষ্মীকর্ণ। তাঁর রাজধানীর নাম ছিল ত্রিপুরী। নয়পাল আর লক্ষ্মীকর্ণের মধ্যে বংশানুক্রমিক শত্রুতা ছিল। লক্ষ্মীকর্ণের পিতা গাঙ্গেয়দেব এবং নয়পালের পিতা মহীপাল অক্লান্তভাবে সারা জীবন পরস্পর যুদ্ধ করেছিলেন।

বিহারে নালন্দা বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ
Getty Images
বিহারে নালন্দা বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ

প্রায় পনের বছর ভারতে অধ্যাপনার পর তিব্বতের রাজার বারবার অনুরোধে ষাট বছর বয়সে দীপঙ্কর তিব্বতে যান সেখানে বৌদ্ধধর্ম পুনরুদ্ধার করতে। সেখানে তখন বৌদ্ধধর্মের অনুসারীর সংখ্যা কমছিল।

সেখানে তাঁকে বরণ করা হয়েছিল মহা আড়ম্বরে। প্রাচীন বাংলার ইতিহাস নিয়ে ঐতিহাসিক ড: দীনেশ চন্দ্র সেনের 'বৃহৎ বঙ্গ'-এ এর উল্লেখ রয়েছে বলে জানিয়েছেন নিরঞ্জন অধিকারী।

"ড: সেনের বইয়ে সেই অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান সম্পর্কে বলা আছে: 'এই স্থানে দীপঙ্কর রাজ প্রতিনিধির হাতে উপহার হিসাবে পাঠানো চা পান করিলেন। ইহাই বোধহয় বাঙালির প্রথম চা খাওয়া'। অর্থাৎ আমাদের প্রতিনিধি হয়ে অতীশ দীপঙ্করই প্রথম চা পান করেছিলেন।"

তিব্বতবাসীদের দু:খকষ্টের বিবরণই দীপঙ্করকে সেদেশে যেতে রাজি করিয়েছিল। বাংলাদেশে অতীশ দীপঙ্করের জীবনীকার বিপ্রদাস বড়ুয়া।

তিব্বতের লাসায় সাদা পিস প্যাগোডা এবং চাকপির পাহাড়ের মাথায় পোটালা প্রাসাদ। পোটালা তিব্বতের সবচেয়ে প্রাচীন রাজপ্রাসাদ চত্বর।
Getty Images
তিব্বতের লাসায় সাদা পিস প্যাগোডা এবং চাকপির পাহাড়ের মাথায় পোটালা প্রাসাদ। পোটালা তিব্বতের সবচেয়ে প্রাচীন রাজপ্রাসাদ চত্বর।

"অতীশ যেখানেই গেছেন, সেখানে সাধারণ মানুষের কষ্ট দেখেছেন। যেখানে তিনি দেখেছেন চাষবাসের জন্য সুবিধা আছে, সেখানে তিনি একজন এনজিনিয়ারের মত বাঁধ দিয়ে ফসল ফলানোর জন্য মানুষকে একত্রিত করেছেন," বলেছেন বিপ্রদাস বড়ুয়া।

"কোথাও রোগ, শোক, মহামারি দেখা দিয়েছে- অতীশ সেখানে ছুটে গেছেন। নিজে তো তিনি ডাক্তারিশাস্ত্র জানতেন। মানুষের তিনি সেবা করেছেন, একত্রিত হয়ে যেখানে কাজ করা দরকার, সেখানে তিনি মানুষকে জোটবদ্ধ করেছেন।"

বিপ্রদাস বড়ুয়া বলেন অতীশ দীপঙ্করের চেষ্টায় শুধু যে তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম স্থায়ী রূপ পেয়েছিল তা নয়।

"তাঁর ধর্মপ্রচারের ঐতিহ্য তিব্বত থেকে চীনে চলে গিয়েছিল। সেখান থেকে কোরিয়া হয়ে জাপানে ছড়িয়ে পড়েছিল অতীশের সুনাম। অতীশ দীপঙ্কর মহান হয়ে আছেন বহু দেশে। বুদ্ধের পরেই হচ্ছে অতীশের স্থান। আর অতীশের যে এত বই, এত টিকাটিপ্পনি তিনি নিজের হাতে লিখেছেন। পরের লেখা অনুবাদ করেছেন, এমনকী নিজের লেখাও অনুবাদ করেছেন তিব্বতী ভাষায়।"

নেপালের ভক্তপুরে পঞ্চদান উৎসবে অতীশ দীপঙ্করের প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিল

তিব্বতীরা তাকে অতীশ উপাধিতে ভূষিত করেন, যার অর্থ 'শান্তি'।

তিব্বতেই লাসার কাছে ১০৫৩ কিংবা ১০৫৪ সালে মারা যান অতীশ দীপঙ্কর ।

বৌদ্ধধর্মের মহাযান শাখার এই দার্শনিকের জীবনের মূলমন্ত্র ছিল মানুষের কল্যাণ ও মানুষের মুক্তিসাধন।

BBC
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+