পাক-সংকট থেকে ব্রিটেনে অস্থিরতা, ২০২২ সালের যে সব ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল বিশ্ব-রাজনীতিকে
পাক-সংকট থেকে ব্রিটেনে অস্থিরতা, ২০২২ সালের যে সব ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল বিশ্ব-রাজনীতিকে
২০২২ সালে শেষের পথে। আর মাত্র হাতে গোনা কটা দিন। তার আগে একবার ফিরে দেখা সেইসব ঘটনায়, যা এ বছর নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল বিশ্ব-রাজনীতিকে। যে সমস্ত ঘটনায় রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল দেশে, বিশ্বব্যাপী নজর কেড়েছিল, তা নিয়েই এই প্রতিবেদন।

বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল ইউক্রেনের উপর রুশ হামলা
২০২২ সালে এসে তিন বছর ধরে চলা করোনা মহামারীর শাপমুক্তি ঘটেছে। যদিও বছর শেষে আবার তা বিশ্বের বহু দেশেইব ত্রাস হয়ে উঠতে শুরু করেছে। করোনার বাড়বাড়ন্ত একটু কমতেই যে ঘটনা গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম হল ইউক্রেনের উপর রুশ হামলা। যা একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের চেহারা নিয়েছিল। এর ফলে বেশ কয়েকটি দেশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হয়েছিল।

প্রতিবেশী পাকিস্তানে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সঙ্কট
আবার এ বছরই বেশ কিছু দেশে রাজনৈতিক অস্থিরাবস্থা তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে প্রথমেই যে দেশটির নাম করতে হবে, তা হল পাকিস্তান। পাকিস্তানে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে উদ্ভুত হয়েছিল রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সঙ্কট। জাতীয় পরিষদের ডেপুটি স্প্কার কাসিম খান সুরি অধিবেশন চলাকালীন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে একটি অনাস্থা প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছিলেন।
পরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আরিফ আলভি জাতীয় পরিষদ ভেঙে দেন। এই জাতীয় পরিষদ ভেঙে দেওয়াকে অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করা হয়। আদালতের রায়ের পর ৯ এপ্রিল দীর্ঘ অধিবেশন শেষে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদত্যাগপত্র জমা দেন। ১০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়। এবং ইমরান খান হন পাকিস্তানের বরখাস্ত হওয়া প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন পাকিস্তান মুসলিম লিগের নেতা (নওয়াজ) শাহবাজ শরিফ।

দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট
শ্রীলঙ্কার নজিরবিহীনভাবে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়। তার ফলে দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। কয়েক বছরের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, দুর্বল প্রশাসন ও সুশাসনের অভাবে ভারতের প্রতিবেশী দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণ ছিল। শ্রীলঙ্কার জনগণ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপক্ষে ও প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দ্রা রাজাপক্ষের পদত্যাগের আহ্বান জানান। সেই দাবিতে হাজার হাজার মানুষ শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাক্ষের ব্যক্তিগত বাসভবনের কাছে বিক্ষোভ দেখান। তারা সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে তাঁরা রাষ্ট্রপতির বাড়িতে পর্যন্ত চড়াও হন।
দেশে এই ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী মাহিন্রাবা রাজাপক্ষে ২৬ সদস্যকে ৩ এপ্রিল পদত্যাগের নির্দেশ দেন। একমাস পরে ৯ মে প্রধানমন্ত্রী নিজে পদত্যাগ করেন। এরপর গোটা দেশে কারফিউ জারি ছিল। তারই মধ্যে ১৩ মে রনিল বিক্রমসিংহে শ্রীলঙ্কার ২৬তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এরপর বিক্ষোভকারীরা রাষ্ট্রপতির বাসভবনে চড়াও হন। তখন রাষ্ট্রপতি ৯ জুলাই বাসভবন ছেড়ে পালিয়ে যান। ১৪ জুলাই তিনি মালদ্বীপ হয়ে সিঙ্গাপুরে পৌঁছন। এরপর রনিল বিক্রমসিংহে ২০ জুলাই সংসদীয় ভোটে জয়ী হয়ে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি হন।

নজিরবিহীন অশান্তি ব্রিটিশ রাজনীতিতে
যে ব্রিটিশরা একসময় বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল, তারাই দুই মাসের ব্যবধানে তিনজন প্রধানমন্ত্রী দেখল। ৮ সেপ্টেম্বর রাজা দ্বিতীয় এলিজাবেথকেও হারিয়েছিল ব্রিটেন। তারপর ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে অশান্তির সূত্রপাত। জুলাই মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন পদত্যাগ করেছিলেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন আরেক রক্ষণশীল নেতা লিজ ট্রাস। ঋষি সুনকের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে ট্রাস ৬ সেপ্টেম্বর দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন।
লিজ ট্রাসের কার্যকাল খুব স্বল্পস্থায়ী ছিল। কারণ তাঁর সরকার মাত্র ৪৫ দিন স্থায়ী হয়েছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রিত্বের ইতিহাসে সংক্ষিপ্ততম মেয়াদ। ট্রাসের ব্যর্থতা পথ ধরে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে উত্থান হয়েছিল ঋষি সুনকের। ভারতীয় বংশোদ্ভুত ঋষি সুনক পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ব্রিটেনের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রধানমন্ত্রী তিনি। দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার দুঃসাহসিক কাজ তিনি হাতে নিয়েছেন।

ব্রাজিলে সাধারণ নির্বাচনের পর বিক্ষোভ
বর্তমান রাষ্ট্রপতি এবং অতি-ডানপন্থী জনতাবাদী নেতা জাইর বলসোনারো তার বামপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী এবং প্রাক্তন জাতীয় নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে হেরে যাওয়ার পরে ব্রাজিলের বিভিন্ন অংশে বিক্ষোভ দানা বাঁধে। বলসোনারোর দল নির্বাচনের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করে। কারণ তিনি স্বল্প ব্যবধানে হেরে যান। লুলা দা সিলভা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৫০.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।
৩০ অক্টোবর এই নির্বাচনের পর বলসোনারোর অনুগামীরা এই হার মানতে পারেননি। বিক্ষোভ এমনই মাত্রায় পৌঁছয় যে, অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে হাজারটিরও বেশি রাস্তা। তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এই বিক্ষোভ চলে। বিক্ষোভকারীরা হিংসা ছড়াচেও কসুর করেনি। বোমা ছোড়া থেকে শুরু করে, ইটবৃষ্টি, টায়ার পোড়ানো, সবরকম পদ্ধতি প্রয়োগ করেন তাঁরা। এখনও বিক্ষোভ জারি রয়েছে, তবে তা শান্তিপূর্ণ পথে চালাচ্ছেন বলসোনারো সমর্থকরা।












Click it and Unblock the Notifications