কৃষি: সারের দাম নিয়ে 'উভয় সঙ্কটে' বাংলাদেশ, কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে

নারীরা ধান ভানছেন
Getty Images
নারীরা ধান ভানছেন

আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় অন্ততঃ তিন গুণ দামে সার কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশের সরকারকে। ওদিকে স্থানীয় বাজারে এমনিতেই ভর্তুকী মূল্যে বিক্রি করা সারের দাম বাড়াতে পারছে না। ফলে ভর্তুকীর পরিমাণ যাচ্ছে বেড়ে। যেটাকে 'উভয় সঙ্কট' বলে বর্ণনা করছে বাংলাদেশের সরকার।

সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের বক্তব্যে এই উভয় সঙ্কটের কথা উঠে এলেও সারের দাম এখনি না বাড়ানোরই পক্ষে সরকার।

বুধবার বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, দেশে সারের দাম বাড়ানো বা কমানোর কোন প্রস্তাব তিনি পাননি।

অর্থাৎ সারের দাম সহসাই বাড়ছে না।

এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, দেশের বাজারে দাম না বাড়ালে বাড়তি ভর্তুকির টাকা কোথা থেকে আসবে?

বিশ্ব বাজারে যে কারণে বেড়েছে সারের দাম

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ হলেও সারের চাহিদার প্রায় সবটাই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়।

তবে যে মূল্যেই আমদানি করা হোক না কেন, সেখানে ভর্তুকি যোগ করে সরকার কৃষকের কাছে নামমাত্র মূল্যে সার বিক্রি করে থাকে।

কিন্তু গত এক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম প্রায় তিনগুণ বেড়ে গেছে।

চাষাবাদে বেশ কিছু নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে বাংলাদেশ।
Getty Images
চাষাবাদে বেশ কিছু নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কামরুল আশরাফ খান বলছেন, ''আমাদের দেশে যত সার লাগে, তার বেশিরভাগই বিদেশ থেকে আনতে হয়। কিন্তু করোনাভাইরাস আর তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সারের দাম অনেক বেড়ে গেছে। অনেক দেশে সারের কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, তারা রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে বা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে যোগানের তুলনায় চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও বেড়েছে।''

বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে মূলত ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি এবং এমওপি সার বেশি ব্যবহৃত হয়।

কিন্তু এক বছর আগে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এক মেট্রিকটন ইউরিয়া ৫০০ ডলারে কিনলেও এখন সেটি আটশো ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

টিএসপি সারের দাম ২০০/৩০০ ডলার থাকলেও সেটি বেড়ে ৬০০/৭০০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।

ফলে সরকারকে বাধ্য হয়েই বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে।

কামরুল আশরাফ খান বলছেন, ''সেই সঙ্গে তেলের দাম বেড়েছে, পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে। দামের সঙ্গে সেটাও যোগ হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, সারের উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বেশি দাম দিয়েও সার পাওয়া যাচ্ছে না।''

বাংলাদেশ কোন দেশ থেকে কতটা সার আমদানি করে?

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর সাড়ে ২৬ লক্ষ টন ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশে উৎপাদন হয় প্রায় ১০ লক্ষ টন। চাহিদার বাকিটা আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং কাতার থেকে আমদানি করা হয়।

টিএসপি সার প্রয়োজন হয় সাড়ে সাত লক্ষ মেট্রিকটন। কিন্তু দেশে উৎপাদন হয় এক লক্ষ মেট্রিকটন। বাকিটা মরক্কো, তিউনিশিয়া থেকে আমদানি করা হয়।

ডিএপি সারের প্রয়োজন হয় সাড়ে ১৬ লাখ। তার মধ্যে সাড়ে ১৫ লাখ মেট্রিকটন সার বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। চীন ও জর্ডান থেকেই মূলত এই সার আমদানি করা হয়।

এমওপি সারের চাহিদা রয়েছে আট লক্ষ, যার পুরোটাই বেলারুশ, রাশিয়া, কানাডা থেকে আমদানি করা হয়।

কামরুল আশরাফ খান বলছেন, ''ইউরিয়া সারের উৎপাদন হয়তো দেশে আরও বাড়ানো যেতো। কিন্তু অন্য সারগুলো উৎপাদনের কাঁচামালের খনি আমাদের দেশে নেই। সেসব কাঁচামাল দেশে আমদানি করে এনে উৎপাদনে যে খরচ পড়বে, তার চেয়ে বরং কমেই বিদেশ থেকে আমদানি করা যায়।''

এই কারণে পার্শ্ববর্তী ভারতসহ অনেক কৃষি প্রধান দেশ নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশ থেকে এসব সার আমদানি করে থাকে, যেসব দেশে এসব কাঁচামালের খনি ও কারখানা রয়েছে।

কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এই শিল্পও চাপের মধ্যে পড়েছে। অনেক দেশ নিজেদের উৎপাদন বাড়াতে সার রপ্তানিতে বিধিনিষেধ দিয়ে রেখেছে।

যেমন চীন বিশ্বের ডিএপি সারের প্রধান রপ্তানিকারক দেশ হলেও দেশটি এই সারের রপ্তানিতে ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে।

সারের পেছনে কতটা ভর্তুকি দেয় বাংলাদেশের সরকার

বিশ্ববাজার থেকে বেশি দামে কেনা হলেও বাংলাদেশ সবসময়েই কৃষকের কাছে ভর্তুকি মূল্যে সার বিক্রি করে থাকে।

বাংলাদেশের কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে প্রতি কেজি ইউরিয়াতে ৮২ টাকা, টিএসপিতে ৫০ টাকা, ডিএপিতে ৭৯ টাকা এবং এমওপিতে ৪১ টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে বাংলাদেশের সরকার।

বাংলাদেশের প্রধান ফসল ধান
Getty Images
বাংলাদেশের প্রধান ফসল ধান

ফলে ৯৬ টাকায় প্রতি কেজি ইউরিয়া কেনা হলেও কৃষক পাচ্ছে ১৬ টাকায়। ৭০ টাকার টিএসপি ২২ টাকা, ৫৪ টাকার এমওপি ১৫ টাকা এবং ৯৩ টাকার ডিএপি ১৬ টাকা কেজিতে পাচ্ছে কৃষকরা।

বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সারের দাম বেশি দামে কিনতে বাধ্য হওয়ায় এই বছর সারের পেছনে ২৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হবে সরকারকে। যদিও আগের দামের বিবেচনায় এই বছর সারের ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ রয়েছে সাড়ে নয় হাজার কোটি টাকা।

তবে এখনো সারের দাম বাড়ানোর বিষয়ে সরকার কোন সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে তিনি জানিয়েছেন।

বিপুল ভর্তুকিতে কী সমস্যা দেখা দিতে পারে?

কৃষি প্রধান দেশ হওয়ার কারণে কৃষি সরঞ্জাম ও উপকরণের ওপরে বরাবরই ভর্তুকি দিয়ে আসছে বাংলাদেশ সরকার। গত একযুগে সেই ভর্তুকির পরিমাণ অনেক বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ভর্তুকি তুলে দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে পরামর্শ দিয়ে আসছে।

তবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''বাংলাদেশের মতো কৃষি প্রধান দেশে চাইলেই কৃষির ওপর ভর্তুকি কমিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। সারের মতো উপকরণের ক্ষেত্রে সেটা তো আরও কঠিন। কিন্তু এর ফলে খরচ যদি বহুগুণ বেড়ে যায়, তখন সরকারকেও সেটা অন্য জায়গা থেকে জোগাড় করতে হবে।''

ধান ক্ষেতে কৃষক
Getty Images
ধান ক্ষেতে কৃষক

তিনি বলছেন, সরকারের যেহেতু নির্দিষ্ট আয় থাকে, বাজেটে পূর্ব পরিকল্পনা থাকে, সেখানে এক বছরে এত বড় অংকের ভর্তুকি বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব অন্য খাতগুলোর ওপরে পড়তে পারে।

''তখন হয়তো অন্য কোন খাত থেকে খরচ কমিয়ে এই খাতে আনতে হবে। তখন দেখা যাবে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক খাত বা উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ কমে যাবে, যার প্রভাব আবার অন্যত্র পড়বে।''

ড. ফাহমিদা খাতুন বলছেন, ভর্তুকি যখন দেয়া হয়, সবাই একইরকমভাবে সেটা পান। কিন্তু এখন এমন পরিকল্পনা নেয়া উচিত, যাতে প্রান্তিক কৃষকরা বেশি পান, অবস্থাপন্ন কৃষকদের জন্য সেটা যেন কমে আসে। তবে গুরুত্ব দেয়া উচিত খাদ্য নিরাপত্তা যেন অটুট থাকে।

''আমাদের মতো দেশে ভর্তুকি সহসা তুলে দেয়া হয়তো সম্ভব হবে না। ক্রমান্বয়ে ধাপে ধাপে সেটার দিকে এগোতে হবে,'' বলছেন ড. ফাহমিদা খাতুন।

রাসায়নিক সারের বিকল্প কী আছে?

বাংলাদেশের কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ভর্তুকি মূল্যে সার বিক্রি এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের কারণে বাংলাদেশে ফসলের উৎপাদন অনেক বেড়েছে।

ইউরিয়া সার গাছের বৃদ্ধি বাড়ায়। টিএসপি ও ডিএপি গাছের কাণ্ড শক্তিশালী করে ও ফসল উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়য়ে দেয়, এমওপি গাছের দৃঢ়তা বাড়িয়ে তোলে।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ সালে বাংলাদেশে মোট দানাদার শস্য উৎপাদন হয়েছে ৪৫৫ দশমিক ৫ লাখ টন। তার মধ্যে চাল, গম, ভুট্টা, আলু, ডাল, পেঁয়াজ, পাট ইত্যাদি ফসল রয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. বিপ্লব কুমার সাহা বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''আমাদের তো জমি সীমিত। কিন্তু সারের ব্যবহারের কারণেই জনসংখ্যার সাথে মিল রেখে আমাদের উৎপাদন বেড়েছে, দেশের খাদ্যের চাহিদার বেশিরভাগ দেশেই হচ্ছে। ফলে সার ব্যবহার রাতারাতি বন্ধ করে দিলে সেটা ফসল উৎপাদনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।''

''আবার সারের দাম বাড়ালে ফসলেরও দাম বেড়ে যাবে। ফলে যেভাবেই হোক, সরকারে সারের যোগান দিয়ে যেতে হবে। তবে এর বিকল্প হতে পারে আস্তে আস্তে রাসায়নিক সারের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা। তবে আমাদের দেশের মাটি এখন এমন পর্যায়ে চলে গেছে, সার ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না,'' তিনি বলছেন।

তিনি জানান, অর্গানিক বা প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের কথাও ভাবা হচ্ছে। তাতে ফসলের মান ভালো হলেও উৎপাদন কম হয়।

BBC
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+