নোবেলজয়ী অভিজিৎ, ডুফলো ও ক্রেমার ব্র্যাকের মডেল নিয়েও কাজ করেছেন : তাদের মডেলটি আলাদা কেনো?

এসথার ডুফলো ও অভিজিৎ ব্যানার্জি
Getty Images
এসথার ডুফলো ও অভিজিৎ ব্যানার্জি

অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জি, এসথার ডুফলো এবং মাইকেল ক্রেমারকে নোবেল দেয়ার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে সেটি হলো দারিদ্র বিমোচনে তাদের পরীক্ষানির্ভর গবেষণা পদ্ধতি।

মি. ব্যানার্জি ও এসথার ডুফলো পরে এমআইটিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন।

সেখানে পরিষ্কার বাংলায় মিস্টার ব্যানার্জি বলেছেন, "...এখুনি অর্থনীতিতে পয়সা আনতে হবে এবং গরীবের হাতে আরও বেশি টাকা আনতে হবে"।

যদিও দারিদ্র বিমোচন নিয়ে গত দুদশকে বিশ্বজুড়ে গবেষকরা নানা দৃষ্টিকোণ থেকে কাজ করেছেন।

বাংলাদেশ থেকেই যাত্রা শুরু করা গ্রামীণ ব্যাংক কিংবা ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও এক্ষেত্রে প্রশংসিত হয়েছে।

অভিজিৎ ব্যানার্জি ও এসথার ডুফলো তাদের একটি বইয়ে অবশ্য বলেছেন, দিনে সোয়া এক ডলার বা তার চেয়ে কম আয় করা চরম দরিদ্রদের দারিদ্রের দুষ্টচক্র থেকে বের করে আনা খুবই কঠিন।

অবশ্য তাদের গবেষণায় তারা সেই চেষ্টাই করেছেন যাতে করে দারিদ্রের ফাঁদ থেকে মানুষকে বের করে আনার উপায় বের করা যায়।

আর এজন্য তারা দারিদ্র বিমোচন বা নিরসনের এতোদিনকার তাত্ত্বিক উপায় থেকে বেরিয়ে এসে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন।

কলকাতায় জন্ম নেয়া মার্কিন নাগরিক অভিজিৎ ও তার সহযোগীরা ব্র্যাকের একটি মডেল নিয়ে কাজ করেছেন অন্য কয়েকটি দেশে
Getty Images
কলকাতায় জন্ম নেয়া মার্কিন নাগরিক অভিজিৎ ও তার সহযোগীরা ব্র্যাকের একটি মডেল নিয়ে কাজ করেছেন অন্য কয়েকটি দেশে

আর এক্ষেত্রে তাঁরা গবেষণা করেছেন অনেকগুলো দরিদ্র দেশে।

ব্র্যাকের চেয়ারপার্সন ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলছেন, দারিদ্র বিমোচনের ক্ষেত্রে আগের গবেষণা বা কাজগুলোর সাথে অভিজিৎ ব্যানার্জি, এসথার ডুফলো ও মাইকেল ক্রেমারের কাজের পার্থক্য হলো এতে দর্শন বা তত্ত্বকে গুরুত্ব না দিয়ে প্রায়োগিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জোর দেয়া হয়েছে।

"যদিও এর সীমাবদ্ধতা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে, তারপরেও এখানে দারিদ্র বিমোচন কর্মসূচির ডিজাইন ও তা সফল হচ্ছে কিনা তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে"।

আরেক অর্থনীতিবিদ মুস্তাফিজুর রহমান বলছেন, এককথায় কোন কোন পদক্ষেপে দারিদ্র আরও দ্রুত নিরসন করা যায় সেটিই এবারের নোবেলজয়ীরা বের করার চেষ্টা করেছেন।

সৌদি ব্যবসায়ীর অর্থে ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি বা এমআইটিতে গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে আব্দুল লতিফ জামিল পোভার্টি অ্যাকশন ল্যাব।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইকেল ক্রেমারকে সাথে নিয়ে সেখান থেকেই গবেষণাটি করেছেন অভিজিৎ ব্যানার্জি ও এসথার ডুফলো।

দ্যা রয়েল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস বলেছে তাদের নতুন নিরীক্ষাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি উন্নয়ণ অর্থনীতিতে রূপ নিয়েছে, যা এখন গবেষণার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে বিকশিত হচ্ছে।

মাইকেল ক্রেমার
Getty Images
মাইকেল ক্রেমার

ব্যানার্জি-ডুফলো-ক্রেমারের কাজের বিশেষত্ব:

ধরুন কোনো এলাকার মানুষ দরিদ্র। স্বাভাবিকভাবে সেখানকার মানুষজন তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর বদলে কোথাও কাজে দিয়ে অর্থ পেতে আগ্রহী থাকেন।

এই গবেষকরা বলছেন এই অভিভাবকদের কিছু অর্থ দিলে হয়তো তারা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাবেন।

কিন্তু তাঁরা এই পরামর্শ দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং তাঁরা তাদের গবেষণায় নির্দিষ্ট এলাকা থেকে নমুনা ব্যক্তি বাছাই করে তাদের অর্থ দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন যে সেটি আসলেই কাজ করছে কিনা।

অর্থনীতিবিদ মুস্তাফিজুর রহমান বলছেন, এই গবেষকরা দেখার চেষ্টা করেছেন যেকোনো ধরণের শিক্ষা দরকার এবং কি করলে মানুষ তাদের সন্তানদের শিক্ষা নেয়ার জন্য পাঠাবে।

"ধরুন একটি দরিদ্র এলাকায় মানুষ কৃষিকাজ করছে। সেই এলাকার লোকদের শহরে আসার বাসের টিকেট দেয়া হলো। এই টিকেট দেয়ার পর এই গবেষকরা দেখার চেষ্টা করেছেন যে ওই টিকেট ব্যবহার করে মানুষগুলো তাদের পণ্য নিয়ে শহরে যেতে উৎসাহী হচ্ছে কিনা এবং গেলে তাদের লাভ হচ্ছে কিনা"।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলছেন, দারিদ্র বিমোচন করতে হলে দার্শনিক জায়গা নয় বরং অবকাঠামোগত সংস্কার—কিছু কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন করতে হবে, এটিই এবারের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদরা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।

অর্থাৎ দারিদ্র বিমোচন কর্মসূচির ডিজাইন এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে কোনো অংশের কারণে সফল হচ্ছে বা হচ্ছে না সেটার জন্য পদ্ধতিগত অভিনবত্ব এনেছেন তাঁরা।

যেমন ধরুন দারিদ্র বিমোচন প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কোথাও একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র খোলা হলো এবং এর পরিচালন সময় নির্ধারণ করা হলো সকাল আটটা থেকে বেলা দুটো পর্যন্ত।

কিন্তু ওই এলাকার মানুষ বা সম্ভাব্য যারা সেবাগ্রহীতা হবেন তাদের সেবা নেয়ার সময় হয় বিকেলে। তাহলে দেখা গেলো উদ্যোগ ভালো হলেও সময় নির্ধারণে ভুলের কারণে সেটি কোনো কাজে লাগলোনা।

আবার স্কুল থেকে শিশুরা ঝরে পড়ছে কেনো এটি দেখতে গিয়ে তাঁরা দেখেছেন যে কর্মসূচির ডিজাইন বা রূপরেখায় ভুল আছে কিনা—সেক্ষেত্রে তারা ডিজাইনের বিভিন্ন উপাদানে জোর দিয়েছেন।

এক্ষেত্রে তাঁরা সেবাগ্রহীতা এবং গ্রহীতা নন এমন দু'ক্ষেত্রেই পরীক্ষা করেছেন এবং এর ফল নিয়ে গবেষণা করেছেন।

মিস্টার রহমানের মতে, "এবারের নোবেলজয়ী তিন অর্থনীতিবিদের কাজের বৈশিষ্ট্য হলো: ১.তাঁরা একটি কর্মসূচির রূপরেখা তৈরি করছেন এবং ২. সেটি ঠিক মতো কাজ করছে কিনা তা বোঝার জন্য গবেষণার পদ্ধতিতে নতুনত্ব এনেছেন"।

যদিও হোসেন জিল্লুর রহমান ও মুস্তাফিজুর রহমান- দুজনই বলছেন নোবেল জয় করলেও উন্নয়ন অর্থনীতির এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে এবং এ নিয়ে প্রশ্নও আছে।

দ্যা রয়েল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস বৈশ্বিক দারিদ্র বিমোচনে তাদের পরীক্ষা নিরীক্ষার দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করেছে
Getty Images
দ্যা রয়েল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস বৈশ্বিক দারিদ্র বিমোচনে তাদের পরীক্ষা নিরীক্ষার দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করেছে

দারিদ্রকে বড় ক্যানভাসকে ভেঙ্গে দেখা

অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ বলছেন এই গবেষকরা দারিদ্রের বড় ক্যানভাস ভাগ করে এক্সপেরিমেন্ট করেছেন।

"তারা কৃত্রিমভাবে পরিস্থিতি তৈরি করেছেন। মানুষের আচরণ বিশ্লেষণ করেছেন। এবং দারিদ্রের কারণগুলো ভেঙ্গে এর ভেতরে ঢুকে বিশ্লেষণ করে পলিসি সাজেশন দিয়েছেন-এটাই তাদের বিশেষত্ব"।

একেক এলাকায় একেক ধরণের দারিদ্র। তাদের অর্থ দিয়ে তারা কী করবে? এ ধরণের ছোট ছোট ভাগে ইস্যুগুলো বের করে তারা দেখেছে যে আসলে কোথায় জোর দিতে হবে।

"অর্থাৎ যেসব কারণে দারিদ্র হয় সেগুলো কারণগুলোর ভেতরে ঢুকে বিশ্লেষণ করা এবং সে মোতাবেক কয়েকটি দেশকে নীতি পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। অর্থাৎ দারিদ্রের যে বিশাল ক্যানভাস সেটিকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে গবেষণাগারে এক্সপেরিমেন্ট করা"।

নাজনীন আহমেদ বলছেন এতোদিনকার যেসব ধারণা এসেছে দারিদ্র বিমোচন নিয়ে সেগুলো চেয়ে এ ধারণা নতুন ও সম্পূর্ণ আলাদা।

তিনি বলেন এর ফলে শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলোতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে গবেষকরা মনে করছেন।

ব্র্যাকের মডেল নিয়ে কাজ করেছেন অভিজিৎ ডুফলো

ব্র্যাকের আলট্রা পুওর গ্রাজুয়েশন কর্মসূচির প্রধান রোজিনা হক বিবিসিকে বলছেন, ব্র্যাকের এই কর্মসূচি শুরু হয়েছিলো ২০০২ সালে যা পরে ফোর্ড ফাউন্ডেশন অন্য দেশেও এটি সফল হয় কিনা তা দেখার চেষ্টা করে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ৪৭টি জেলার পাশাপাশি বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে এ কর্মসূচি চলছে।

আর এসব কার্যক্রমের কার্যকারিতা পরীক্ষার লক্ষ্যে বিশ্বের ছয়টি দেশে এমআইটির গবেষক অভিজিৎ, ডুফলো এবং তাদের সহযোগীরা গবেষণা করেছেন।

দেশগুলো হচ্ছে - ইথিওপিয়া, গানা, হন্ডুরাস, ভারত, পাকিস্তান ও পেরু।

ব্র্যাক বলছে, তাদের এ মডেলটির ওপর গবেষণা তাদের দারিদ্র বিমোচন বিষয়ক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

"অভিজিৎ ও তার সহযোগী গবেষকদের দারিদ্র বিষয়ক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ব্র্যাকের আলট্রা পুওর গ্রাজুয়েশন মডেল। তাছাড়া এই মডেলটি বিভিন্ন দেশের স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে সেখানকার চরম দরিদ্র মানুষের অবস্থা পরিবর্তনের কীভাবে কাজে লাগানো সম্ভব সে বিষয়ে তাদের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে"।

আরো খবর:

ট্রাম্পের যে সিদ্ধান্ত বদলেছে সিরিয়া যুদ্ধের চিত্র

মানুষের সৃজনশীলতা জীবনের কোন বয়সে সর্বোচ্চ থাকে

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও ভারত বিরোধিতা

সুন্দরবনে বনদস্যুরা কি আবার ফিরে আসছে?

BBC
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+