সীমান্তে গরু পাচার: ভারতে অভিযুক্ত বিএসএফ কর্মকর্তাদের সাজা দিতে লাগলো চার বছর

সীমান্তে গরু পাচার: ভারতে অভিযুক্ত বিএসএফ কর্মকর্তাদের সাজা দিতে লাগলো চার বছর

বাংলাদেশ ভারত সীমান্তে বিএসএফ সদস্যদের টহল
Getty Images
বাংলাদেশ ভারত সীমান্তে বিএসএফ সদস্যদের টহল

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বলছে, গরু পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অপরাধে তিনজন অফিসারকে বরখাস্ত এবং ১২ জনকে বদলি করেছে।

দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো- সিবিআই গত বছর থেকেই দক্ষিণবঙ্গ সীমান্ত অঞ্চলে গরু পাচার চক্রের সঙ্গে বিএসএফ কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়ে তদন্ত করছে।

কিন্তু বিবিসি জানতে পেরেছে, অন্তত ৪ বছর আগেই বাহিনীর মহাপরিচালকে এ বিষয়টি জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন এক কমান্ডান্ট। তারপরও এত বছরে কেন কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি, বাহিনীটির ভেতরেই সেই প্রশ্নও উঠছে।

বিএসএফের কয়েকটি সূত্র বলছে, "সর্ষের মধ্যেই ভূত ছিল। যাদের দায়িত্ব ছিল দুর্নীতি রোখা, গরু পাচার চক্রে জড়িত ছিলেন সেই সব সিনিয়র অফিসারদের একাংশও। এদের মধ্যে কয়েক জনের নাম সামনে এসেছে, কিন্তু আরও অনেকেই জড়িত ছিলেন। তারা কেউ বিএসএফ থেকে অন্য কোনও বাহিনীতে চলে গেছেন, বা তাদের যেতে দেওয়া হয়েছে, কেউ চাকরী ছেড়ে দিয়েছেন।"

বাহিনীর পূর্ব কমান্ডের প্রধান, অতিরিক্ত মহানির্দেশক পঙ্কজ কুমার সিং প্রকারান্তরে স্বীকারও করলেন সেটা।

তিনি বলছিলেন, "সৎ কর্মীদের থেকে অসৎদের পৃথক করতেই হবে আমাদের। কর্মী-অফিসারদের ওপরে নজরদারি চালানোর জন্য যথেষ্ট কড়া ব্যবস্থা আছে। আজ না হোক একদিন পরে খবর পাবই আমরা যে কোন অফিসার বা জওয়ান কাদের সঙ্গে যোগসাজশে দুর্নীতি করছে। সেই ব্যবস্থার মাধ্যমেই কিন্তু অফিসারদের একাংশের ব্যাপারে তথ্য পাওয়া গেছে। আবার সি বি আই-ও আমাদের কিছু তথ্য দিয়েছে। যাদের ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদেরই শাস্তি দেওয়া হয়েছে - বরখাস্ত করা হয়েছে।"

কিন্তু বাহিনীর অভ্যন্তরেই প্রশ্ন উঠছে গরু পাচারের সঙ্গে যে বিএসএফ কর্মকর্তাদের একাংশ জড়িত, তা তো ২০১৬ সালের পাঁচ জানুয়ারি মহাপরিচালককে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন রাজ কুমার বাসাট্টা নামে এক কমান্ডান্ট।

ওই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন যে, দক্ষিণ বঙ্গ সীমান্তের হেডকোয়াটার্স থেকে শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশ আসত যে, কোম্পানি কমান্ডার এবং পোস্ট কমান্ডারেরা যেন পাচারকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা করে।

এরকম নির্দিষ্ট অভিযোগ আসা সত্ত্বেও কেন তখন কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? বাহিনীর ভেতরেই তো নজরদারি বিভাগ আছে, সিনিয়র অফিসারেরা আছেন। তারা কেন চোখ বুজে ছিলেন?

এই প্রশ্নের উত্তরে পঙ্কজ কুমার সিং বলছিলেন, "এ বিষয়টা আমার জানা নেই, কারণ আমি বাহিনীতে যোগ দিয়েছি ২০২০ সালে। মহাপরিচালক যদি ২০১৬ সালে বিষয়টা জেনে থাকেন, নিশ্চয়ই তিনি কিছু ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, যেটা আমি জানি না।"

ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত অঞ্চলে কাজ করে, এমন একটি মানবাধিকার সংস্থা মাসুমের প্রধান কিরিটি রায় বলছিলেন, তাদের কাছেও অনেক তথ্য প্রমাণ আছে যে বিএসএফের সহায়তা নিয়েই গরু-মানুষ-নিষিদ্ধ ড্রাগ পাচার হয় সীমান্ত দিয়ে।

মি. রায়ের মতে শীর্ষ অফিসারেরা জড়িত না থাকলে এটা সম্ভব হত না

"অজস্র প্রমাণ আমাদের হাতে আছে, যা থেকে স্পষ্ট, যে বিএসএফের একাংশের মদত ছাড়া সীমান্তে কোনও কিছু পাচার হওয়া সম্ভব নয়। গোটা বাহিনীকে দোষ দেব না, কিন্তু এক শ্রেণীর জওয়ান এবং অফিসার পাচার চক্রের সঙ্গে নিশ্চিতভাবেই যুক্ত"।

"এদের সঙ্গে স্থানীয় পুলিশ, রাজনৈতিক দলগুলো - তারাও থাকে। বিজেপির হয়ে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন, এমন একজন তো দলীয় প্যাডে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রাজনাথ সিংকে লিখেছিলেন যে কীভাবে বিএসএফের মদতে সীমান্তে পাচার চলছে," বলছিলেন মি. রায়।

তিনি আরও বলছিলেন, "কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কতটা ব্যবস্থা নেওয়া হবে, বা তদন্তও কতদিন চলবে, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। এই পাচার চক্রের সঙ্গে রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় স্তরের রাজনৈতিক নেতারাও জড়িয়ে আছেন।"

বিএসএফের সূত্রগুলি বলছে, ২০১৪ থেকে ২০১৯ - এই পাঁচ বছরেই সবথেকে বেশি গরু পাচার হয়েছে দক্ষিণ বঙ্গ সীমান্ত দিয়ে। অথচ সেই সময়ের যে সব পরিসংখ্যান দেওয়া হত বিএসএফের তরফে, তাতে দাবী করা হত তারা কঠোর হাতে গরু পাচার বন্ধ করতে উদ্যোগ নিয়েছে বলেই প্রচুর গরু বাহিনীর সদস্যদের হাতে আটক হচ্ছে।

২০১৫ থেকে ২০১৭ -- প্রতিবছরই এক থেকে দু'লাখ গরু আটক হয়েছে বলা হয়েছিল।

কিন্তু যারা সীমান্তে গরু পাচারের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল - তারা বলছেন, যত বেশি গরু আটক হবে, বুঝতে হবে ততই বেশি পাচার হচ্ছে। কারণ মোট পাচারের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ গরু বি এস এফ আটক করে।

তাহলে কি আসল তথ্য চেপে যাওয়ার চেষ্টা করা হত ওই সময়কালে?

মি. কিরিটি রায় বলছিলেন, এভাবে ভুল তথ্য দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ।

যদিও সেই 'ভুল তথ্যের' ভিত্তিতেই ২০১৭-১৮ সালের জন্য 'মহারাণা প্রতাপ ট্রফি' পেয়েছিল দক্ষিণ বঙ্গ সীমান্ত, যে পুরস্কার দেওয়া হয় সেরা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য।

আবার বিএসএফ অভ্যন্তরে এই প্রশ্নও উঠছে যে, যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বা যাদের সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে, তাদের বেশীরভাগই বিএসএফ ক্যাডার অফিসার। কিন্তু শীর্ষ পদগুলিতে ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস বা আই পি এস অফিসাররা তো ছিলেন - তাদের ভূমিকা কেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে না?

BBC
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+