বাংলাদেশ সাধারণ নির্বাচন: কোন কোন রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ও গত তিনটি নির্বাচনে কী ঘটেছিল?
বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর এই প্রথম জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে চলেছে দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত সাধারণ নির্বাচন, যা ঘিরে রাজনৈতিক ময়দানে চরম উত্তেজনা। আওয়ামি লিগকে নিষিদ্ধ ও কার্যত নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ায় পুরো রাজনৈতিক সমীকরণই বদলে গিয়েছে।
৩০০ আসনের জাতীয় সংসদের জন্য এবছর লড়াইয়ে নেমেছে ৫১টি রাজনৈতিক দল, যদিও আটটি দল ভোটে অংশ নিচ্ছে না। এই নির্বাচনের মূল লড়াই কার্যত ঘুরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামী এই দুই শক্তির মধ্যে।

বিএনপি দল পরিচালনার মূল দায়িত্ব কার্যত সামলাচ্ছেন তারেক রহমান, যিনি দীর্ঘদিন লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরেছেন।
জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক উদারনীতি ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানই বিএনপির মূল আদর্শ। সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দলটির সম্ভাব্য ভোট শতাংশ ৩৩ থেকে ৩৫ শতাংশ বলে ইঙ্গিত মিলেছে। কৌশলগত কারণে কিছু আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে মিত্র দলগুলিকে, যেমন জামিয়াত উলামা ই ইসলাম।
ইসলামিক গণতন্ত্রের পক্ষে সওয়াল করা জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে রয়েছেন শফিকুর রহমান। এবারের নির্বাচনে দলটি বড় পরিবর্তনের পথে প্রায় ৮০ শতাংশ প্রার্থীই নতুন মুখ, যুবসমাজকে টানতেই এই কৌশল।
সমীক্ষায় জামায়াতের সম্ভাব্য ভোট ৩০ থেকে ৩৪ শতাংশ। ১১ দলীয় জোটের অংশ হিসেবে তারা লড়ছে ও সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে নজর রেখে প্রথমবারের মতো এক হিন্দু প্রার্থী কৃষ্ণা নন্দীকে টিকিট দিয়েছে। উল্লেখ্য, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপির সঙ্গে সরকারেও ছিল জামায়াত।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সংযোজন এক মধ্যপন্থী দল, যার নেতৃত্বে মাত্র ২৭ বছরের ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা নেতা নাহিদ ইসলাম। সংবিধান সংস্কার, স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলা এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই ভোটে নেমেছে দলটি।
তবে সাংগঠনিক দুর্বলতা ও জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে টানাপোড়েনে দলের ভিতরেই ভাঙন দেখা দিয়েছে।
এবার মোট ১,৯৮১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সংখ্যালঘু সমাজ থেকে প্রার্থী রয়েছেন ৮০ জন এর মধ্যে বিএনপির ৬ জন ও সিপিআইএম (সিপিবি) এর ১৭ জন। বিএনপি ইতিমধ্যেই লিবারাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মতো ছোট দলগুলিকে নিজেদের মধ্যে বিলিয়ে নিয়েছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামি লিগ একতরফাভাবে ৩০০ আসনের মধ্যে ২২৪টি জিতে নেয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচন বয়কট করায় ভোটার উপস্থিতি নেমে আসে ১০ থেকে ৪০ শতাংশে, যা ছিল সর্বনিম্ন। ভোটের আগে হিংসায় প্রাণ হারান বহু মানুষ।
২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামি লিগের প্রাপ্তি ২৮৮ আসন, বিরোধীদের অভিযোগ ব্যাপক কারচুপি ও ব্যালট স্টাফিং। ভিডিও প্রমাণ সামনে আসে। খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ায় বিএনপি ভোটে নামেনি। জামায়াত পায় মাত্র একটি আসন।
২০১৪ সালের নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে বিএনপি ভোট বয়কট করলে আওয়ামি লিগ পায় ২৩৪ আসন। ভোটার উপস্থিতি ছিল মাত্র ৪০ শতাংশ। হিংসায় নিহত হন শতাধিক মানুষ।
২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানের পর এবারের নির্বাচনকে বাংলাদেশের ইতিহাসের "সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া" বলে দাবি করা হচ্ছে, মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২৭ মিলিয়ন। সমীক্ষায় এগিয়ে বিএনপি থাকলেও জোট রাজনীতি, অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও সম্ভাব্য হিংসা বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি সত্যিই নতুন অধ্যায় শুরু হবে, নাকি পুরনো সংঘাতেরই পুনরাবৃত্তি, তার উত্তর দেবে ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট বাক্স।












Click it and Unblock the Notifications