১৬ ডিসেম্বর : বিজয় দিবসের পরিবর্তে যাদের কাছে তারিখটি 'এক্সোডাস ডে' বা পালাতে পারার দিন
বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে ১৬ ডিসেম্বর তারিখটি বাংলাদেশ ও ভারত বিজয় দিবস হিসেবে উদযাপন করে আসছে - কারণ ১৯৭১র এই দিনেই ভারতীয় সেনা ও মুক্তিবাহিনীর কাছে ঢাকায় আত্মসমর্পণ করেছিল পাকিস্তান।

কিন্তু ভারতেরই একটি বর্তমান মূলধারার রাজনৈতিক দল, যাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে - সেই মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা এমএনএফের কাছে এই দিনটির তাৎপর্য সম্পূর্ণ আলাদা।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যখন ভারতীয় সেনা ও মুক্তিযোদ্ধারা পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের ঘিরে ফেলেছে, বেশ অলৌকিকভাবে প্রায় সাত-আটশো মিজো গেরিলা তখন আরাকানে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন, যে কারণে আজও তারা এই দিনটিকে 'এক্সোডাস ডে' বা 'নিষ্ক্রমণের দিন' হিসেবে পালন করে থাকেন।
মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট যখন ষাটের দশকের মাঝামাঝি ভারতীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে, তখন থেকেই মিজো বিদ্রোহীরা আশ্রয় পেয়েছিলেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের পার্বত্য চট্টগ্রামে ।
রাঙামাটি ও সাজেক ভ্যালিতে ছিল তাদের শিবির, আর মিজো সুপ্রিম লিডার লালডেঙ্গা সরকারি আতিথ্যে থাকতেন ঢাকাতেই।
সব কিছু ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু ১৯৭১-র ১৬ ডিসেম্বর হঠাৎই তাদের জন্য ঘনিয়ে এল বিপদ সংকেত।
'যেভাবে পালাতে পেরেছিলাম'
মিজোরামের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী জোরামথাঙ্গা তখন তরুণ একজন বিদ্রোহী গেরিলা, সর্বোচ্চ নেতা লালডেঙ্গার বিশ্বস্ত অনুচর।
বিবিসি বাংলাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলছিলেন, "১৬ তারিখ পাকিস্তানি বাহিনীর নর্থ-ইস্ট কমান্ডের যিনি প্রধান, লে: জেনারেল পদমর্যাদার একজন অফিসার, আমাকে একটা ছবি দেখিয়ে বললেন জেনারেল নিয়াজি জেনারেল না কি অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করে ফেলেছেন।"
"আমি তো প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না ... যাই হোক, সেই ছবি নিয়ে আমি চট্টগ্রাম থেকে ছুটলাম হেডকোয়ার্টার্স রাঙামাটির দিকে।"
ততক্ষণে ভারতীয় ফৌজ ও মুক্তি বাহিনীর লোকেরা মিজোদের ঘিরে ফেলার জন্য এগোচ্ছে - কিন্তু তাদের চারদিকে বিশাল কাপ্তাই লেক, পালানোর কোনও পথই নেই।
"লালডেঙ্গা তখন বললেন, এসো প্রার্থনা করা যাক - হাইকমান্ডের সবাই মিলে আমরা হাডল করে প্রার্থনা শুরু করলাম", বলছিলেন জোরামথাঙ্গা।
প্রার্থনা শেষ হতে না-হতেই কাপ্তাইয়ের তীরে স্পিডবোটে করে এসে নামলেন পাকিস্তানি বাহিনীর একজন মেজর।
"ওই মেজর-ই আমাদের খবর দিলেন, তিনি উত্তর-পূর্ব দিক থেকেই আসছেন - ওদিকে ফারুয়াহ নদীপথে আমরা চাইলে পালিয়ে যেতে পারি।"
"সঙ্গে সঙ্গে বেশ কয়েকটা লঞ্চ আর ভেসেল নিয়ে নেতারা-সহ আমরা সাত-আটশো যোদ্ধা রওনা দিয়ে দিলাম - শীতের সন্ধ্যায় ঘন কুয়াশার মধ্যে ইন্ডিয়ান আর্মি আর মুক্তিকে ফাঁকি দিয়ে আমরা নিরাপদে বের হয়ে এলাম।"
"পাকিস্তানি সেনারা সবাই যেখানে যুদ্ধবন্দী হয়েছিলেন, আমরা কিন্তু কেউ ধরা পড়িনি - আর সে জন্যই অন্যদের কাছে সে দিনটা বিজয় দিবস হলেও আমাদের কাছে ওটা এক্সোডাস ডে", হাসতে হাসতে যোগ করেন মিজোরামের প্রবীণ মুখ্যমন্ত্রী।
তারিখটার তাৎপর্য
আইজলে মিজোরাম ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জে. ডাউঙ্গেলও স্বীকার করেন, মিজো জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ক্যালেন্ডারে এই তারিখটির গুরুত্ব অপরিসীম।
অধ্যাপক ডাউঙ্গেল বিবিসিকে বলছিলেন, "তখন রাঙামাটিতেই ছিল এমএনএফের সদর দফতর। আর যেভাবে ভারতীয় সেনা ও মুক্তিবাহিনী তাদের ঘিরে ফেলেছিল তাতে সত্যিই মিজো গেরিলাদের বাঁচার কোনও আশা ছিল না।"
"তবে অল্প কিছু প্রাণহানি হলেও মিজো ন্যাশনাল আর্মির পুরো নেতৃত্ব কিন্তু সেদিন অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়ে গিয়েছিল।"
"ফলে তার পরেও আরও বহু বছর তারা মিজো জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন", জানাচ্ছেন তিনি।
বস্তুত মিজো আন্দোলন সফল পরিণতি পেয়েছিল বলেই ১৯৮৬তে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী মিজো শান্তি চুক্তিতে সায় দেন।
ওই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরই ১৯৮৭ সালে ভারতের একটি পূর্ণ অঙ্গরাজ্য হিসেবে মিজোরামের আত্মপ্রকাশ, আর মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টও অস্ত্র ছেড়ে যোগ দেয় দেশের মূলধারার রাজনীতিতে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে করাচিতে
ওদিকে '৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে থেকে সফলভাবে পালানোই শুধু নয় - কিছুদিনের মধ্যে মিজো নেতৃত্ব গিয়ে পৌঁছেছিলেন পাকিস্তানের করাচিতেও।
জোরামথাঙ্গা বলছিলেন, "গভীর জঙ্গল আর নদীপথ দিয়ে আমরা সেদিন প্রথমে যাই বার্মার আরাকানে। আরাকান আন্ডারগ্রাউন্ড আর্মিকে আমরা অনেক আগে থেকেই অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সাহায্য করতাম, সেই বন্ধুরাই আমাদের রিসিভ করে ও আশ্রয় দেয়।"
"এরপর প্রায় দু'তিন বছর আমরা বার্মাতেই ঘাপটি মেরে ছিলাম - পরে পশ্চিম পাকিস্তানে যেতে ইচ্ছুক শরণার্থীদের সঙ্গে মিশে গিয়ে রীতিমতো জেমস বন্ডের কায়দায় আমরা রেঙ্গুন থেকে প্লেন ধরে করাচিতে গিয়ে হাজির হই।"
তিনি আরও বলছিলেন, প্রেসিডেন্ট ভুট্টো আর গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর তখনকার প্রধান জেনারেল জিলানি পর্যন্ত তাদের সেখানে দেখে অবাক হয়ে যান।
"ওরা দু'জনেই খুব অবাক হয়ে বলেছিলেন আমরা ভাবতেই পারিনি আপনারা এরকম দু:সাহসিকভাবে পালিয়ে আসতে পারবেন", জানান জোরামথাঙ্গা।
মিজোরামে এখন শাসন ক্ষমতায় আছে এমএনএফ, যারা মনে করে মিজো আন্দোলনকে টিঁকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে ১৬ ডিসেম্বর তারিখটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ইহুদীরা যেভাবে রেড সি পেরিয়ে মিশর থেকে পালাতে পেরেছিল, সেরকমই ঐশ্বরিক কৃপায় তারা সেদিন অসাধ্যসাধন করতে পেরেছিলেন বলে মিজো নেতাদের বিশ্বাস।
সে কারণেই এখনও প্রতি বছর এই দিনটিতে আইজলে এমএনএম অফিসে ধূমধাম করে পালিত হয় এক্সোডাস ডে, এবারেও যার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।












Click it and Unblock the Notifications