ফিরে দেখা ২০২০: করোনা থেকে বিহার নির্বাচন, উল্লেখযোগ্য ঘটনায় স্মরণীয় হয়ে থাকল এই বছর
উল্লেখযোগ্য ঘটনায় স্মরণীয় হয়ে থাকল এই বছর
আর মাত্র কয়েকটা দিন। তারপরই পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাবে বিশ্ববাসী। তবে ২০২০ সালে ঘটে গিয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাব ফেলেছে আমাদের ওপর। করোনা ভাইরাস ও মহামারি ছাড়াও এমন অনেক ঘটনা রয়েছে যা আমাদের দুঃখ, হতাশা, আনন্দকে প্রকাশ করেছে। সেরকমই কিছু ঘটনার কথা বছর শেষে ফিরে দেখা যাক।

ভারতে কোভিড–১৯
ভারতে প্রথম করোনা ভাইরাসের কেস ধরা পড়ে ৩০ জানুয়ারি কেরলের এক মেডিক্যাল পড়ুয়ার শরীরে, যিনি চিনের উহান থেকে ফিরে এসেছিলেন সদ্য। এরপরই দ্বিতীয় ও তৃতীয় করোনা কেসও ধরা পড়ে এই রাজ্য থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে। কেরল খুব দ্রুত কেসগুলি সনাক্ত করে রোগী ও তাঁদের সংস্পর্শে আসা সকলকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠিয়ে দেয়। যদিও মার্চে এই সংক্রমণ দিল্লি, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু ও অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।
১-২১ মার্চ দিল্লির নিজামুদ্দিনে তাবলিঘি জামাতের জমায়েত দেশে এই মারণ ভাইরাসকে অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করে। করোনা কেস বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিশ্বের সবচেয়ে কড়া লকডাউন ২৪ মার্চ থেকে ঘোষণা করেন, যা চূড়ান্ত অর্থনীতি ও সামাজিক কার্যকলাপকে স্থগিত করে দেয়। দেশে জরুরি পরিষেবা ছাড়া সবকিছুই বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য পরিষেবা একরকমভাবে ভেঙে পড়ে, বাড়তে থাকা কেসগুলিকে সামাল দিতে দেশজুড়ে বেসরকারি হাসপাতালে অস্থায়ী আইসোলেশন সেন্টার তৈরি করা হয়। খুব শীঘ্রই ভারত সব দেশকে অতিক্রম করে বিশ্বের দ্বিতীয় উচ্চ করোনা কেসের দেশ হয়ে ওঠে। বর্তমানে ভারতে করোনা আক্রান্ত ৯০ লক্ষ অতিক্রম করেছে। তবে সক্রিয় কেসের সংখ্যা ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
দেশবাসীর এখন একটাই আশা করোনা ভ্যাকসিনের ওপর, যা মাত্র কিছুটা দূরে রয়েছে। ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্য মন্ত্রী হর্ষ বর্ধন ঘোষণা করেছেন যে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে করোনা ভ্যাকসিন উপলব্ধ হয়ে যাবে, আগামী জুলাই-অগাস্টের মধ্যেই ২৫-৩০ কোটি মানুষের জন্য ৪০-৫০ কোটি ভ্যাকসিন ডোজ উপলব্ধ হবে। তবে প্রথম অগ্রাধিকার পাবে স্বাস্থ্যকর্মী ও সামনের সারিতে থাকা জরুরি পরিষেবার কর্মীরা। এরপর ৬৫ বছর বা তার উর্ধ্বে থাকা বয়স্ক ব্যক্তিরা এবং ৫০-৬৫ বছরের মধ্যে থাকা বয়স্করা এই ভ্যাকসিন পাবেন। তবে দেশের ১.৩ বিলিয়ন জনসংখ্যার জন্য ভ্যাকসিন উপলব্ধ হতে একটু সময় লাগবে।

পরিযায়ী শ্রমিকদের যাত্রা
ভাইরাস সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে আচমকাই লকডাউন ঘোষণা করে দেওয়া হয়। যার ফলে ভারতে মানবিক সঙ্কট শুরু হয়। এই লকডাউনের প্রভাব পড়ে ৪০ কোটি পরিযায়ী শ্রমিকের ওপর। মার্চ মাসে লকডাউনের পরই মুম্বই ও প্রতিবেশি জেলাগুলি থেকে পরিযায়ীরা নিজেদের বাড়ি গুজরাত ও রাজস্থানের দিকে যাত্রা শুরু করে, যা ক্রমে গণযাত্রায় পরিণত হয়। এই ধরনের যাত্রা শেষ দেখা গিয়েছিল দেশভাগের সময়। বহু পরিযায়ী শ্রমিক পায়ে হেঁটে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের গ্রামে যাচ্ছেন। এরপর ১ মে কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ স্রমিক ট্রেন চালু করা হয়। তবে এখনও অনেকেই তাঁদের গন্তব্য পৌঁছাতে পারেননি।
অনেক পরিযায়ী শ্রমিকই এই সফর করতে গিয়ে মারাও গিয়েছেন। যদিও সরকারের কাছে ঠিক কতজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এ সংক্রান্ত কোনও তথ্য নেই, তবে রোড সেফটি এনজিওর কাছে এই লকডাউনের সম পথ দুর্ঘটনায় ১৯৮ জন শ্রমিকের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। এছাড়াও অনেক শ্রমিকই অনাহারে, হিটস্ট্রোকে ও ক্লান্তিতেও মারা গিয়েছেন।

ভারত–চিন সংঘর্ষ
গোটা ২০২০ সাল লাদাখ সীমান্তে ভারত-চিন উত্তেজনা জারি থাকল। সীমান্তে সমস্যার খবর মে মাস থেকে আসতে শুরু করে। জানা যায়, পূর্ব লাদাখ সীমান্তে হিংসাত্মক সংঘর্ষে ২৫০ জন সৈন্য জড়িত ছিল ৷ ৫ মে সন্ধ্যায় সংঘর্ষ শুরু হয় এবং পরদিন বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেয় ৷ অন্যদিকে সেই সপ্তাহেই এক পৃথক ঘটনায় সিকিমের নাকু লা পাসে ভারত ও চিনের ১৫০ জন সেনা সংঘর্ষে যুক্ত ছিল ৷ তাতে উভয় পক্ষের ১০ জন সেনা আহত হয় ৷ এরপরই ভারত-চিন সীমান্তের অশান্তির বিষয়টি সামনে এসেছিল। এই পরিস্থিতিতে ১৫ জুন রাতে পূর্ব লাদাখে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় চিন ও ভারতের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। দু'পক্ষই পাথর ছুঁড়তে থাকে এবং দুই দেশের সেনার মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এই ঘটনায় ১১ জন সৈনিক আহত হন এবং তিনজন শহিদ নিহত হন।
ভারতীয় সেনার তরফে জানানো হয়েছিল, অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে জখম সেনাদের মধ্যে ১৭ জনের মৃত্যু হয় ৷ অন্যদিকে, এই সংঘর্ষে চিনের ৪৩জন সেনা হতাহত হয়েছে বলে জানিয়েছিল ভারতীয় সেনা ৷ সেনার তরফে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছিল, গালওয়ান ভ্যালিতে সেনা প্রত্যাহারের সময় সংঘর্ষ বাধে ৷ সংঘর্ষে ভারতের একজন আধিকারিক ও দুই জওয়ান শহিদ হন৷ ঘটনার একদিন পর জানা যায়, এই সংঘর্ষে মৃত্যু হয়েছে চিনের এক কমান্ডিং অফিসারেরল ৷ কিন্তু, বিষয়টি নিয়ে চিনের তরফে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি ৷
ভারত-চিন সংঘর্ষের কারণে দেশে চিন-বিরোধিতা শুরু হয়, যার ফলে চিনের সব পণ্য বর্জন করা হয় এবং ভারতের পক্ষ থেকে ৫৯টি চিনের মোবাইল অ্যাপ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

ঘূর্ণিঝড় আম্ফান
২০০৭ সালের পর গাঙ্গেয় উপকূলে সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ভারতের পূর্ব উপকূল তছনছ করে দেয়। এ বছরের মে মাসে আসা এই ঝড়ের দাপটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ। এই ঝড়ে ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৭ জন কলকাতার, রাজ্যে প্রায় ১ লক্ষ কোটি ক্ষতি হয়েছে। কেন্দ্র সম্প্রতি এই ঝড়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির জন্য ২,৭০৮ কোটি টাকার অনুদান দিয়েছে।

জিডিপি ২৩.৯ শতাংশ সঙ্কুচিত
২০২০ সালের এপ্রিল-জুন সময়কালে ভারত জিডিপিতে ২৩.৯ শতাংশ কমেছে। কঠোর লকডাউন ব্যবস্থা, যা অর্থনীতির উপর বিশাল এক চাপ সৃষ্টি করেছিল, তাতে কৃষিকাজ বাদে সমস্ত ক্ষেত্রই বিশাল ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছিল। উৎপাদন খাতে স্থিত মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি (জিভিএ) ৩৯.৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে নির্মাণ, বাণিজ্য, ভ্রমণ ও আতিথেয়তা ইত্যাদির শিল্পগুলি খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। নভেম্বরে আরবিআইয়ের মাসিক বুলেটিনটি পরপর দ্বিতীয় প্রান্তিকে সঙ্কোচনের পূর্বাভাস দিয়েছে, যার অর্থ ভারত তার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি প্রযুক্তিগত মন্দায় প্রবেশ করেছে।

সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যা
এ বছরের জুন মাসের ১৪ তারিখ বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যু গোটা দেশকে অত্যন্ত অবাক করে দিয়েছিল। মুম্বইয়ের বান্দ্রার বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় সুশান্তের ঝুলন্ত দেহ। অভিনেতার মৃত্যু যে আত্মহত্যা এবং সেটা পেশাগত সমস্যা থেকে মানসিক অবসাদের রূপ নিয়েছিল এটাই ছিল প্রাথমিক ধারণা। রাজপুতের মৃত্যু নিয়ে কঙ্গনা রানাওয়াত সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করেন যে তিনি মানসিক অবসাদের রোগী ছিলেন না, তিনি বলিউডের স্বজন পোষণের শিকার হয়েছিলেন। এই তত্ত্বকে অনেকেই মানতে শুরু করেন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সুশান্তের মৃত্যুর বিচার নিয়ে সরব হন নেটিজেনরা। এই মৃত্যুর জেরে বেশ কিছু বলিউড সেলেবদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়। যত দিন যায় এই মৃত্যু তদন্তে নতুন নতুন মোড় আসতে শুরু করে। ইডি, সিবিআই ও নার্কোটিক্স এই তদন্তে সামিল হয়। সুশান্ত সিংয়ের মৃত্যু কাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে যায় বলিউড মাদক কেস। যার জন্য সুশান্তের প্রেমিকা তথা অভিনেত্রী রিয়া চক্রবর্তী গ্রেফতার হন। এনসিবির জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয় দীপিকা পাড়ুকোন, সারা আলি খান, শ্রদ্ধা কাপুর ও রাকুল প্রীত সিংয়ের মতো বলিউডের অভিনেত্রীদের। তবে শেষ পর্যন্ত সিবিআইও সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে তদন্ত শেষ করে।

ভারত ইউএনএসসিতে নির্বাচিত
বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হওয়ার পর, ২০২০ সালের ১৮ জুন ভারত দু'বছরের জন্য অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রপুঞ্জের সুরক্ষা কাউন্সিলের (ইউএনএসসি) সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। এটি দেশের অষ্টম মেয়াদ, এর আগেরটি ছিল ২০১১-১২ সালে। ২০২১-২২ সালের জন্য এশিয়া-প্যাসিফিক রিজিওনে ভারত ছিল একক প্রার্থী। দীর্ঘদিন ধরে ভারত ইউএনএসসিতে স্থায়ী আসন পাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি ভারতের মেয়াদ শুরু হবে এবং কাউন্সিলে আরও ১৫ জন সদস্য-পাঁচ জন স্থায়ী এবং ১০ জন অস্থায়ীভাবে যোগদান করবে।

অযোধ্যায় রাম মন্দিরের নির্মাণ শুরু
৫ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অযোধ্যায় ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন এবং এরপরই মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ৪০ কেজির রূপোর ইঁট ভিত্তি প্রস্তর হিসাবে বসানো হয়। ২০১৯ সালেই সুপ্রিম কোর্ট অযোধ্যায় রাম মন্দির তৈরির রায় দেয়। ১৯৯১ সাল থেকে বিজেপির নির্বাচনী হাতিয়ার ছিল এই রাম মন্দির। গত তিন দশক ধরে বিজেপি এই রাম মন্দির তৈরি করা নিয়ে লড়ে চলেছে। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অবশেষে অযোধ্যার বিতর্কিত জমি হিন্দুদের বলেই রায় দেয় আদালত। রাম মন্দির নির্মাণ করতে ৩৬-৪০ মাস সময় লাগবে। মন্দির তৈরির পর সেখানে রাম লল্লাকে স্থাপন করা হবে, যিনি বর্তমানে অস্থায়ী মন্দিরে রয়েছেন।

বিহার নির্বাচন
মহামারির মধ্যেই অক্টোবর ও নভেম্বরে তিনটে পর্যায়ে প্রথম বিহার বিধানসভা নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনের ওপর পাখির চোখ ছিল সব রাজনৈতিক দলের। এই নির্বাচনে বিজেপি ১১০টির মধ্যে ৭৪টি আসন জয় করে এবং জেডি (ইউ) ১১৫টি আসনের মধ্যে মাত্র ৪৩টি আসন পায়। ১১০টি আসনে জয়লাভ করে মহাগাঁটবন্ধন তাদের বিপরীতে থাকা জোটকে টক্কর দেয়। ৭৫ টি আসনে জয়লাভ করে আরজেডি বিধানসভায় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠে এবং তেজশ্বী যাদব রাজ্যের রাজনীতির নতুন তারকা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। অনেক নাটকীয় মোড়ের পর বিহারের সিংহাসনে ফের নীতীশ কুমারই মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসেন।

আইপিএল ২০২০ জিতল মুম্বই ইন্ডিয়ান
মহামারির মধ্যে ১৩তম সিজনের আইপিএল, যা শুরু হওয়ার কথা ছিল ২৯ মার্চ, কিন্তু লকডাউনের কারণে তা পিছিয়ে যায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে গত ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত চলে এই মরশুমেতর আইপিএল খেলা। খেলা চলাকালীন বেশ কিছু ক্রিকেটার কোভিডে আক্রান্ত হন। তবে এ বছরে পঞ্চমবার আইপিএল জিতে রেকর্ড গড়ল মুম্বই ইন্ডিয়ান।












Click it and Unblock the Notifications