লকডাউনের বদলে নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি, ট্রেন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় মুম্বই ছাড়ছেন বহু পরিযায়ী শ্রমিক
লকডাউনের বদলে নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি, ট্রেন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় মুম্বই ছাড়ছেন বহু পরিযায়ী শ্রমিক
মহারাষ্ট্রে করোনা পরিস্থিতি রীতিমতো আতঙ্ক ধরিয়েছে গোটা রাজ্য সহ কেন্দ্রকে। দৈনিক করোনা কেসের বৃদ্ধি বেশ উদ্বেগজনক। এরই মধ্যে কোভিড–১৯ সংক্রমণ রোধ করতে রাজ্য সরকার বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, যা পূর্ণ লকডাউনের পরিস্থিতিকে আটকাতে পারবে। তবে পরিযায়ী শ্রমিকরা জানিয়েছেন যে গত বছরের মতোই একই ধরনের সতর্কতা জারি হয়েছে এবং তাই তাঁদের দৈনিক মজুরির ওপর তা প্রভাব ফেলবে ব্যাপকভাবে।

ঘরে ফিরছে শ্রমিকরা
অনেক শ্রমিক জানিয়েছেন যে তাঁরা বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। অনেকেই লকডাউন হবে এই অনুমান করে গত ২দিন ধরে মুম্বই ছেড়ে নিজেদের রাজ্যে ফিরে যাচ্ছেন। অনেক শ্রমিকই জানিয়েছেন যে গত বছরের মতো ট্রেন পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই তাঁরা বাড়ি ফিরে যেতে চান। গত বছরের মতো স্টেশনগুলিতে দূরপাল্লার ট্রেনের জন্য প্রচুর ভিড় লক্ষ্য করা যায়নি। ২০২০ সালে শত শত শ্রমিক বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তরপ্রদেশে ফিরে যাওয়ার ট্রেন ধরতে স্টেশনগুলিতে ভিড় জমিয়েছিলেন।

ট্রেন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা শ্রমিকদের মধ্যে
কুর্লার লোকমায়া তিলক টার্মিনাস, যেখান থেকে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের ট্রেন ছাড়ে, সেখানে গত ২দিন ধরে যাত্রী সংখ্যা ক্রমশঃ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন এক আধিকারিক। মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরের নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা শোনার পর রবিবার রাতে কিছুজন শ্রমিক স্টেশনে চলে আসেন, যদিও শ্রমিকদের বেশিরভাগই নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য আগে থেকে টিকিট কেটে রেখেছিলেন। মহাপে, তুর্ভের রেডি মিক্স কনক্রিট গাড়ির চালক সোনু প্যাটেল নতুন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এলটিটিতে এসে পৌঁছান। গত বছর দেশজুড়ে লকডাউন জারি হওয়ার পর প্যাটেল ও তাঁর অন্য সহকর্মীরা পায়ে হেঁটে উত্তরপ্রদেশ পৌঁছান। প্যাটেল বলেন, 'গত বছর আমি আমার বাড়ি জনপুরে পৌঁছেছি পায়ে হেঁটে। কিন্তু আমি আর সেই একই পরিস্থিতিতে আটকে পড়তে চাই না। গাড়ির মালিকও জানিয়ে দিয়েছেন যে সরকার নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করায় আর কোনও কাজ হবে না। আমার কাছে এখন কাজ নেই। সরকার ট্রেন বন্ধ করার আগে ফিরে যাওয়াই সমুচিন।'

কাজ নেই বাণিজ্যনগরীতে
আরপিএফের এক সুরক্ষা কর্মী, যাঁকে এলটিটিতে ভিড় পরিচালনা করার জন্য মোতায়েন করা হয়েছে, তিনি জানিয়েছেন যে গত ২দিনে যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে গত বছর লকডাউনের সময় যে পরিমাণ ভিড় ছিল, এটা তার চেয়ে অনেক কম। উত্তরপ্রদেশের গোন্ডা জেলার পরিযায়ী শ্রমিক সোহনলাল জানিয়েছেন যে তাঁর কাছে না আছে কাজ আর না আছে অর্থ, তাই তাঁরা ঠিক করেছেন যে শহর ছাড়বেন। সোহনলাল ও তাঁর দু'জন বন্ধু কুশিনগর এক্সপ্রেস ধরে বাড়ি যাওয়ার জন্য এলটিটি স্টেশনে এসেছেন। সোহনলাল ছোটখাটো কাজ করতেন এবং কুরঞলার কাছে কল্পনা টকিজে থাকতেন। তিনি বলেন, 'আমরা ফেব্রুয়ারিতে ফিরেছি, এটা আশা করে যে কিছু না কিছু কাজ পাব। কিন্তু গত ২ মাস ধরে কোভিড-১৯ কেস বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আমরা কোনও কাজ খুঁজে পাচ্ছি না। নতুন নিষেধাজ্ঞা যখন জারি হল, আমরা কোনও কাজ পাইনি। আমাদের কাছে টাকাও নেই যে এখানে থাকব। গ্রামে আমরা কৃষিকাজ করেও বেঁচে থাকতে পারি।'

অসহায় পরিযায়ী শ্রমিক
পেশায় রঙ মিস্ত্রি মুস্তাফা শাহের গলায় শোনা গেল একই হতাশা। মালবানির বাসিন্দা মুস্তাফা জানান তিনি দু'টি বাড়ি রঙ করার কনট্রাক্ট পেয়েছেন। কিন্তু রবিবার মহারাষ্ট্র সরকারের নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করার পর দু'টি কাজই স্থগিত হয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন, 'গ্রাহকরা তাঁদের বাড়িতে রং মিস্ত্রিদের ঢোকাতে ভয় পাচ্ছেন। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে আমাদের দৈনিক মজুরির ওপর প্রভাব পড়বে।' প্রসঙ্গত, গত বছরের জুনে শাহ বিহারে ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু ২ মাস কোনও চাকরি না পাওয়ায় তিনি ফের মুম্বই ফিরে আসেন। কোভিড-১৯ কেস পুনরায় বাড়ার আগে তাঁর কাজ বেশ ভালোই চলছিল।

গত বছরের মতো ভিড় নেই স্টেশনে
মধ্য ও পশ্চিম রেলের আধিকারিকেরা জানিয়েছেন যে রবিবার রাতে অগ্রিম বুকিংয়ের কোনও অগ্রগতি বা স্টেশনে কোনও অস্বাভাবিক ভিড় তাঁদের নজরে আসেনি। মধ্য রেলের এক অধিকর্তা বলেন, 'মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে, ভিড় হ্রাস করতে আমরা সেকেন্ড ক্লাস কমপার্টমেন্টের জন্য আগাম বুকিং পদ্ধতি চালু করেছি। ট্রেনে ওঠার আগে যাত্রীরা আগে থেকে টিকিট বুক করে রাখছেন।' যাত্রীদের কাছে বৈধ টিকিট থাকলে তবেই প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করা যাবে।

কাজ হারিয়েছেন বহু পরিযায়ী
ঘর বাঁচাও ঘর বানাও প্রকল্পকে সামনে রেখে অম্বুজওয়াড়ি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় কর্মরত অখিলেশ রাও জানিয়েছেন যে পরিযায়ী শ্রমিকরা আতঙ্কিত হয়ে ফোন করে জিজ্ঞাসা করছেন যে তাঁরা কি বাড়ি ফিরে যাবেন। তিনি বলেন, 'সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ণ লকডাউন ঘোষণা না করা হলেও এই নিষেধাজ্ঞার জন্য অনেকেই কাজ হারিয়েছেন।' গোবান্দির বাসিন্দা জামিলা সাহুল বলেন, 'আমাদের আজকে বস্তি এলাকায় বৈঠক রয়েছে। অনেকেই রয়েছেন যাঁরা গ্রামে ফিরতে চাইছেন না কারণ সেখানেও কাজ নেই। যদি সব কিছু বন্ধ হয়ে যায় শ্রমিকরা চাইছেন যে সরকার তাঁদের প্রতিদিন খাবারটা অন্তত দিক।'

নৈশ কার্ফু প্রভাব ফেলেছে ব্যবসায়
৩২ বছরের মহেশ বৈশ্য, উত্তরপ্রদেশের পরিযায়ী শ্রমিক, যিনি দাদারে সবজি বিক্রি করেন। তিনি বলেন, 'নৈশ কার্ফু আমাদের ব্যবসায় প্রভাব ফেলেছে মারাত্মকভাবে, অনেক গ্রাহকই রাত ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে সবজি কিনে চলে যাচ্ছেন। গত আটমাস যাবৎ আমার সবজির দোকান বন্ধ ছিল এবং আমি আমার ব্যবসা তিনমাস আগেই ফের শুরু করি। আমার স্ত্রী ও তিন সন্তানকে খাওয়াতে হয়।' বৈশ্য প্রতাপগড়ের বাসিন্দা এবং এখানে খারের বস্তি এলাকায় থাকেন।
প্রতীকী ছবি












Click it and Unblock the Notifications