না জুটছে খাবার, না আছে কাজের আশা, তাই মাইলের পর মাইল হেঁটে বাড়ি ফিরছে ওঁরা
না জুটছে খাবার, না আছে কাজের আশা, তাই মাইলের পর মাইল হেঁটে বাড়ি ফিরছে ওঁরা
কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আটকে থাকা পরিযায়ী শ্রমিকদের ফেরাতে বিশেষ ট্রেন–বাসের ব্যবস্থা করলেও, এখনও অমেক পরিযায়ীরাই সরকারের ওপর ভরসা না রেখে নিজেরাই পা বাড়িয়েছেন বাড়ির পথে। 'যদি মরতেই হয় তবে নিজের বাড়িতে গিয়ে মরব। এই শহরে মরব না। জানিয়েছেন ৩৬ বছরের কুমার, নিজের সন্তানের মাথা ভেজা কাপড় দিয়ে মুড়ে নিয়েছেন, ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা মাথায় নিয়ে জ্বলন্ত নয়ডা এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে বাড়ির পথে চলেছেন।

কিছুই আর বাকি নেই, তাই ফিরছি বাড়ি
কুমার তাঁর সাইকেলে তিন সন্তানকে বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর ১১ বছরের কন্যা বসেছিল সাইকেলের পেছনে এবং ৯ ও ৫ বছরের দুই ছেএ সাইকেলের সামনের আসনে বসেছিল। তাঁরা বিহারের রোহিতাস জেলায় তাঁদের গ্রামে ফিরছিলেন। নয়ডা এক্সপ্রেস থেকে যার দুরত্ব ৯৮০ কিমি। অভাবনীয় এক লম্বা সফর যেটি কুমার সাইকেলে করে পার করবেন স্থির করেছেন, তার পাশ দিয়েই পায়ে হেঁটে চলেছেন বহু শ্রমিক। কুমার ২২ জনের একট দলের সঙ্গে ছিলেন, প্রত্যেক দিন মজুর নয়ডাতে কাজ করেন এবং ৯০০ কিমি হেঁটে বিহারে যাচ্ছেন তাঁরা। কুমার বলেন, ‘কিচ্ছু বাকি নেই এখানে আমাদের। বাড়ি যাওয়াই শ্রেয়।' কুমার সেইসব লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে একজন যিনি করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে শহরের আশ্রয় ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁরা এখানে এসেছিলেন কিছু স্বপ্ন ও আশা নিয়ে কিন্তু পায়ে ফোস্কা নিয়ে আশাহত হয়ে ফিরতে হচ্ছে বাড়ি।

অনেকের মতে পরিযায়ীরা অপেক্ষা করতে পারতেন
ভারতের উচ্চ শ্রেণীদের মতে শ্রমিকরা অপেক্ষা করতে পারতেন বা কেন্দ্রের সহায়তা কেন নিলেন না তাঁরা এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিতর্ক কম নেই। এতটাও কি অসহ্য হয়ে উঠেছিল তাঁদের জীবন যে তাঁরা কয়েকশো কিলোমিটার হেঁটে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। পরিযীয়ী শ্রমিকদের অনেকেই পথ দু্র্ঘটনাতে রাস্তাতেই বা ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গিয়েছেন, কেউ কেউ জল বা খাবার না খেয়েই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। অনেকেই তাই পরিযায়ীদের কাছে প্রশ্ন করেছেন যে এমন কি হল যে তাঁরা বাড়ি ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

নিঃস্ব হয়ে বাড়ি ফিরছেন পরিযায়ী শ্রমিকের দল
কুমার বলেন, ‘বাড়িতে অন্তত আমি সম্মানটুকু তো পাই। এখানে তো সন্তানদের মুখে তুলে দেওয়ার মতো খাবারও নেই। কোনও রেশন পাই না আমরা। ১০টি পরিবারকে ২টি পরিবারের রেশন দিচ্ছে। আমরা যদি ওই নরকে মরেও যাই তবে কারোর কিছু হবে না।' কুমারের দলের এক মহিলা বলেন, ‘না খাবার আছে, না কাজ আছে। আপনি নিজেই ভাবুন আমাদের কি বাজে অবস্থা হতে পারে আমরা এত দূর হেঁটে যাচ্ছি। বিহার তো আর দিল্লির পাশেই নয়।' তাই তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে হেঁটে ফিরবেন। হাল্কা কিছু নিয়ে তাঁরা দলবেঁধে হেঁটে চলেছেন। প্রত্যেক দু'ঘণ্টা অন্তর অন্তর তাঁরা থামছেন বিশ্রামের জন্য। পরিযায়ী শ্রমিকরা বলেন, ‘ওখানে তো কেউ কিছু দিতেও আসত না। অন্তত এখানে রাস্তার অন্যান্য লোকেরা এগিয়ে এসে শিশুদের কেক, বিস্কুট তো দিচ্ছে।'

শ্রমিক ট্রেনে করে ফিরতে নারাজ অনেক পরিযায়ী
মে মাসে পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশেষ ট্রেনের বন্দোবস্ত করে সরকার। এই বিশেষ ট্রেনের নাম শ্রমিক ট্রেন এবং রাজ্য সরকারগুলি ব্যবস্থা করেছে। সরকারের দাবি অনুযায়ী ১০ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিককে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে ৮০০টি শ্রমিক স্পেশাল ট্রেন। তবে যত সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিক বাড়ি যেতে চান সে তুলনায় ট্রেনের সংখ্যা অতি সামান্য, এমনকি ট্রেনের ভাড়া নিয়েও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও অনেক রাজ্যেরই দাবি টারা টিকিটের ভাড়া বহন করছে। রিপোর্টে জানা গিয়েছে, বিভিন্ন রাজ্যের শ্রমিকদের ট্রেনের স্লিপার ক্লাসের জন্য ৪০০-১০০০ টাকা গুনতে হচ্ছে। অনেক পরিযায়ী শ্রমিকই অভিযোগ করে জানিয়েছেন যে পর্যাপ্ত পরিমাণে শ্রমিক ট্রেন নাথাকার কারণে তাঁদের হেঁটে ফিরতে হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত দিল্লি থেকে বিহারগামী ৪টে ট্রেন চলাচল করেছে।












Click it and Unblock the Notifications