২৫০০ বছর আগে বিশেষ শ্লোকের মাধ্যমে নারী স্বাধীনতার পরিচয় দিয়েছিলেন এই মহিলারা
বর্তমান সমাজে যখন শিশু কন্যা, মহিলাদের ওপর, দলিতদের ওপর ভয়ানক অত্যচার চলছে ,হিন্দু ধর্মের নামে এত বুজরুকি তখন ২৫০০ হাজার বছর পূর্বের নারী জাগরণ ভারতবর্ষের এক আলোকময় ইতিহাস কে স্মরণ করায়। সেটি কী ? থেরীগাথা - স্বাধীনতার সঙ্গীত। যা শুরু হয়েছিল গৌতম বুদ্ধের সৎ মায়ের হাত ধরে।

থেরীগাথা কথাটির অর্থ কি?' পালি ভাষায় থেরী 'মানে বয়স্কা আর' গাথা 'শব্দের অর্থ শ্লোক। বৌদ্ধ ধর্মে পালী ভাষায় বয়স্কা সন্ন্যাসীনি অথবা জ্ঞানী ভিক্ষুকনীদের লিখিত শ্লোকাবলীকেই থেরীগাথা বলা হয়। বোঝানো হয়েছে। এই কবিতাগুলো বা শ্লোকগুলো প্রায় ২৫০০ বছর পুরোনো। এতে ৭৩ টি শ্লোক লিপিবদ্ধ আছে। ১৬ টি অধ্যায়ে ভাগ করা আছে। বুদ্ধদেবের বাণীএই সন্নাসিনীদের প্রত্যেককে এক নতুন জীবন দান করেছিল। সহজ ভাষায় সন্নাসিনীরা নিজেদের জীবনের কষ্ট, অতৃপ্তির কথা এবং বুদ্ধদেবের বাণী উপলব্ধি করে তাদের যে আধ্যাত্মিক উত্তরন হয়েছিল ,তাই কবিতা ও শ্লোকের মাধ্যমে প্রকাশ করে গিয়েছেন। যুগের নিরিক্ষায় এ ছিল অভূতপূর্ব। এগুলোকে বলা হয়, " ভারতবর্ষে মহিলাদের লেখা প্রথম সাহিত্য সংগ্রহ।" এর শুরুটা হয়েছিল কীভাবে ? বুদ্ধদেবের জন্মকাল আনুমানিক খৃঃপূর্ব ৫৬৩ জন্ম এবং খৃঃপূর্ব ৪৮৩ তে মৃত্যু। যখন মাত্র ৭ দিন বয়স তখন তাঁর মায়ের মৃত্যু হয । তিনি সৎমা মহাপ্রজাপতি গৌতমী দ্বারা পালিত হন। সংসার ধর্ম তাকে আকৃষ্ট না করায়,মহা নির্বান লাভের জন্য গৃহত্যাগী হন। তিনি নিজেকে কখনও জ্ঞানী বলে প্রচার করেন নি বরঞ্চ ধর্ম প্রচারক বলেছেন।জ্ঞান লাভের পরবর্তী কালে সঙ্ঘ স্থাপন করে ওনার উপলব্ধি প্রচার করেন। সেই সময় মহিলা দের সমাজে খুব উচ্চ স্থান প্রদান করা হোতো না। অনেকে দাসী বৃত্তি করে কষ্টে জীবন যাপন করতেন। সংসারের দুঃখিনী মহিলারা যখন বুদ্ধের কাছে সংঘে সন্নাসীনি হয়ে বাস করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, বুদ্ধ একেবারেই উৎসাহিত হন নি। গৌতমী তিনবার তাঁকে অনুরোধ করেন , তিনবারই বুদ্ধদেব অস্বীকার করে বৈশালীতে চলে যান। এমনকি তিনি তাঁর পালিকা মাতা 'মহা প্রজাপতি গৌতমীর' সঙ্ঘে থাকারও বিরুদ্ধে ছিলেন। গৌতমী অগত্যা মুন্ডিত মস্তকে ৫০০ শাক্য মহিলাদের সাথে পথের কষ্ট উপেক্ষা করে বৈশালী তে উপস্থিত হন। ভ্রাতাসম শিষ্য 'আনন্দ' বুদ্ধদেবকে অনুরোধ করেন সংঘে মহিলাদের স্থান দেবার জন্য। অবশেষে বুদ্ধ প্রবজ্যাদের সংঘের নিয়মাবলী পালন করে থাকার অনুমতি দেন।
কেন বুদ্ধদেব সংঘে ভিক্ষুণীরা প্রবেশ করতে অস্বীকার এইজন্য করেছিলেন কারন ওনার ভয় ছিল এতে তাঁর ধর্ম দীর্ঘকাল স্থায়ী হবেনা, শীঘ্রই লোপ পাবে। সন্নাসশ্রমী ভিক্ষুদের এই মর্মে স্ত্রীজাতির প্রতি ব্যাবহার করতে উপদেশ দেন," বয়োজ্যেষ্ঠ রমণীকে মাতৃতুল্য, যুবতীকে ভগিনী তুল্য, অল্পবয়সী বালিকা কে দুহিতা সমান জ্ঞান করতে হবে" । মহাপ্রজাপতি নিজের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার ওপর ভরসা করে নিজেকে সঙ্ঘে উচ্চ পদে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং বহু ভিক্ষুকনীকে সংঘে আশ্রয় দেন। এটা ছিল বলা যায় ' community of sisters'। মহা প্রজাপতি গৌতমী সম্বন্ধে বলা হয় উনি ১২০ বছর বয়স অবধি বেঁচে ছিলেন। ওনার লেখা শ্লোক ওনার উচ্চ মার্গের অনুভূতি ব্যখ্যা করে। উনি এবং তার এই বৌদ্ধ ভিক্ষুনীরা বুদ্ধের বাণী ও তাদের জীবন প্রকাশ করেছেন কবিতা এবং শ্লোকের মাধ্যমে । সমাজের সর্বস্তরের মহিলারা অর্থাৎ স্বামী পরিত্যক্তা মহিলা, নির্যাতিতা, বিধবা, পতিতা ও দিশাহারা মহিলারা সংঘের নিরাপত্তায় আশ্রয় লাভ করে অন্তর থেকে তাদের মৌলিক রচনা লিখেছেন। এর থেকে তৎকালীন সমাজের এক সামুদায়িক চিত্র যেমন দাসপ্রথা,বেশ্যাবৃত্তি,পুনর্বিবাহ,জাতিবর্ন ,অস্পৃস্শতার কথা জানা যায়, মহিলারা যথেষ্ঠ উন্নত মনের এবং মৌলিক চিন্তা ধারার অধিকারিণী অবশ্যই ছিলেন এবং সেটা তাদের লেখনীতে প্রকাশ হয়েছে। পালি' ভাষায় ৭৩ টি গাথায় নির্বান অনুভব করে তাঁরা কত পরম শান্তি লাভ করেছেন সে কথাই ব্যক্ত করে গিয়েছেন। এটাই থেরীগাথা।
যেমন গৌতমীর। অল্প বয়সে বিবাহ হয় ও তার এক পুত্র সন্তান হয়। শিশু টি অল্পদিনের মধ্যেই মারা যায়। পুত্র শোকে পাগলিনী মা ছেলের প্রাণ ভিক্ষার আবেদন নিয়ে বুদ্ধের কাছে যায়। বুদ্ধদেব তাকে কোন এক গৃহ হতে একমুঠো সর্ষ দানা নিয়ে আসতে বলেন যেখানে মৃত্যু কখনও হয়নি। এমন কোন একটিও গৃহ খুঁজে না পেয়ে অবশেষে কিসা গৌতমীর জ্ঞান লাভ হয় এবং বুদ্ধের শিষ্যা হন। সুমংগলা তার স্বামীর নির্যাতনের থেকে বেরিয়ে এসে লিখলেন , " free from kitchen and no longer a slave in dirty kitchen pot,and I am through with my brutal husband." ( পালী ভাষায় লেখা)। অর্থাৎ সংসারের যন্ত্রনা থেকে, স্বামী র নিপিড়ন থেকে মুক্তি লাভ করে তিনি স্বাধীন মনোভাব নিয়ে নিজের মনের দুঃখ শ্লোকে ব্যক্ত করেছেন। ভাসেথ্থিও সন্তান হারা হয়ে বিবস্ত্রা হয়ে শ্মশানে থাকতেন। কেউ তাকে বুদ্ধের বাণী শোনায়। ধীরে ধীরে সে তার চিন্তা শক্তি ফিরে পায়। শোকসন্তপ্ত জীবন থেকে মুক্তি পায়।সংঘ জীবনে আশ্রয় পেয়ে জীবনের অর্থ খুঁজে পায় । তিনিও শ্লোকের মাধ্যমে বুদ্ধের বাণী মাহাত্ম্য লিখে গিয়েছেন। ভিক্ষুনী সুজাতা একদা কোনো আনন্দ উৎসব থেকে ফেরার পথে বুদ্ধের বাণী সম্বন্ধে অবগত হন। তিনি তৎক্ষণাৎ পুরোনো জীবনকে পিছনে ফেলে সংঘের অনুগামী হবার সিদ্ধান্ত নেন এবং আপন উপলব্ধি লেখেন। তবে সবাই যে সমাজ পরিত্যক্তা দুঃখিনী ছিলেন তা কিন্তু নয়। অনুপমা ছিলেন এক ধনী কন্যা। তিনিও বুদ্ধের বাণী শুনে গৃহী জীবন পরিত্যাগ করেন। এক অসীম স্বাধীনতার আনন্দ তাকে গাথা লেখায় উদ্বুদ্ধ করে।
এই গাথা গুলো '1st cent.BCE' তে পালি ভাষায় লিখিত ভাবে মেলে। এই শ্লোকাবলীগুলো ছিল সেই সমস্ত মহিলাদের লেখা যারা ছিলেন উন্নত মনা জ্ঞানের আলোকপ্রাপ্তা অর্থাৎ 'enlightened women' এবং তাদের একান্ত অনুভুতি। তাঁরা তাঁদের লেখনী দিয়ে প্রমাণ করে গিয়েছেন মহিলারা তৎকালীন সমাজে আধ্যাত্মিক উপলব্ধিতে পুরুষের সমকক্ষ। কিন্তু 5 th cent.পরবর্তী সময়ে মহিলাদের এই সংঘ - জীবন অবক্ষয়ের পথে চলতে থাকে। ঐতিহাসিকরা মনে করেন সনাতন ধর্মের উত্থান এর প্রধান কারণ ছিল। সেই সাথে মুসলমান রাজত্ব ও বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে বিভেদ।
তথ্য সূত্র : সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিত ' বৌদ্ধ ধর্ম্ম'।
-
ভবানীপুর ও নন্দীগ্রামে উত্তাপ চরমে, শুভেন্দুর বিরুদ্ধে ভয়ের রাজনীতির অভিযোগে মনোনয়ন বাতিলের দাবি তৃণমূলের -
ইডেনে প্রথম জয়ের সন্ধানে কেকেআর-সানরাইজার্স, দুই দলের একাদশ কেমন হতে পারে? -
যুদ্ধ নয়, আলোচনায় সমাধান! হরমুজ ইস্যুতে বৈঠক ডাকল ব্রিটেন, যোগ দিচ্ছে ভারত -
কালিয়াচক কাণ্ডে কড়া বার্তা সুপ্রিম কোর্টের! 'রাজনীতি নয়, বিচারকদের নিরাপত্তাই...', কী কী বলল শীর্ষ আদালত? -
ভোটার তালিকা ইস্যুতে ফের অগ্নিগর্ভ মালদহ, সকালে ফের অবরোধ -
মালদহের ঘটনার তদন্তভার নিল সিবিআই, মমতার তোপে কমিশন -
ভোটের আবহে জলপাইগুড়িতে চাঞ্চল্য, এক্সপ্রেস ট্রেনে জাল নথি সহ ১৪ বাংলাদেশি গ্রেপ্তার, তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা -
'১৫ দিন বাংলায় থাকব', ভবানীপুরে মমতাকে হারানোর ডাক, শাহের চ্যালেঞ্জে তপ্ত রাজনীতি -
কয়লা কেলেঙ্কারির তদন্ত! দেশের বিভিন্ন শহরে আই-প্যাকের দফতর ও ডিরেক্টরের বাসভবনে ইডি তল্লাশি -
কালিয়াচকে প্রশাসনিক গাফিলতি? জেলাশাসক, পুলিশ সুপারকে শোকজ, CBI অথবা NIA তদন্তের নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট -
৫৪ বছর পর চাঁদের পথে মানুষ, ৪ মহাকাশচারী নিয়ে নাসার 'আর্টেমিস ২'-এ ইতিহাসের নতুন অধ্যায় -
'মালদহ কাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড' মোফাক্কেরুল ইসলাম গ্রেফতার, পালানোর সময় বাগডোগরা থেকে ধৃত












Click it and Unblock the Notifications