বিরোধীদের কটাক্ষকে দূরে সরিয়ে বিশ্ব শান্তির দূত মোদী, কীভাবে রাশিয়া-ইউক্রেনকে সামলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী?
রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মাঝে যে দীর্ঘদিন ধরে বিবাদ চলছে, তার প্রেক্ষিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিভিন্ন কূটনৈতিক পদক্ষেপ ভারতকে বিশ্বমঞ্চে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তুলে ধরেছে। সম্প্রতি নরেন্দ্র মোদী ইউক্রেন সফরে গিয়েছেন। গত কয়েক দশকের মধ্যে তিনি প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি এই দেশটিতে রাষ্ট্রীয় সফর করলেন। এবং তাঁর এই সফরের মধ্যে দিয়েই দুটি বিবদমান দেশের সঙ্গে কীভাবে সমদূরত্ব বজায় রেখেও সুসম্পর্ক বজায় রাখা যায়, তা ফের একবার তিনি প্রমাণ করেছেন।
ইউক্রেন এবং রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক বহুদিনের। ফলে দুটি দেশের সঙ্গেই ভালো যোগাযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন ছিল। নরেন্দ্র মোদী সেই কাজটাই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করেছেন। এবং বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে যে অশান্তি চলছে সেখানে শান্তির দূত হয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদীর প্রতিটি পদক্ষেপই একেবারে মাপা। তা সে জি২০ সম্মেলনে ভারতের উদ্যোগ হোক অথবা মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে রাশিয়া এবং ইউক্রেন সফর, প্রতিটি পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই নিজের জাত চিনিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

কূটনৈতিক কৌশল
সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন ছিল, সেই ঠান্ডা যুদ্ধের সময় থেকেই ভারত এবং রাশিয়ার সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ়। ১৯৭১ সালে ইন্দো-সোভিয়েত শান্তি চুক্তি, বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতার যে সমঝোতা হয়েছিল তা দুই দেশে সম্পর্ককে কালক্রমে আরও মজবুত করেছে। রাশিয়া বরাবর ভারতের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীর ভূমিকা পালন করে সমরাস্ত্র, সেনা সামগ্রী এবং প্রযুক্তির জোগান দিয়ে এসেছে। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পরে ইউক্রেনও প্রতিরক্ষা, শিক্ষা এবং কৃষি ক্ষেত্রে ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করেছে।
তবে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের দ্বন্দ্বের মাঝখানে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সহজ ছিল না বিশেষ করে পশ্চিমী দেশগুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিভিন্ন দেশকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সুর চড়াতে চাপ দিয়েছিল। তবে ভারত নিজের অবস্থান অনড় রেখে নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে আলোচনা, সমঝোতা এবং শান্তির পক্ষে সওয়াল করেছে। কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার রাশিয়া এবং ইউক্রেন দুটি দেশের সঙ্গেই আলাদা করে কথা বলেছে। এবং কোনওরকম চাপের কাছে নতিস্বীকার করে রাশিয়াকে একঘরে ঘোষণা করেনি। পশ্চিমী দেশগুলির চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করেও ভারত রাশিয়া থেকে দেশের জনগণের স্বার্থে জ্বালানি তেল কিনেছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ইউক্রেন সফর আদতে শান্তির পক্ষে ভারতের দায়বদ্ধতাকেই ফের একবার সারা বিশ্বে সামনে তুলে ধরেছে। ভারত যে সব পক্ষকে একসঙ্গে নিয়ে চলতে চায় এটা তারই জলজ্যান্ত উদাহরণ। যে ভালোবাসা, অভ্যর্থনা এবং আতিথেয়তা নরেন্দ্র মোদী রাশিয়া এবং ইউক্রেন দুটি দেশের সফরেই পেয়েছেন তা এককথায় প্রমাণ করে, ভারতই একমাত্র দেশ যা পূর্ব এবং পশ্চিমের দেশগুলির মধ্যে সেতুবন্ধন করতে পারে। রাশিয়া এবং ইউক্রেন দুটি দেশেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এতো অভ্যর্থনা পাওয়া আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর এবং ভারতের সম্মানকে অনেকটাই উপরে তুলে ধরেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়
নরেন্দ্র মোদীর ইউক্রেন সফর নিয়ে ভারতের সোশ্যাল মিডিয়াতেও আলোচনার ঝড় উঠেছে। লোকসভা ভোটের সময় যে কটুক্তি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, এবার মোদীর সমর্থকেরা সেই কটুক্তির লাইনকেই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতিতে মোদীর প্রচেষ্টা বলে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন। এবং নরেন্দ্র মোদী যে সত্যিই একজন বিশ্বনেতা, তা ভারতের একাধিক কর্মকাণ্ডে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তবে সমালোচকরা সমালোচনা করা থেকে নিশ্চয়ই থেমে থাকেননি। নরেন্দ্র মোদীর এই সফরের আদৌও কোনও প্রভাব পড়বে কিনা তা নিয়ে তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন। এবং একইসঙ্গে শান্তি ফেরাতে ভারতের পদক্ষেপ কী, সেটাও অনেকে জানতে চেয়েছেন। তবে একটি বিষয় সকলে একমত হবেন যে, নরেন্দ্র মোদী যা করার সাহস দেখিয়েছেন, তা অন্য কোনও দেশ করতে পারেনি। এবং তা হল - রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে একান্ত সাক্ষাৎ। এই একটি বিষয়ই ভারতকে বিশ্ব মানচিত্রে অনেকের থেকে আরও উপরে নিয়ে গিয়েছে।
শান্তির দূত
প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদী যেভাবে ভারত এবং ইউক্রেনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শান্তির পথ প্রশস্ত করার প্রচেষ্টা করছেন তা নিঃসন্দেহে তারিফযোগ্য। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের জোট নিরপেক্ষ অবস্থান ভারতকে বিশ্বস্ততার সূত্রে বেঁধেছে। পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদীর রাশিয়া, ইউক্রেন সহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ভারতকে স্বাভাবিকভাবেই অনেকটা অ্যাডভান্টেজ পজিশনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতা
কৌশলগত স্বাধীনতাকে সম্মান দিয়ে সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখাই নরেন্দ্র মোদীর অন্যতম বড় হাতিয়ার। রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক লেনদেন যথেষ্ট থাকা সত্ত্বেও নরেন্দ্র মোদী ভারতকে আমেরিকার সুনজরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এই ধরনের সমতা ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন কাজ। বিশেষ করে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, যেখানে কোনও একটি শক্তির কাছাকাছি হলে অন্য শক্তি আপনাকে শত্রু বানিয়ে ফেলবে, এরকম অবস্থায় সমতা বজায় রেখে নরেন্দ্র মোদী যেভাবে ভারতকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন, তা এককথায় অনবদ্য। মোদী ভারতের সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বার্থকে সুরক্ষিত রেখে পূর্ব এবং পশ্চিমী বিশ্বের লড়াইয়ের মাঝে না পড়েও দেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন নিজের মতো করে।
বিরোধীরা নিশ্চুপ
যখন নরেন্দ্র মোদীর এই রাষ্ট্রীয় সফর দারুণ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে সেই সময়ে বিরোধীরা, বিশেষ করে কংগ্রেস একেবারে নিশ্চুপ থেকেছে। বিশেষ করে লোকসভা নির্বাচনের সময় যেভাবে রাশিয়া-ইউক্রেন ইস্যুতে বিরোধীরা প্রধানমন্ত্রী মোদীর সমালোচনায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন- তার পরে এখনের ঘটনা নিঃসন্দেহে তাঁদের বড় ধাক্কা দিয়েছে। আর সেজন্যই তাঁরা নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছেন। কারণ একদিকে সমালোচনা করলে দেশবিরোধী তকমা লাগার ভয় এবং অন্যদিকে বিশ্বমঞ্চে ভারতের অগ্রগতিকে অস্বীকার করা। এই দুইয়ের কথা চিন্তা করে বিরোধীরা, বিশেষ করে কংগ্রেস একেবারে স্পিকটি নট।












Click it and Unblock the Notifications