পশ্চিমবঙ্গের আয়তনের চেয়েও বড় সামুদ্রিক এলাকা পেল বাংলাদেশ!

ঘটনাটা কী রকম?
১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙে পাকিস্তান তৈরি হয়েছিল। এখনকার বাংলাদেশ তখন ছিল পূর্ব পাকিস্তান। তখন থেকেই বঙ্গোপসাগরের জলরাশির মালিকানা নিয়ে দু'তরফে মতৈক্য ছিল না। পাকিস্তান যতটা জলরাশির ওপর মালিকানা চেয়েছিল, ভারত তাতে রাজি ছিল না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার পরও জট অব্যাহত থাকে। উত্তাল জলরাশির কতটা ভারতের অংশ আর কতটা বাংলাদেশের, এ নিয়ে যুক্তি-পাল্টা যুক্তি ছিল। ২০০৯ সালে এর নিষ্পত্তি চেয়ে বাংলাদেশ মামলা করে আন্তর্জাতিক আদালতে। তখন সাত-পাঁচ না ভেবেই ভারত এই মামলায় অংশীদার হয়। আর তাতেই হেরে গেল নয়াদিল্লি।
সমুদ্রের বিপুল জলরাশির ওপর কোন দেশের কতটা দখল থাকবে, তা স্থির হয় রাষ্ট্রসঙ্ঘের বেঁধে দেওয়া আইন অনুযায়ী। এর পোশাকি নাম 'ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন অন দ্য ল অফ দ্য সি'। তদনুসারে, সৈকতভূমি থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল (৩৭০ কিলোমিটার) পর্যন্ত এলাকাকে বলে 'এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন' বা নিজস্ব আর্থিক ক্ষেত্র। সমুদ্রের এই এলাকা দিয়ে অন্যান্য দেশের জাহাজ নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারবে। কিন্তু মাছ ধরা বা অন্যান্য সামুদ্রিক সম্পদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে সেই দেশেরই অধিকার থাকবে, যাদের আওতায় ওই 'এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন' পড়ছে।
কোর্টের রায়ের পর ওই এলাকায় আর সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ করতে পারবে না ভারত
বঙ্গোপসাগরে এমনই 'এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন' নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের ঝগড়া চলছিল। আন্তর্জাতিক আদালত ৪,০৬,৮৩৩ বর্গ কিলোমিটার জলরাশিকে 'বিতর্কিত' বলে চিহ্নিত করে মামলা শুরু করেছিল। উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের সম্মিলিত ভূখণ্ডের সমান সমুদ্রের এই পরিমাণ এলাকা। রায় বেরোতে দেখা গেল, সেই চিহ্নিত জলরাশির ৩,০০,২২০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা পেয়েছে ভারত। বাকি ১,০৬,৬১৩ বর্গ কিলোমিটার জলরাশি গিয়েছে বাংলাদেশের দখলে।
আপাত অর্থে মনে হওয়া স্বাভাবিক, ভারতই লাভবান হল। কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়। কারণ বিদেশ মন্ত্রকের মতে, আসলে 'বিতর্কিত' এলাকা হল ১,৭২,২১৯.৭ বর্গ কিলোমিটার। সেই দিক থেকে দেখলে, ১,০৬,৬১৩ বর্গ কিলোমিটার জলরাশি পেয়েছে বাংলাদেশ। ৬৫,৬০৬.৭ বর্গ কিলোমিটার জলরাশির দখল পেয়েছে নয়াদিল্লি। এখন থেকে ওই ১,০৬,৬১৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকা বাংলাদেশের 'এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন' হিসাবে বিবেচিত হবে। এতদিন ভারতীয় মৎস্যজীবীরা ওখানে মাছ ধরতে যেতেন। খনিজ তেলের বিপুল সঞ্চয়কে চিহ্নিত করে কাজও শুরু করে দিয়েছিল ওএনজিসি। এ বার তাদেরও তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে আসতে হবে। প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গের আয়তন ৮৮,৭৫২ বর্গ কিলোমিটার। যে পরিমাণ সামুদ্রিক এলাকা ভারত হারাল, তা তাই পশ্চিমবঙ্গের আয়তনের চেয়ে বেশি।
সংশ্লিষ্ট মামলায় আন্তর্জাতিক আদালতের বেঞ্চে পাঁচ বিচারপতি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন ভারতের। পেম্মারাজা শ্রীনিবাস রাও। তিনি এই রায়ের সঙ্গে একমত হননি। কিন্তু বাকি চারজন বিচারপতি একমত হওয়ায় ৪-১ ভোটে হেরে যান তিনি। ফলে বাংলাদেশের অনুকূলে রায় যায়।
কূটনীতিক মহলের বক্তব্য, ভারতের আইনি যুক্তি প্রথম থেকেই নড়বড়ে ছিল। তাদের যুক্তিতে সারবত্তা ছিল না, ব্যাপারটা এমন নয়। আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা লড়তে গেলে যে ধরনের আইনি আটঘাট বেঁধে নামা দরকার, তা ভারত করেনি। খুবই হালকা চালে আদালতে সওয়াল করেছে। তারই মাশুল দিতে হয়েছে গোহারা হেরে।












Click it and Unblock the Notifications