কলকাতায় সরকারি চিকিৎসকের ধর্ষণ-হত্যা, পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে এক অন্ধকার অধ্যায়
আরজি কর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের স্বতঃপ্রণোদিত মামলা। সেই মামলার শুনানির প্রথম দিনে সর্বোচ্চ আদালত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তীব্র সমালোচনা করে। অপরাধের স্থান সুরক্ষিত রাখতে না পারা, ধর্ষণ-খুনের ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, আরজি কর হাসপাতালে ভাঙচুর নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয় পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে।
এছাড়াও বাবা-মাকে দেহ দেখতে দিতে দেরি করা এবং এফআইআর দায়েরে বিলম্ব নিয়েও সর্বোচ্চ আদালত রাজ্য সরকারের সমালোচনা করে। সুপ্রিম কোর্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও রাজ্য সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। দেশের অন্যতম দামী আইনজীবী কপিল সিবাল এদিন সরকারের পক্ষে সওয়াল করেও কার্যত কিছুই করতে পারেননি।

অপরাধ ও তার পরের ঘটনা
গত নয় অগাস্ট ৩১ বছর বয়সী পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনি চিকিৎসককে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। দেহের বিভিন্ন অংশে আঘাত দেখার পরেও প্রাথমিকভাবে সেই ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা হয়েছিল। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ এই কাজটি করেছিলেন। পরে অবশ্য স্পষ্ট হয় ওই চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে। সেই সময় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর হাতেই রয়েছে স্বাস্থ্য দফতর ও স্বরাষ্ট্র দফতরের দায়িত্ব। এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিবর্তে কার্যত তিনি নিজের প্রশাসনের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পথে নামেন। এই ঘটনায় তিনি পথে নেমে অভিযুক্তের ফাঁসির দাবি করেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। তিনি এই ঘটনার তদন্তভার সিবিআই-এর হাতে তুলে দেবেন বলে ঘোষণাও করেছিলেন। তবে সময়কালের আগে হাইকোর্ট সেই দায়িত্ব সিবিআইঃএর হাতে তুলে দেয়। সেই সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান পরস্পর বিরোধী বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তদন্তকে ধামা চাপা দেওয়ার অভিযোগ
ঘটনার শুরুতে একবার তদন্তকে ধামা চাপা দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পরে ১৪ অগাস্ট হাসপাতালে দুষ্কৃতী হামলার ঘটনায় ফের একবার সেই অভিযোগ ওঠে। ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার প্রমাণ লোপাটের চেষ্টার অভিযোগও ওঠে। পাশাপাশি অনেকেই ১৪ অগাস্টের রাতের ঘটনাকে তদন্তে বাধা দেওয়ার চেষ্টা বলেও অভিহিত করেন। ১৪ অগাস্ট রাতে হাসপাতালে হামলার যেসব ভিডিও সামনে এসেছে, তাদের অনেকেই তৃণমূলের বলে অভিযোগ করেছে বিরোধীরা। যা তদন্তকে প্রভাবিত করার সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
নির্যাতিতার বাবা-মায়ের অভিযোগ
নির্যাতিতার বাবা-মা মেয়ের মৃত্যুর শোক একটু সামলে নিয়েই ৯ অগাস্টের ঘটনা নিয়ে তীব্র ক্ষোভপ্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, প্রথমত তাঁদেরকে প্রথমে আত্মহত্যার কথা বলা হয়েছিল। এরপর হাসপাতালে গিয়ে মেয়ের দেহ দেখতে তিনঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু কেন এই দেরি?
পাশাপাশি হাসপাতালের যে চেষ্ট মেডিসিন বিভাগের সেমিনার হলে অপরাধ হয়েছে বলে অভিযোগ, ঠিক তার সামনেই রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু হয়। তাহলে কি প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
বলির পাঁঠা সঞ্জয় রায়
নির্যাতিতা চিকিৎসকের বাবা-মা বলছেন সঞ্জয় রায়কে বলির পাঁঠা করা হচ্ছে। সে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ মাত্র। এর পিছনে রয়েছে অনেকে। ঘটনার পিছনে মেডিসিন মাফিয়া জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরেও স্বপদে বহাল ছিলেন অধ্যক্ষ সন্দীপ রায়। ফলে ৯ অগাস্ট ভোরের ঘটনা কি শুধু সঞ্জয় রায় ঘটিয়েছে, নাকি অন্য কেউ, তা নিয়ে জল্পনা তীব্র হয়েছে।
বিচারের দাবি
বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চললেও এই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তোলা ছাড়াও শাসনে ত্রুটিগুলিকে একেবারে সামনে নিয়ে এসেছে। যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর গত ১৩ বছরের বেশি শাসনকালের মধ্যে প্রথমবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলেও মন্তব্য করছেন অনেকে। এক্ষেত্রে তিনি ব্যর্থ, বলছেন অনেকেই।
অভিযুক্ত হিসেবে যাকে ধরা হয়েছে, সে কলকাতা পুলিশের সিভিক ভলান্টিয়ার। অন্যদিকে আরজি করের প্রাক্তন অধ্যক্ষ আগে থেকেই নানা দুর্নীতিতে অভিযুক্ত। সেখানেই মহিলাদের নিরাপত্তা ও ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ফলে বিচারের দাবি শুধু নির্যাতিতার পরিবারের নয়, সাধারণ মানুষের।












Click it and Unblock the Notifications