১০ বছর সংসদে স্রেফ সময় নষ্ট করে রাহুল গান্ধী তাঁর আজকের দুর্দশার জন্যে নিজেই দায়ী
অবশেষে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধ্যক্ষ পদ থেকে ইস্তফা দিলেন রাহুল গান্ধী। এ বছরের লোকসভা নির্বাচনের হারের দায় নিয়ে তিনি সরে দাঁড়ালেন, তবে পাশাপাশি দলের অন্যান্য নানা নেতাকে পরোক্ষে বিঁধতেও ভুললেন না।
অবশেষে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধ্যক্ষ পদ থেকে ইস্তফা দিলেন রাহুল গান্ধী। এ বছরের লোকসভা নির্বাচনের হারের দায় নিয়ে তিনি সরে দাঁড়ালেন, তবে পাশাপাশি দলের অন্যান্য নানা নেতাকে পরোক্ষে বিঁধতেও ভুললেন না। বিশেষ করে তাঁর নিশানায় ছিল কংগ্রেসের 'ওল্ড গার্ড' বলে মত পর্যবেক্ষকদের। এও বলা হচ্ছে যে বিজেপিতে যে সমস্যার সম্মুখীন নরেন্দ্র মোদী হয়েছিলেন, তা কংগ্রেসে রাহুল গান্ধী হন কিন্তু মোদীর মতো শক্ত হাতে দলের রাশ তিনি ধরতে পারেননি এবং শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়াতে হল তাঁকেই স্বয়ং।
পদত্যাগ করে রাহুল গান্ধী যে একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত রাখলেন ভারতীয় রাজনীতিবিদদের সামনে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। একের পর এক নির্বাচনে হারতে হারতে এটুকু প্রতিষ্ঠিত অবশ্যই হচ্ছিল যে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্ব চলছে না। গতবছরের শেষের দিকে হিন্দি বলয়ের তিনটি রাজ্যে কংগ্রেস ভালো ফল করলেও এবছরের সাধারণ নির্বাচনেই তারা ওই রাজ্যগুলিতে মুখ থুবড়ে পড়ে। প্রমাণিত হয় যে জাতীয় স্তরে নিজেকে মোদীর বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে ব্যর্থ রাহুল।
আজকের এই দিনটি খুব আশ্চর্জনক নয়। যেভাবে কংগ্রেসের ফুটো নৌকো ভাসছিল, তাতে সলিলসমাধি হওয়ারই ছিল। আর এই পরিণতির জন্যে রাহুল এবং কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বও দায়ী কম নয়।

ইন্দিরা গান্ধীর হাত ধরে কংগ্রেসের পতন শুরু হয়
কংগ্রেসের অধঃপতন শুরু হয়েছিল সেই ইন্দিরা গান্ধীর আমলেই। নিজের এবং নিজের পরিবারের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার তাগিদে ইন্দিরা কংগ্রেসের তৃণমূল শক্তিকে নষ্ট করেন বেশ যত্নসহকারে। যে দলটি একসময়ে সত্যিকারের একটি সর্বভারতীয় এবং গণতান্ত্রিক দল ছিল, তা ক্রমে হয়ে ওঠে স্তাবক এবং চামচাদের ক্লাব। দলের সংগঠন শূন্যতে গিয়ে দাঁড়ায়; নামে কংগ্রেস হলেও একটি দলের মধ্যে হাজারো দলের জন্ম হয়। আঞ্চলিক বা পাড়া স্তরেও কংগ্রেসের আলাদা নেতা-হোতা আজ সর্বত্র বিদ্যমান। দলের আদর্শ আজ কী, কেউই জানে না। নেহরুর আদর্শবাদী দলকে একটি পরিচয়হীন রাজনৈতিক মঞ্চে বদলে দেন তাঁর কন্যাই।
তবুও ইন্দিরার ব্যক্তিত্ব ছিল এবং তাঁর সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে বিরোধীদের এত রমরমা ছিল না। পঁচাত্তরের জরুরি অবস্থা জারির পরে স্বয়ং ইন্দিরাই ভারতের বিরোধী রাজনীতিকে কল্কে জোগান এবং তাঁর মৃত্যুর পর থেকে কংগ্রেসের অবস্থা ক্রমেই দুর্বল হতে থাকে। একান্নব্বইয়ে রাজীব গান্ধীও নিহত হন এবং কংগ্রেস কার্যত দিশাহীন হয়ে পড়ে। আটানব্বইয়ে শেষ পর্যন্ত উপায়ান্তর না দেখে সোনিয়া দলের হাল ধরেন এবং সম্প্রতি ২০১৭ পর্যন্ত তিনিই দায়িত্বে থাকেন। তারপরে আসেন রাহুল। কিন্তু তদ্দিনে দলের ভিত্তি প্রায় শেষ। সারা দেশেও মাত্র কয়েকটি রাজ্যেই টিম টিম করে জ্বলছে শতাব্দী প্রাচীন কংগ্রেস। দায়িত্বে নেহেরু-গান্ধী পরিবারের একজন থাকলেও তিনি কার্যত পঙ্গু কারণ দলটাই তখন বিধ্বস্ত।
অথচ রাহুল চাইলে কিন্তু অনেক আগে থেকে হাল ধরতে পারতেন এবং আজকের মতো "কেউ আমার পাশে দাঁড়ায়নি" কাঁদুনিও তাঁকে গাইতে হত না।

২০০৪ সালে রাহুল প্রথম সাংসদ হন, মোদীকে তখনও কেউ চেনে না
২০০৪ সালে রাহুল গান্ধী প্রথম সাংসদ হন লোকসভায়। তখন মাত্র ৩৪ বছর বয়স তাঁর।নরেন্দ্র মোদী তখনও গুজরাতে তাঁর প্রথম মেয়াদেই ব্যস্ত। প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন মনমোহন সিংহ। রাহুল কিন্তু সেই সময়গুলিতে কিচ্ছু করেননি। স্রেফ সাংসদ হিসেবেই কাটিয়ে দিয়েছেন। তিনি এবং তাঁর সমর্থকরা হয়তো ভেবেছিলেন যে একদিন হাসতে হাসতে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাবেন। কারণ, অন্যদিকে, বিজেপির বেশ খারাপ অবস্থা। তাদের সর্বোচ্চ নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ী ওই বছর নির্বাচনে হেরে তার পরের বছর সক্রিয় রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস নেন। বাজপেয়ীর উত্তরসূরি হিসেবে লালকৃষ্ণ আদবানিও তখন আরএসএস-এর সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত, বিশেষ করে পাকিস্তানের জনক মহম্মদ আলী জিন্নাহর স্তুতি গেয়ে। বামেরা তখন বাইরে থেকে সমর্থন যোগাচ্ছে কংগ্রেসকেই।

এই দশ বছরে খাতাও কলমে প্রশাসকের কাজ শিখতে পারতেন তিনি
এমন একটি শান্তিপূর্ণ সময়ে রাহুল গান্ধী ইচ্ছে করলেই সংসদীয় গণতন্ত্রে নিজের হাত পাকিয়ে ফেলতে পারতেন। দশটি বছর তাঁর হাতে সময় ছিল। কিন্তু স্রেফ সময় নষ্ট করেছেন তিনি বসে বসে। কোনও প্রশাসনিক দায়ভার নেননি যাতে মানুষের আস্থাভাজন হতে পারতেন। আর শেষ পর্যন্ত যখন মোদী জাতীয় স্তরে এসে রীতিমতো ঝাঁকুনি দিলেন কংগ্রেসের ভিতকে, তখন রাহুল পড়ি কী মরি করে প্রস্তুতি নিয়ে শুরু করলেন মোদীর সঙ্গে টক্কর দিতে। কিন্তু মোদী তদ্দিনে দক্ষ প্রশাসক। দশ বছর গুজরাত শাসন করেছেন এবং বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। যদিও বিরোধীরা শুধুমাত্র দাঙ্গার বিষয়টিকেই মাথায় রাখত মোদীকে বিচার করার সময়ে, কিন্তু প্রশাসক হিসেবে মোদী যে জায়গাটি তৈরী করে নিয়েছিলেন, তা রাহুল জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর থেকে দশ বছরের সিনিয়র হয়েও করে উঠতে পারেননি, আজও।

'ওল্ড গার্ড'রা তাঁকে পাত্তা দেবেন কেন আজকে?
আর এই ব্যর্থতার জন্যেই আজ দলের রাশ তিনি ধরে পারেননি, কোনওদিনই। যে 'ওল্ড গার্ড'দের আজ দোষারোপ করা হচ্ছে, তাঁরাও দলের মধ্যে নিজেদের জায়গা বানিয়েছেন নানা অভিজ্ঞতায়, পদের দায়িত্বে থেকে। শূন্য অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে স্রেফ 'গান্ধী' পদবি নিয়ে যদি রাহুল নামক কেউ এসে তাঁদের নানা নির্দেশ দেন, তা কি আদৌ তাঁরা শুনবেন?
প্রশ্নটা ভেবে দেখবেন রাহুল।












Click it and Unblock the Notifications