পেরিয়ার ছিলেন এক ঝোড়ো হাওয়া! ভেঙে দিয়েছিলেন জাতপাতের শৃঙ্খল, গুড়িয়েছিলেন গোঁড়ামির দেওয়াল
পেরিয়ার। যাঁর আসল নাম ইভি রামস্বামী। তিনি ১৭ সেপ্টেম্বর ১৮৭৯ সালে তামিলনাড়ুর ইরোড শহরে এক বর্ধিষ্ণু বণিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। অল্প বয়সেই তিনি বাবার ব্যবসায় যোগ দেন। কিন্তু তাঁর অনুসন্ধিৎসু মন কখনও চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সমাজের প্রচলিত বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন।
বিদ্রোহী চেতনার জাগরণ
ধর্মের নামে প্রচলিত ভণ্ডামি এবং জাতপাতের কারণে মানুষের মর্যাদা হানি রামাস্বামীকে গভীরভাবে বিচলিত করেছিল। তিনি বুঝতে পারেন যে ধর্মকে কুসংস্কার এবং বশ্যতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর বিবেক জেগে ওঠে এবং তিনি মানুষের সম্মানের জন্য লড়াই করার সংকল্প নেন।

রাজনৈতিক জীবনের শুরু এবং মোহভঙ্গ
১৯১৯ সালে তিনি ন্যায়বিচারের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন। ইরোড পুরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালীন তিনি খাদি প্রচার, বিদেশি পণ্য বয়কট এবং অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের মতো সাহসী পদক্ষেপ নেন। ১৯২১ সালে তিনি মদের দোকানের সামনে পিকেটিং করার সময় কারাবরণ করেন। তার স্ত্রী নাগাম্মাই এবং বোনও এই আন্দোলনে যোগ দেন। কিন্তু কংগ্রেসের ভিতরে থাকা গভীর জাতপাতের ভেদাভেদ তাঁকে হতাশ করেছিল। ১৯২৫ সালে তিনি কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আসেন এবং প্রতিজ্ঞা করেন যে তামিলনাড়ু থেকে কংগ্রেসকে ক্ষমতাচ্যুত করবেন। গত ৫৮ বছর ধরে কংগ্রেস সেখানে ক্ষমতায় আসেনি।
ভাইকম সত্যাগ্রহ
১৯২৪ সালে কেরলের ত্রাভাঙ্কোর রাজ্যে ভাইকম সত্যাগ্রহ শুরু হলে রামস্বামী এবং নাগাম্মাই তাতে যোগ দেন। তথাকথিত অস্পৃশ্যদের মন্দিরের রাস্তায় প্রবেশে বাধা দেওয়া হতো। এই আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ হন, কিন্তু নিপীড়িত মানুষের কাছে তিনি আশার আলো হয়ে ওঠেন। গান্ধীজি বহিরাগতদের যোগদানে আপত্তি জানালেও পেরিয়ার তাতে কান দেননি। এই দুঃসাহসিকতার জন্য তিনি 'ভাইকম বীরার' (ভাইকমের বীর) উপাধি পান।
আত্মসম্মান আন্দোলন ও যুক্তিবাদ
১৯২৫ সাল থেকে পেরিয়ার অন্ধ বিশ্বাস, অযৌক্তিক প্রথা এবং জাতিগত ভেদাভেদের বিরুদ্ধে 'আত্মসম্মান আন্দোলন' শুরু করেন। তাঁর জ্বালাময়ী বক্তৃতা, 'কুড়ি আরাসুক' (১৯২৫) এবং 'রিভল্ট' (১৯২৮) এর মতো পত্রিকার মাধ্যমে তিনি মানুষের মনে মর্যাদা, যুক্তিবাদ এবং সমতার নতুন ধারণা জাগিয়ে তোলেন। তাঁর আন্দোলন নারী শিক্ষা, বিধবা বিবাহ এবং পুরোহিত ছাড়া বিবাহের পক্ষে ছিল।
দ্রাবিড় আন্দোলন ও চূড়ান্ত সংগ্রাম
ব্রিটিশরা ১৯৩৭ সালে তামিল স্কুলে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া হলে, পেরিয়ার তামিল পরিচয়কে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন। তিনি জাস্টিস পার্টির নেতৃত্ব নেন এবং ১৯৪৪ সালে এটিকে দ্রাবিড় কাঝাগাম (ডিকে) এ রূপান্তরিত করেন। এই দলের ব্যানারে তিনি যুক্তিবাদ ও সমতার বাণী ছড়িয়ে দেন। তিনি কুসংস্কারের নিন্দা করেন, নারী অধিকারকে গুরুত্ব দেন এবং কিছু জাতির শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা ভেঙে দেন।
১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে তিনি তাঁর শেষ ভাষণ দেন। সেখানে তিনি সমতা ও যুক্তিবাদকে জীবনের শেষ আহ্বান হিসেবে তুলে ধরেন। সেই ডিসেম্বরেরই ২৪ তারিখ, ৯৪ বছর বয়সে এই মহান ব্যক্তিত্বের জীবনাবসান হয়।
পেরিয়ার আজও বেঁচে আছেন, প্রতিটি কণ্ঠস্বরে। যে কণ্ঠস্বর জাতপাতের কাছে মাথানত করতে অস্বীকার করেছে, প্রতিটি নারীর মধ্যে যে কণ্ঠস্বর শিক্ষার অধিকার দাবি করে এবং প্রতিটি যুক্তিবাদীর মধ্যে যে কণ্ঠস্বর গোঁড়ামিকে পাল্টা প্রশ্ন করার সাহস রাখে।












Click it and Unblock the Notifications