ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট জের, একাধিক রাজ্যে জারি নৈশ কার্ফু–লকডাউন, উৎসব পালনে নিষেধাজ্ঞা
ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট জের, একাধিক রাজ্যে জারি নৈশ কার্ফু–লকডাউন, উৎসব পালনে নিষেধাজ্ঞা
দেশজুড়ে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের জেরে কোভিড–১৯ কেস ক্রমেই বাড়ছে। ডিসেম্বরের উৎসবের মরশুমে দেশের একাধিইক রাজ্যে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে গিয়েছে। অনেক রাজ্য টিকাকরণ বাধ্যতামূলক হয়ে গিয়েছে। পৃথকভাবে, কেন্দ্র এই সপ্তাহের শুরুর দিকে রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে পর্যবেক্ষণ করতে এবং রাতের লকডাউন এবং জন সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞার মতো ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে বিবেচনা করতে বলেছিল। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের ১২২টি কেস ধরা পড়েছে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে। এখনও পর্যন্ত যা সবচেয়ে বেশি। এটা নিয়ে দেশে মোট ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ৩৫৮, যার মধ্যে ১১৪ জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন অথবা স্থানান্তরিত করা হয়েছে। ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জুড়ে এই ৩৫৮টি ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের কেস ধরা পড়েছে। যার মধ্যে মহারাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি ৮৮টি, এরপর দিল্লিতে ৬৭টি, তেলঙ্গানাতে ৩৮টি, তামিলনাড়ুতে ৩৪টি, কর্নাটকে ৩১ ও গুজরাতে ৩০টি কেস সনাক্ত হয়েছে।

মধ্যপ্রদেশে জারি নৈশ কার্ফু
করোনা ভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনের জেরে মধ্যপ্রদেশ সরকার রাজ্যে রাত ১১টা থেকে পরের দিন ভোর পাঁচটা পর্যন্ত নৈশ কার্ফু জারি করেছে আগাম সতর্কতা হিসাবে এবং মধ্যপ্রদেশবাসীকে কড়াভাবে কোভিড-১৯ নিয়ম মেনে চলতে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকেই এই নৈশ কার্ফু জারি হয়ে গিয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত মধ্যপ্রদেশে ওমিক্রনের কোনও কেস ধরা পড়েনি। কেন্দ্র সরকারের জারি করা নির্দেশিকা অনুযায়ী, মাস্ক পরা, সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা সহ সবকিছুই মেনে চলতে হবে মধ্যপ্রদেশের বাসিন্দাদের বলে জানিয়েছে রাজ্য সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে এও বলা হয়েছে যে যদি পরিস্থিতি বিগড়ায় তবে আরও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

দিল্লিতে কড়া নিষেধাজ্ঞা
দিল্লিতে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের কারণে হু হু করে কোভিড কেস বেড়ে যাওয়ায় দিল্লির বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের পক্ষ থেকে বড়দিন ও বর্ষবরণের উৎসব পালনের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। জেলা শাসকদেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে তাঁদের এলাকাতেও যেন বড়দিন ও বর্ষবরণের উৎসব পালন না হয় তা নিশ্চিত করতে। তবে বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে কোভিড-১৯-এর যথাযথ আচরণ মেনে বড়দিন ও বর্ষবরণের ইভে পালনের জন্য ধর্মীয় স্থানগুলি খোলা রাখা হবে। তবে এই উৎসব পালনের জন্য আলাদা করে কোনও অনুমোদন দেওয়া যাবে না। ৫০ শতাংশ আসন ক্ষমতা নিয়ে রেস্তোরাঁ ও পানশালাগুলি খোলা থাকবে। বিয়ে সংক্রান্ত অনুষ্ঠানেও নুন্যতম ২০০ জনের বেশি অতিথি নয়।
ডিডিএমএ জেলা শাসক ও ডেপুটি কমিশনারদের নির্দেশ দিয়েছে যে মানুষ যাতে সামাজিক দুরত্ব ও মাস্ক পরার নিয়ম মেনে চলে তার জন্য কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ যেন করা হয়। নির্দেশিকা অনুযায়ী, সামাজিক, রাজনৈতিক, ক্রীড়া, বিনোদন, সংস্কৃতি, ধর্মীয়, উৎসব সংক্রান্ত জমায়েত ও ভিড় দিল্লির এনসিটি জুড়ে নিষিদ্ধ। ডিডিএমএ-এর নির্দেশ অনুযায়ী, রেস্তোরাঁ ও পানশালাতে ৫০ শতাংশ ক্রেতা নিয়ে চালাতে হবে। দিল্লিতে এখনও পর্যন্ত ৬৪টি ওমিক্রনের কেস ধরা পড়েছে, যার মধ্যে ২৩ জন ছাড়া পেয়ে গিয়েছে। অধিকাংশ ওমিক্রনের রোগীর সম্পূর্ণ টিকাকরণ করা এবং তাঁদের হাল্কা উপসর্গ রয়েছে।

নয়ডায় জারি ১৪৪ ধারা
বড়দিন ও বর্ষবরণের উৎসবের মধ্যেই উত্তরপ্রদেশের গৌতম বুদ্ধ নগর পুলিশ কমিশনারেট ১ ডিসেম্বর থেকে ১৪৪ ধারা জারি করেছে। এই নির্দেশে বলা হয়েছে যে বুধবার ১ ডিসেম্বর থেকে গৌতম বুদ্ধ নগরে ১৪৪ ধারা জারি করা হল, যা চলবে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কোভিডের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে, ২৩ ডিসেম্বর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী চরণ সিংয়ের জন্মদিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার জন্য, ২৫ ডিসেম্বর ও ৩১ ডিসেম্বর নতুন বছরের অনুষ্ঠানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

লকডাউন পুদুচেরিতে
কেন্দ্র শাসিত রাজ্য পুদুচেরিতে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত লকডাউন বাড়িয়ে ২ জানুয়ারি পর্যন্ত করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে নতুন করোনা কেস হ্রাস পেলেও পরিস্থিইর ওপর ক্রমাগত নজর রাখার প্রয়োজন রয়েছে। আর তাই বুধবার মধ্যরাত থেকে ২ জানুয়ারি পর্যন্ত লকডাউন বাড়িয়ে দেওয়া হল। প্রত্যেক দিন নৈশ কার্ফু জারি থাকবে রাত ১১টা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত। তবে বড়দিনের আগের দিন ও বড়দিনের দিন নৈশ কার্ফু রাজ্যে থাকবে না। এমনকী ৩০-৩১ ডিসেম্বর ও ১ জানুয়ারি বর্ষবরণ উপলক্ষ্যে নৈশ কার্ফু থাকবে না রাত ২টো পর্যন্ত। এইদিনগুলিতে মধ্যরাত ২টো থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত কার্ফু থাকবে।

তেলেঙ্গনা গ্রামে লকডাউন
দুবাই থেকে আসা এক ব্যক্তির শরীরে ওমিক্রন করোনা ভাইরাস পজিটিভ পাওয়ার পর রাজন্না সিরিসিলার মুস্তাবাদ মণ্ডলের গুদেম গ্রাম নিজেরাই ১০ দিনের জন্য লকডাউন ঘোষণা করেছে। ওই ব্যক্তির মা ও স্ত্রীও কোভিড-১৯•এ আক্রান্ত। তাঁরা ওমিক্রন দ্বারা সংক্রমিত কিনা তা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। ১৪টি প্রাথমিক পরিচিতির নমুনা এবং মোট ৬৪টি নমুনা সংগ্রহ করা হয় এবং তাঁদের মধ্যে দুটি পজিটিভ রিপোর্ট এসেছে।

কর্নাটকে কড়াকড়ি
কর্নাটক সরকার ঘোষণা করেছে যে নববর্ষের প্রাক্কালে রাজ্যে এবং বেঙ্গালুরুতে কোভিড-১৯ সম্পর্কিত বিধিনিষেধ থাকবে। সরকার জানিয়েছে যে কোনও ধরনের ভিড় হবে না এবং বর্ষবরণের রাতে ডিজে পার্টির মতো অনুষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ৫০ শতাংশ আসন ক্ষমতা নিয়ে চলবে রেস্তোরাঁ ও পানশালা। রেস্তোরাঁ এবং ক্লাবগুলিতে কর্মরত কর্মীদের সম্পূর্ণ টিকাকরণ এবং তাঁদের আরটি-পিসিআর পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ হওয়া উচিত। কর্নাটকের বিভিন্ন অংশে রিপোর্ট করা ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে এই নিষেধাজ্ঞাগুলি ঘোষণা করা হয় ৷ তবে সরকার জানিয়েছে যে নিয়মিত ব্যবসার কাজ কোভিড-১৯ নিয়ম মেনে, মাস্ক পরে ও সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে চালানো যাবে। কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী বাসবরাজ বোম্মাই জানিয়েছেন যে কোভিড নিয়ম মেনে চার্চগুলিতে বড়দিনের উৎসব পালনে অনুমোদন রয়েছে।

তামিলনাড়ুতে বর্ষবরণের উৎসবে নিষেধাজ্ঞা
তামিলনাড়ু সরকার চেন্নাইয়ের সমস্ত সমুদ্র সৈকতে বর্ষবরণ উৎসব উদযাপনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। সরকার বলেছে যে ৩১ ডিসেম্বর এবং ১ জানুয়ারি সেখানে কোনো প্রবেশ ও জমায়েতের অনুমতি দেওয়া হবে না। সরকার আরও বলেছে যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের উপর নিষেধাজ্ঞা ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

মহারাষ্ট্রে নিষেধাজ্ঞা
এ রাজ্যে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের বাড় বাড়ন্ত দেখার পর মহারাষ্ট্র সরকারের সর্বশেষ নির্দেশিকা অনুযায়ী চার্চগুলিতে ৫০ শতাংশ আসন ক্ষমতা নিয়ে বড়দিনের উৎসব পালন করতে পারবে। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, শুধুমাত্র ন্যূনতম সংখ্যক কোরিস্টারকে চার্চের অভ্যন্তরে গান পরিবেশন করার অনুমতি দেওয়া হবে এবং প্রতিটি পারফর্মারকে আলাদা মাইক দেওয়া হবে। চার্চগুলিতে মাস্ক পরা, সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা ও স্যানিটইজার ব্যবহার বাধ্যতামূলক।

ওড়িশায় বর্ষবরণের উৎসব পালনে নিষেধাজ্ঞা
ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে, ওড়িশা সরকার ৩১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠান শূন্য রাত উদযাপন এবং ১ জানুয়ারিতে অনুরূপ অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করেছে। এছাড়াও জনসমাগমস্থলে পিকনিক ও চড়ুইভাতির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বাড়িতেই বড়দিন ও বর্ষবরণের উৎসব পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। ওড়িশার বাসিন্দারা পরিবেশবান্ধব বাজি পোড়াতে পারবেন তবে তা নিজেদের আবান চত্ত্বরে। রাত ১০টা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত নৈশ কার্ফু জারি থাকবে সমস্ত শহরাঞ্চলে তবে সাপ্তাহিক লকডাউন নেই। সমস্ত সামাজিক/ধর্মীয়/রাজনৈতিক জমায়েতের উপর নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকবে এবং প্রদর্শনী, বাণিজ্য মেলা, এক্সপো এবং মেলার উপরও একই নিয়ম জারি। বিয়ের অনুষ্ঠানের অতিথি সহ ২৫০ জনের বেশি নয়। বিয়ের শোভাযাত্রাতেও মাত্র ৫০ জনের অনুমতি রয়েছে।

গুজরাতে নৈশ কার্ফু
গুজরাতে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নৈশ কার্ফু জারি করা হয়েছে এবং জিম এবং রেস্তোঁরাগুলিকে ৭৫ শতাংশ ক্ষমতা নিয়ে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে।

হরিয়ানায় টিকাকরণ বাধ্যতামূলক
রাজ্যের স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনিল ভিজ জানিয়েছেন, যারা সম্পূর্ণভাবে টিকা পাননি তাদের ১ জানুয়ারি থেকে হরিয়ানার মল, সিনেমা হল এবং রেস্তোরাঁর মতো জনবহুল জায়গায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। ভিজ বলেছিলেন যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কারণ টিকাকরণ কোভিড সহ তাআর বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্ট থেকে রক্ষা করবে।












Click it and Unblock the Notifications