ওম প্রকাশ চৌতালা: হরিয়ানার অকুতোভয় নেতা, যিনি অনেক ভালো-খারাপের সাক্ষী!
ওম প্রকাশ চৌতালা, যিনি ওপি চৌতালা নামেও পরিচিত, নিঃসন্দেহে হরিয়ানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব; যার রাজনৈতিক যাত্রা বহু দশক ধরে চলেছিল। আজ সেই ব্যক্তিই ছেড়ে গেলেন এই সব কিছু। রাজনীতির আঙিনায় শেষ হয়ে গেল 'চৌতালা অধ্যায়'। পরলোকে গমন করলেন হরিয়ানার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওম প্রকাশ চৌতালা।
ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল লোকদল (আইএনএলডি) এর একজন অভিজ্ঞ নেতা ছিলেন তিনি। ১ জানুয়ারী, ১৯৩৫ সালে ভারতের প্রাক্তন উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং হরিয়ানার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব চৌধুরী দেবী লালের পুত্র হিসাবে জন্মগ্রহণ করেন ওম প্রকাশ চৌতালা। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় পরিবারে জন্মগ্রহণ ও বেড়ে ওঠার কারণে, তার রাজনৈতিক বুদ্ধি এবং আগ্রহ প্রথম থেকেই ছিল অনবদ্য। ১৯৯৬ সালে তাঁর পিতা দেবী লাল দ্বারা গঠিত ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল লোকদলের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন তরুণ ওম প্রকাশ।

রাজনীতিতে চৌতালার উত্থান তার পিতার উত্তরাধিকার সূত্রে হলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নিজের এক ব্যক্তিত্ব তুলে ধরেন সকলের সামনে। গ্রামীণ এলাকায় যেখানে কৃষক এবং পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের বসবাস, তাঁদের নেতা হয়ে ওঠেন চৌতালা। মূলধারার রাজনীতিতে এই ভাবেই তাঁর উত্থান।
চৌতালা একটানা চারটি মেয়াদে হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার সামলেছেন। যা তাকে রাজ্যের সবচেয়ে দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক নেতাদের একজন করে তোলে। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তাঁর কার্যকাল হল খানিকটা এরকম -
- প্রথম মেয়াদ (১৯৮৯-১৯৯০): চৌতালা প্রথম ২ ডিসেম্বর, ১৯৮৯-এ মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তাঁর সরকার বরখাস্ত হওয়ার পর, তাঁর মেয়াদ ২২ মে ১৯৯০ পর্যন্তই স্থায়ী থাকে।
- দ্বিতীয় মেয়াদ (১৯৯০) : রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পর, চৌতালা ১২ জুলাই, ১৯৯০-এ মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে পুনঃনির্বাচিত হন। কিন্তু এই মেয়াদটি আরও স্বল্প ছিল। শুধুমাত্র ১৭ জুলাই, ১৯৯০ অর্থাৎ মাত্র ৫ দিনের জন্যে মুখ্যমন্ত্রী হন তিনি।
- তৃতীয় মেয়াদ (১৯৯১) : চৌতালা ১৯৯১ সালে আবারও মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নিযুক্ত হন। ২২ মার্চ থেকে ৬ এপ্রিল, ১৯৯১ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী পদে ছিলেন তিনি।
- চতুর্থ মেয়াদ (১৯৯৯-২০০৫) : চৌতালার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং দীর্ঘতম মেয়াদ ছিল ২৪ জুলাই, ১৯৯৯ থেকে ৫ মার্চ, ২০০৫ পর্যন্ত তার চতুর্থ মেয়াদ। তার এই মেয়াদ দীর্ঘস্থায়ী হলেও, দুর্নীতি ও দুর্বল শাসনের অভিযোগ ছিল এই সময়ই।
তার প্রভাব হরিয়ানার বাইরেও প্রসারিত হয়েছিল। চৌতালা তার জোটের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ), অ-ইউপিএ এবং অ-এনডিএ দলগুলির একটি জোট তৃতীয় ফ্রন্ট তৈরি করেছিলেন।
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে যেমন নাম ছিল তাঁর, তেমনই তাঁর শাসনকালে বেশ কিছু বড় বিতর্কও ছিল তাঁকে ঘিরে। ১৯৯৯ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে হরিয়ানায় মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তাঁর মেয়াদকালে বেআইনিভাবে ৩,২০৬ জন জুনিয়র বেসিক শিক্ষককে নিয়োগ করা হয়েছিল। সেই সময় হরিয়ানায় এই নিয়ে নিয়োগ দুর্নীতি মামলা নজর কেড়েছিল গোটা দেশের।
এখানেই শেষ নয়, চৌতালা অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের বেশ কয়েকটি মামলাতে যুক্ত ছিলেন। যার জন্যে ২০২২ সালের মে মাসে সিবিআই আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে। পরবর্তীতে এর জন্যে ৪ বছরের জেল এবং ৫০ লক্ষ টাকা জরিমানা দিতে হয় ওম প্রকাশকে।
ওম প্রকাশ চৌতালার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তার পরিবারেই টিকে আছে। তাঁর ছেলে অভয় সিং চৌতালা হরিয়ানার বিধানসভার অন্যতম প্রধান সদস্য এবং ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিরোধী দলের নেতা হিসাবে হরিয়ানার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা মোকাবেলা করেছেন।
এইভাবে, ওম প্রকাশ চৌতালা হরিয়ানায় জড়িয়ে আছে ওতোপ্রতো ভাবে। তাঁর রাজনৈতিক আধিপত্য, পারিবারিক বন্ধন এবং বিতর্কগুলি তার জীবনকে ঘিরে রেখেছে এই ভাবেই। তাই তিনি চলে গেলেও ওম প্রকাশ চৌতালার আধিপত্য থেকে যাবে এই ভাবেই।












Click it and Unblock the Notifications