ফিরেছে ওবিসি ভোট, বিজেপি-র বিজয়রথ ছুটছে,ছুটবে

সেমিফাইনাল অর্থাৎ দিল্লি, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ের বিধানসভা নির্বাচন। ফাইনাল অর্থাৎ আগামী বছরের লোকসভা ভোট।
প্রশ্ন হল, শুধুই কি ইউপিএ সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, যাকে বলে 'অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি ফ্যাক্টর', তা-ই হাওয়া জুগিয়েছে বিজেপি-র পালে? কিছুটা তো নিশ্চয়। কিন্তু, আরও একটি ঘটনা গোপনে ঘটে গিয়েছে হিন্দি বলয়ে। অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায় বা ওবিসি ভোটের মেরুকরণ। বিজেপি-র পক্ষে। আর তাই হিন্দি বলয়ে ধুয়েমুছে সাফ কংগ্রেস। লোকসভাতেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার একশো শতাংশ সম্ভাবনা।
একটু বিশদে ব্যাখ্যা করা যাক। হিন্দি বলয়ের রাজনীতি জাতপাতভিত্তিক। জাতপাতের ভিত্তিতে যে দল যাদের ভোট নিজেদের তরফে আনতে পারে, তারাই শেষ হাসি হাসে। কংগ্রেস কখনও বর্ণহিন্দু ভোটব্যাঙ্ক, কখনও মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক, কখনও তপশিলি জাতি-উপজাতিদের ভোটকে নিজেদের পক্ষে টেনেছে। কিন্তু, তারা যে ভোটব্যাঙ্কের দিকে নজর দেয়নি, তা হল ওবিসি ভোট। নরেন্দ্র মোদী তথা বিজেপি ওবিসি ভোট পুরোটাই টানতে পেরেছে। তাই তারা বিপুলভাবে সফল হয়েছে ও হবে।
হিন্দি বলয়ে জাতপাতভিত্তিক ভোটের প্রথম মেরুকরণ ঘটিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। তাঁর 'খাম' (KHAM) ফর্মুলা সেই সময় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। ক্ষত্রিয়-হরিজন-আদিবাসী-মুসলিম, এই হল 'খাম'। এর ওপর ভর করে বারবার হিন্দি বলয় থেকে প্রচুর আসন পেত কংগ্রেস।
১৯৮০ সালে বিজেপি তৈরি হল। প্রাথমিকভাবে তারা ব্রাহ্মণ ও বৈশ্য ভোটের ওপর জোর দিয়েছিল। কিন্তু, অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবানিরা দেখলেন, শুধু এর ওপর ভর করে থাকলে দল নির্বাচনী রাজনীতিতে ভালো ফল করতে পারবে না। এদিকে, ক্ষত্রিয়, হরিজন, আদিবাসী ও মুসলিম ভোট ততদিনে পুরোপুরি কংগ্রেসের সঙ্গে। বাকি রইল কী? বিজেপি নেতারা দেখলেন, বিক্ষিপ্ত ওবিসি ভোটকে এক ছাতার তলায় আনতে হবে। আনলেন। ১৯৮৪ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপ-র প্রাপ্ত আসন ছিল ২টি। ১৯৮৯ সালে তা একলাফে হয়ে গেল ৮৫টি! প্রথম দফায় ওবিসি ভোটের মেরুকরণ যদি হয়ে থাকে অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবানির হাত ধরে, তা হলে দ্বিতীয় দফায় মানে ১৯৯০ দশকে তা এগিয়ে নিয়ে গেলেন কল্যাণ সিং, উমা ভারতীর মতো ওবিসি নেতানেত্রীরা। গত পাঁচ-সাত বছরে এই ওবিসি ভোট নানা কারণে সরে গিয়েছিল বিজেপি-র কাছ থেকে। সেই ভোট যে আবার ফিরেছে, প্রমাণ চার রাজ্যে বিধানসভা ভোটের চোখধাঁধানো ফল।
নরেন্দ্র মোদীর সুবিধা হল, তিনি চান বা না চান, বর্ণহিন্দুরা তাঁকে 'হিন্দু পোস্টারবয়' বলেই মনে করে। 'নেতা ক্যায়সা, মোদীজি জ্যায়সা'-- এই হচ্ছে হিন্দি বলয়ে বর্ণহিন্দুদের স্লোগান। ফলে, ব্রাহ্মণ-রাজপুত ভোট তো আছেই। তিনি নিজে ওবিসি হওয়ায় সঙ্গে এসে জুড়েছে ওবিসি ভোট। যেমন, রাজস্থান। ১৯৯ আসনবিশিষ্ট রাজস্থান বিধানসভায় বিজেপি একা ৮১ শতাংশ আসন পেয়েছে। ৩৭ লাখ ভোট অতিরিক্ত পেয়েছে তারা, যার পুরোটা হল ওবিসি ভোট। ওবিসি অধ্যুষিত এলাকায় সব আসন দখল করেছে বিজেপি। কংগ্রেস তাই হাওয়া হয়ে গিয়েছে।
মধ্যপ্রদেশের উদাহরণ দেখুন। ওবিসি নেত্রী উমা ভারতীর দল থেকে বহিষ্কারের জেরে ২০০৮ সালে ওবিসি ভোটে ধস নেমেছিল। ২০১১ সালে উমা ফিরলেন। নরেন্দ্র মোদী পরামর্শ দিয়েছিলেন, ওবিসি এলাকায় কাজ করার। ২০১৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পুরো ওবিসি ভোট বিজেপি-র দিকে চলে এল।
বিজেপি এখন গোটা হিন্দি বলয়ের ওবিসি ভোটকে লোকসভা নির্বাচনে নিয়ে আসতে চায় নিজেদের পালে। হিমাচলপ্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়,ঝাড়খণ্ড, বিহার, উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডে ২১৮টি লোকসভা আসন রয়েছে। বিজেপি চাইছে অন্তত ১৮০টি আসন তুলে নিতে। তা হলে, দিল্লি দখলের পথ সুগম হবে।
এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা!












Click it and Unblock the Notifications