নেই পানীয় জল, খাবারের মান খারাপ, পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্যাম্প নিয়ে পুলিশের রিপোর্টেই উঠে এল বহু ত্রুটি
নেই পানীয় জল, খাবারের মান খারাপ, পুলিশের রিপোর্টে একাধিক ত্রুটি উঠে এল শ্রমিকদের শিবির নিয়ে
করোনা সংক্রমণের জেরে দেশজুড়ে লকডাউনের মাঝেই পরিযায়ী শ্রমিকরা নিজেদের কর্মস্থান ছেড়ে হাঁটা পথেই বাড়ির পথে রওনা দিয়েছিলেন। দিল্লির বহু পরিযায়ী শ্রমিক যাঁরা বাড়ি ফিরতে পারেননি তাঁদেরকে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আশ্রয় স্থানে। কিন্তু সেই আশ্রয় স্থানের বেহাল দশা তুলে ধরল দিল্লি পুলিশ। মধ্য দিল্লির বেশ কিছু আশ্রয় স্থানের চিত্র তুলে ধরে তার ওপর ভিত্তি করে রিপোর্ট তৈরির কাজ পেয়েছিলেন ১০টি দিল্লি পুলিশের স্টেশন হাউস অফিসার (এসএইচও)।

একাধিক সমস্যা পরিযায়ী শ্রমিকদের আশ্রয় স্থানে
পুলিশের তৈরি করা সেই রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, ‘ফ্যানগুলি কাজ করছে না ও বিদ্যুতের কোনও দ্বিতীয় ব্যবস্থা নেই। শৌচালয়গুলি স্যানিটাইজড করার কাজ খুবই বিরল। বেশিরভাগ পরিযায়ী শ্রমিকের পরিবার থাকতে না পেরে চলে যেতে চাইছে। সরকারি কর্মীদের দুর্ব্যবহার; খাদ্যের গুণগত মান ঠিক নয়; সকাল সাতটা থেকে ১১টা পর্যন্ত শৌচালয়ে জল আসে; একটা সাবানই সকলে ব্যবহার করছেন এবং কাপড় ধোওয়ার কোনও ডিটারজেন্ট পাউডার নেই; মশার কামড় রয়েছে তার সঙ্গে।' মধ্য দিল্লির আশ্রয় স্থানগুলির এরকমই চিত্র উঠে এসেছে। এই সমস্যাগুলি সিভিল লাইন থানার পুলিশ সদস্যদের দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছিল, তাঁরা মজনু কা টিলা এবং পোস সিভিল লাইনের দুটি আশ্রয়স্থল পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। এছাড়াও ১৫টিরও বেশি পরিয়ায়ী শ্রমিকদের আশ্রয়স্থান ঘুরে দেখেন তাঁরা। এই রিপোর্ট ফরোয়ার্ড করা হয়েছে ২২ এপ্রিল ডিসিপি (নর্থ) মণিকা ভরদ্বাজ থেকে শুরু করে ডেপুটি কমিশনার (মধ্য) নিধি শ্রীবাস্তবকে। কেন্দ্রীয় জেলা প্রশাসন ২৪ ঘন্টার মধ্যে এই রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে।

রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে সরকারের কাছে
ডিসিপি ভরদ্বাজ জানিয়েছেন যে ওইসব আশ্রয় স্থানগুলিতে পুলিশ বেশ কিছু সমস্যা দেখতে পাওয়ার পরই জেলার এসএইচওদের বলা হয় যে তাঁরা তাঁদের এলাকার আশ্রয় স্থানগুলির রিপোর্ট যেন জমা দেয়। ভরদ্বাজ এরপর সব রিপোর্টগুলিকে বিশ্লেষণ করে তা জেলা শাসকের কাছে পাঠিয়ে দেন যাতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। মধ্য দিল্লির জেলা শাসক নিধি শ্রীবাস্তব জানিয়েছেন যে তিনি রিপোর্টের প্রতিলিপি সমস্ত সাব-ডিভিশনাল জেলা শাসককে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে তাঁরা ত্রুটিগুলি সংশোধন করতে পারেন।

সামাজিক দুরত্ব মানা হচ্ছে না, পানীয় জলের অভাব
রিপোর্ট অনুযায়ী, লাহোরি গেট পুলিশ থানার সদস্যরা তাঁদের থানার অন্তর্গত তিনটি আশ্রয় স্থান পর্যবেক্ষণ করে জানিয়েছেন যে সেখানে পানীয় জলের কোনও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই ও শ্রমিকদের জলে দেওয়ার জন্য রিভার্স অ্যাসোমোসিস (আরও) এর মতো কোনও সুবিধা নেই। খাবারের বন্দোবস্ত নেই সেখানে। এটা লক্ষ্য করা গিয়েছে যে দিনে দু'বার খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে কিন্তু তার মান সন্তোষজনক নয়। যে কারণে মানুষ ভালো খাবারের জন্য চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আশ্রয়হীনদের জন্য বে বিছানা/ তোষকের বন্দোবস্ত করা হয়েছে সেখানে সামাজিক দুরত্বের নামগন্ধ নেই। হ্যান্ড ওয়াশ বা স্যানিটাইজেশনেরও অভাব রয়েছে। পুলিশের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে লকডাউন ঘোষণার পরও বহু আশ্রয়হীন মানুষ আশ্রয় স্থান থেকে বেড়িয়ে গিয়েছেন। রিপোর্টে পুলিশ জানিয়েছে, ‘তাঁদের জোর করে এই আশ্রয় স্থানগুলিতে রাখা হয়েছে যে কারণে সংলগ্ন এলাকায় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে।'

সরকারি আশ্রয় স্থানে থাকছেন দশ হাজারের বেশি
দিল্লিতে ২২৩টি স্থায়ী আশ্রয় স্থান রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি সুবিধাযুক্ত ১১১টি আশ্রয় স্থান, বেশিরভাগই বিভিন্ন স্কুল বাড়িতে তৈরি করা হয়েছে। লকডাউনের কারণে অনেক শ্রমিকই আটকে পড়েছে এখানে তাঁদের মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত এই স্থানগুলিতে দশ হাজারের বেশি মানুষ থাকছে, যেখানে স্থায়ী জায়গাগুলি দখল করে রয়েছে প্রায় সাত হাজার। রিপোর্টে বলা হয়েছে, পুরনো দিল্লি রেল স্টেশনের কাছে ১১ নম্বর আশ্রয় স্থানে ৩৫০ জন আশ্রয় নেই এমন মানুষ থাকেন। লকডাউনের পর এই সংখ্যাটা কমে ১৫৬-তে দাঁড়িয়েছে। ২৬ এপ্রিলের সরকারি তথ্য অনুযায়ী এই আশ্রয় স্থানে ১৭২ জন রয়েছে বর্তমানে। লাহোরি গেট সংলগ্ন ৭ নম্বর আশ্রয় স্থানে গড়ে ২৫০ জন মানুষ থাকেন। এই সংখ্যাটা এন কমে একশো জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানায় দিল্লি আর্বান শেলটার হাউজিং বোর্ড (ডিইউএসআইবি)। কোতয়ালি ও কাশ্মিরি গেট পুলিশ থানা থেকে যে রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে যে তাদের অন্তর্গত আশ্রয় স্থানগুলিতে কোনো ত্রুটি নেই।

সময় মতো খাবার আসছে না, একাধিক মানুষ একই মাস্ক পরছেন
সদর বাজার পুলিশের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া রিপোর্টে বলা হয়েছে মোতিয়া খান আশ্রয় স্থানে সামাজিক দুরত্ব সঠিকভাবে বজায় থাকছে না কারণ সেখানে ৪১২ জনের বেশি শ্রমিক থাকছেন। এখানে স্যানিটাইজেশন ও পরিস্কারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তিমারপুর আশ্রয়স্থানে প্রাথমিকভাবে কোনও স্বাস্থ্য পরিষেবার সুবিধা নেই, জলও খাওয়ার যোগ্য নয় এবং শ্রমিকরা চালের খিচুড়ির বদলে সবজি-পুরি চাইছেন। রিপোর্টে এও বলা হয়েছে যে অ্যাম্বুলেন্স ও পিলিআর ভ্যানও এই আশ্রয়স্থানের বাইরে রাখা হোক। সরাই রোহিল্লা পুলিশের অন্তর্গত আশ্রয় স্থানগুলিতে শ্রমিকরা ফিরে যেতে চাইছেন, অন্যদিকে গুলাবি বাগের আশ্রয় স্থানে সময় মতো খাবার পৌঁছাচ্ছে না, একই মাস্ক একাধিকজন ব্যবহার করছেন এবং সরকারি স্বেচ্ছাসেবীরা সংখ্যায় অনেক কম।












Click it and Unblock the Notifications