মমতা প্রশান্ত কিশোরকে নিয়েছেন ভালো কথা, কিন্তু দলের মাতব্বররা তাঁর উপদেশ শুনবে তো?
অবশেষে কনসালট্যান্ট-এর সাহায্য নেওয়ার পথে এগোলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আর দু'বছরও বাকি নেই। এরই মধ্যে রাজ্যে বিজেপির অবিশ্বাস্য উত্থান ঘটে গিয়েছে।
অবশেষে কনসালট্যান্ট-এর সাহায্য নেওয়ার পথে এগোলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আর দু'বছরও বাকি নেই। এরই মধ্যে রাজ্যে বিজেপির অবিশ্বাস্য উত্থান ঘটে গিয়েছে। ২০১৪-র পর ২০১৯-এ এখানে গেরুয়া বাহিনীর সাংসদের সংখ্যা দুই থেকে এক লাফে ১৮তে পৌঁছে গিয়েছে। শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের সেখানে ১২টি আসন কমে গিয়ে এখন সর্বসাকুল্যে ২২। পাশাপাশি বিভিন্ন বিধানসভা এবং পুরসভা-পঞ্চায়েত ক্ষেত্রেও দলে ধরেছে ভাঙন। দাপুটে নেত্রীও কি তাহলে অশনি সংকেত দেখে শরণাপন্ন হলেন রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিস্ট প্রশান্ত কিশোরের?
রাজনীতিতে কর্পোরেট ধাঁচের কর্মপদ্ধতি এখন আর নতুন নয়। বিজেপি অদূর অতীতেই কর্পোরেট রীতিতে নির্বাচনে তাকে লাগানো জয় পেয়েছে। প্রশান্ত কিশোর অন্যান্য আঞ্চলিক নেতাকেও ভোটে জয় পেতে সাহায্য করেছেন তাঁর কর্মপদ্ধতিতে। তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর আগে কথা হলেও এবারে মমতা ব্যাপারটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। একুশে প্রশান্তের সাহায্যে তৃণমূল সুপ্রিমো গড় দখল রাখতে পারেন কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

মমতা ভুল পদক্ষেপ নেননি; মোদী, নীতীশরাও প্রশান্তকে কাজে লাগিয়েছেন
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পদক্ষেপে ভুল কিছু নেই। জিতুন বা হারুন, অন্তত একটি সংস্কারবাদী সিদ্ধান্ত যে তিনি নিয়েছেন আজকের পরিবর্তনশীল রাজনীতির দুনিয়ায় সাফল্য পেতে, তাতে তাঁর দলের সমর্থকদের আশান্বিত হওয়ারই কথা। বিরোধীদের "মমতা দুর্বল হয়ে পড়েছেন" জাতীয় সমালোচনাও নিরর্থক কারণ বিজেপির সর্বোচ্চ নেতা নরেন্দ্র মোদীও বেশ কয়েকবার প্রশান্তের সাহায্য নিয়েছেন।
সমস্যা বরং হতে পারে অন্য জায়গায়। এবং তা হল বাস্তবিক প্রশান্তের পরামর্শ কতটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে তৃণমূল?

নীতীশের মতো মমতা কিন্তু রাজ্যে জোটসঙ্গী পাবেন না
প্রথমত, তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেত্রী নিজেও যে খুব একটা কাউকে পরোয়া করেন, তা নয়। কয়েকদিন আগেও তিনি দাবি করেছিলেন যে তাঁর দলে কোনও সমস্যা নেই, সিস্টেম যাকে বলে পারফেক্ট। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের ফল বেরোনোর পরে পরেই তাঁর অবস্থানে যথেষ্ট বদল দেখা যাচ্ছে। মুখে তিনি পাল্টা আঘাত দেওয়ার কথা বললেও মমতা ভিতরে ভিতরে ভালো করেই জানেন যে অবস্থা খুব সহজ নয়। মমতার কাছে লড়াইটা অনেকটা ২০১৫ সালে বিহারে নীতীশকুমারের মতো জমি পুনরুদ্ধার করার মতোই। কিন্তু নীতীশের সঙ্গে সেবারে লালুপ্রসাদ ছিলেন এবং রাজ্যে জোট করেই মোদী-অমিত শাহ জুটিকে পরাস্ত করতে পেরেছিল নীতীশের জনতা দল (ইউনাইটেড)। পশ্চিমবঙ্গে মমতা কিন্তু জোট করার মতো কাউকে পাবেন না। আর যদিও সবাইকে অবাক করে কংগ্রেস ও বামেদের হাত ধরেনও বা, তাতে পরিস্থিতি বিশেষ বদলানোর নয়। কারণ ওই দু'টি দলই এখন জীবন্মৃত।

প্রশান্তকে 'বেশি ওস্তাদি করবেন না' শুনতে হয়েছে আগে
দ্বিতীয়ত, অতীতে জেডিইউ এবং কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করাকালীন প্রশান্তকে তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন যে হতে হয়নি, তা নয়। দু'হাজার সতেরোতে নীতীশ এনডিএ-র হাত ধরেন ফের লালু ও কংগ্রেসের সঙ্গে মহাজোটকে ভাসিয়ে দিয়ে এবং সে বিষয়ে প্রশান্ত বলেছিলেন যে নীতীশের উচিত ছিল ফের ভোটে যাওয়ার যাতে মানুষের না মনে হয় যে তিনি তাঁদের দেওয়া মতাদেশকে অপমান করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই, জেডিইউ নেতৃত্বের পছন্দ হয়নি এ কথা। তেমনই, কংগ্রেসের সঙ্গে উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনে কাজ করার সময়ে প্রশান্ত নাকি প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সক্রিয় রাজনীতিতে ঢোকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কংগ্রেস নেতৃত্ব শোনেননি তাঁর কথা যদিও দুই বছর পরে সেই পথই তাঁরা নেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের মতো বহু-মাতব্বরের দলেও প্রশান্তের এই অভিজ্ঞতা হওয়া বিচিত্র নয়। নেত্রী হয়তো তাঁকে তাঁর মতো কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দেবেন, কিন্তু আদি-নব্য-তে বিভাজিত বঙ্গের শাসক দলের অনেক নেতা-হোতা হয়তো নিজেদের অহং ত্যাগ করে প্রশান্তকে মেনে নিতে দ্বিধা করবেন। আর সেরকম ঘটনা ঘটলে আসল লক্ষ্যটি অধরাই থেকে যাবে।

প্রশান্ত জেডিইউ-র একজন উচ্চ আধিকারিক, জেডিইউ আবার বিজেপির সঙ্গী
তৃতীয়ত, প্রশান্ত এখন জেডিইউ-র একজন উচ্চ আধিকারিকও বটে। জেডিইউ যেহেতু এখন বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র সদস্য, তাই তাদের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রশান্ত (যিনি গত অক্টবরেই এই পদে নিযুক্ত হন) বিজেপিরই পয়লা নম্বর দুশমন তৃণমূলকে সাহায্য করছেন, এমন ঘটনায় যে বেশ কিছু শিবির বিব্রত হবে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। জেডিইউ ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে প্রশান্তের সঙ্গে দূরত্ব রাখছে; অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের একাংশ বলছে আড়ালে-আবডালে বিজেপি ঢিট করারই প্রস্তুতি নিচ্ছে জেডিইউ। অর্থাৎ, বিভ্রান্তি চরমে উঠতে আর বেশি দেরি নেই।

শুধু পরামর্শদাতা দিয়েই কি কাজ হবে?
তাছাড়া, শুধু একজন পরামর্শদাতা নিয়োগ করলেই কাজ হাসিল হয়ে যাবে, এমন আশা করা মূর্খামি। পরামর্শদাতা থাকা ভালো, বিশেষ করে প্রশান্ত যিনি বেশ কিছু নির্বাচনে তাঁর ম্যাজিক ফলিয়েছেন, কিন্তু পাশাপাশি বাস্তব জমিতে রাজনৈতিক কর্মকান্ডকে এগিয়ে নিয়ে চলার প্রকল্পটিকেও চালু রাখা আশু জরুরি। কারণ তৃণমূলের সংগঠনেই এখন বড় ভাঙন ধরেছে এবং তা মেরামত করতে কনসালট্যান্ট-এর চেয়েও বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক নেতৃত্ব। শুধুমাত্র রাজনৈতিক রক্ত গরম করা বুলি দিয়ে এই যুদ্ধ জয় করা যাবে না। প্রশান্ত দিদিকে সে কথা হয়তো বলবেনও। কিন্তু পুরোনো স্বভাব বদলাবে কি?












Click it and Unblock the Notifications