জন্ম ও মৃত্যুকে একইসঙ্গে জয় করা এক প্রবল পরাক্রমের নাম মহারানা প্রতাপ

জন্ম ও মৃত্যুকে একইসঙ্গে জয় করা এক প্রবল পরাক্রমের নাম মহারানা প্রতাপ

মহারানা প্রতাপ সকলের মনে চির শাশ্বত হয়ে রয়েছেন। আজ থেকে ৪২৫ বছর আগে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই উপমহাদেশে যুগে যুগে বহু রাজা-মহারাজা-সম্রাট শাসন করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন মহারানা প্রতাপ। শুধু তাঁর শৌর্য দীর্ঘদিনের শাসন অথবা সুবিশাল সাম্রাজ্য গড়ার মধ্য দিয়েই নয়, মহারানা প্রতাপ চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও বারবার জয়ী হয়ে এগিয়ে গিয়েছেন। তিনি শুধু একজন মহারাজা ছিলেন না। তিনি ছিলেন শৌর্য, সাহস, স্বাধীনতা, পরাক্রম এবং বলিদানের প্রতীক। বেঁচে থাকাকালীন তিনি সকলের মন জয় করেছিলেন। এবং মৃত্যুর পরে অমর হয়ে রয়ে গিয়েছেন।

জন্ম ও মৃত্যুকে একইসঙ্গে জয় করা এক প্রবল পরাক্রমের নাম মহারানা প্রতাপ

১৫৪০ সালের ৯ মে কুম্ভলগড় দুর্গে জন্ম হয় প্রতাপের। তাঁর পিতা ছিলেন রানা উদয় সিং এবং মায়ের নাম ছিল জয়বন্ত বাই। প্রতাপের মায়ের প্রতি পিতা রানা উদয় সিংয়ের অনুরাগ কম ছিল। যার ফলে মহলের থেকেও বেশি ঘরের বাইরে সাধারণ সমাজের প্রতাপের ছোটবেলা কেটেছিল। মহল থেকে দূরে থাকায় তিনি নিজেকে অন্য ভাবে তৈরি করতে পেরেছিলেন। যা একজন সাধারণ রাজার থেকে তাঁকে আলাদা করেছিল। মহারানা প্রতাপ আম জনতার মধ্যে বড় হয়ে উঠেছিলেন। সাধারণ মানুষের চারিত্রিক গুণগুলোকে আপন করে নিয়েছিলেন মহারানা প্রতাপ। তিনি বড় হচ্ছিলেন আদিবাসী জনজীবনের সঙ্গে। যার ফলে খুব সহজেই পাহাড়ে চড়া, ঘোড়ায় চড়া, সাঁতার কাটা, নৌকা চালানো, জঙ্গলে শিকার করা তিনি আয়ত্ত করে ফেলেছিলেন। তিনি একাকী নিজেকে কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে তৈরি করেছিলেন। তবে কখনও নিঃসঙ্গ ছিলেন না। জঙ্গল এবং পাহাড় তাঁর চরিত্রকে আরও মজবুত এবং স্বতন্ত্র করে তুলেছিল। আর এভাবেই সকলের অলক্ষ্যে তিনি এক মস্ত যোদ্ধায় পরিণত হন।

১৫৭২ সালে মেওয়াড়ের রাজমুকুট পরেন মহারানা প্রতাপ। তিনি পেয়েছিলেন পাথুরে জমি এবং সর্বদা মোঘল আক্রমণের ভয়। কিন্তু তাতে দমে যাননি মহারানা প্রতাপ। বিশ্বস্ত অনুগামীদের নিয়ে কোমড় কষে নেমে পড়েছিলেন। অসম লড়াইয়ে তৈরি হয়েছিলেন যুদ্ধের জন্য।

মহারানা প্রতাপ রাজ্যপাটের দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরেই মেওয়াড়ের সঙ্গে মোঘলদের যুদ্ধ হয়। মোগল সম্রাট আকবর চেয়েছিলেন হলদিঘাটের নিয়ন্ত্রণ করতে। যাতে গুজরাত পর্যন্ত তিনি সহজে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেন। কিন্তু মাতৃভূমি ছেড়ে দিতে রাজি ছিলেন না মহারানা প্রতাপ। শোনা যায় একবার সম্রাট আকবর দ্রুত পাঠিয়ে মহারানাকে তাঁর আধিপত্য স্বীকার করার অনুরোধ জানান। সঙ্গে এও বলেন, যদি মহারানা প্রতাপ মোঘলদের আধিপত্য স্বীকার করে নেন তাহলে তাঁকে অর্ধেক হিন্দুস্তান দিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু মহারানা সেই প্রস্তাবে রাজি হননি। গোটা দুনিয়াকে দিলেও তিনি কারও সামনে মাথা নত করবেন না, এমনটাই জানান। যার ফলে হলদিঘাটের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। একদিকে ছিল মুঘলদের দু লক্ষ সৈন্য, অন্যদিকে মহারানা প্রতাপের নেতৃত্বে মাত্র ২২ হাজার সৈন্য।

তবুও প্রবল পরাক্রমে মহারানা যুদ্ধ করেন। মোঘল সেনাপতি বেলাল খানের মাথা দু'টুকরো করে দেন। পরে মেওয়াড়ের সেনাপতি মান সিংয়ের অনুরোধে তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে যান। ফলে তাঁকে বন্দি করতে পারেনি মোঘলরা। মহারানার সবচেয়ে প্রিয় ঘোড়া চেতক প্রভুকে নিয়ে নদী পার করে প্রাণ ত্যাগ করে। মহারানার প্রিয় হাতি রামপ্রসাদকে বন্দি করে সম্রাট আকবরের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানে হাতি রামপ্রসাদ অন্নজল ত্যাগ করে মারা যায়। এই ঘটনায় সম্রাট আকবর নাকি বলেছিলেন, মহারানা প্রতাপ দুরস্থান, তাঁর হাতিও মাথানত করল না। সংখ্যায় দশগুণ বেশি মোঘল সেনা থাকলেও সেই যুদ্ধে মহারানা প্রতাপের মাত্র ১২ হাজার সৈন্য মারা গিয়েছিল। অন্যদিকে মোঘলদের ৯০ হাজার সেনা মারা গিয়েছিল।

মহারানা প্রতাপ তাঁর সাম্রাজ্যে কৃষির প্রগতি এবং জলসেচে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। যা ওই পাহাড়ি এলাকার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। নিজের প্রাসাদকে সাহিত্য এবং কলার এক পীঠস্থান হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন মহারানা প্রতাপ। তাঁর সময় শিল্পকলার দিক থেকেও নতুন জোয়ার এসেছিল। তিনি খুব কম সময়ে হয়ে উঠেছিলেন মানুষের মনের রাজা।

তবে মাত্র ৫৭ বছর বয়সে একাধিক যুদ্ধে আহত-অসুস্থ মহারানা প্রতাপ প্রয়াত হন। মেওয়াড়ের স্বাধীনতা ও প্রগতির জন্য তিনি বরাবর লড়াই করে গিয়েছেন যে লড়াইয়ের কোনও তুলনা হয় না।

মহারানা প্রতাপের মৃত্যু সংবাদ গিয়ে পৌঁছয় সম্রাট আকবরের কাছে। চরম শত্রু মহারানা প্রতাপের প্রয়াণে কার্যত ভেঙ্গে পড়েছিলেন সম্রাট আকবর। তাঁর চোখের কোনায় ছিল জল। যখন মহারানা প্রতাপের মৃত্যু সংবাদ শোনাচ্ছেন দূত, সেই সময় সম্রাট আকবর ভেঙ্গে পড়েছিলেন। সম্রাট আকবর তাঁর শেষ শ্রদ্ধা জানান মহারানা প্রতাপকে। কারণ মহারানা প্রতাপ তাঁর শৌর্য এবং বীরত্বের মাধ্যমে জীবন এবং মৃত্যু, দুটিকেই জয় করেছিলেন।

(লেখক ললিত নারায়ণ সিং একজন গুজরাতের আইএএস অফিসার এবং গান্ধীবাদী অর্থনীতিতে পিএইচডি প্রাপক)

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+