গালওয়ান থেকে প্যাংগং, একনজরে লাদাখ সীমান্তে ভারত-চিন সংঘাতের 'হাইলাইটস'
গালওয়ান থেকে প্যাংগং, একনজরে লাদাখ সীমান্তে ভারত-চিন সংঘাতের 'হাইলাইটস'
২০১৯ সালের ১ নভেম্বর থেকেই পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে লাদাখ। এরপর প্রায় গোটা ২০২০ সাল ধরেই লাদাখ সীমান্তে জোর উত্তেজনা জারি থাকল। সীমান্ত সমস্যার খবর প্রকাশ্যে আসে মে মাসের শুরুর দিকে। জানা যায়, পূর্ব লাদাখ সীমান্তে হিংসাত্মক সংঘর্ষে ২৫০ জন সৈন্য জড়িত ছিল৷ ৫মে সন্ধ্যায় সংঘর্ষ শুরু হয় এবং পরদিন বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেয়৷ অন্যদিকে সেই সপ্তাহেই এক পৃথক ঘটনায় সিকিমের নাকু লা পাসে ভারত ও চিনের ১৫০ জন সেনা সংঘর্ষে যুক্ত ছিল৷ তাতে উভয় পক্ষের ১০ জন সেনা আহত হয়৷ এরপরই ভারত-চিন সীমান্তের অশান্তির বিষয়টি সামনে এসেছিল।

এলএসি-র পাশে চিনের রাস্তা নির্মাণ
এই পরিস্থিতিতে গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ভারত- চিন সীমান্তে চিন নিজেদের লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলের পাশে রাস্তায় পরিকাঠামো তৈরি করে। এর পাল্টা ভারতও বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশনকে দিয়ে এলএসি-র পাশে রাস্তার একটি যথাযথ নেটওয়ার্ক তৈরি করার কাজ শুরু করেছে। কিন্তু তাতে বাধা দেয় চিনের সেনা। রুখে দাঁড়ায় ভারতীয় সেনাও। লাদাখের তিন জায়গাতেই এরপর থেকে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে দুই দেশের সেনা। বাড়তে থাকে উত্তেজনাও। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ২৩ মে লাদাখে যান সেনা প্রধান।

উচ্চস্তরীয় বৈঠক হয় দিল্লিতে
এর কয়েকদিন পরই সীমান্তের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে তিন সেনার প্রধানদের সঙ্গে একটি পর্যালোচনা বৈঠক করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। স্থল সেনাপ্রধান মনোজমুকুল নারাভানের কাছ থেকে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ খবর নেন তিনি। আলাদা করে তিন সেনার প্রধানদের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। সেদিনই এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তিন সেনার প্রধান জেনেরাল বিপিন রাওয়াত ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। এর মাঝে ট্রাম্পের টুইট ঘিরেও বিস্তর জল্পনা শুরু হয়। ভারতের পাশে থাকার আশ্বাস দেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। তবে তিনি ভারত ও চিনের মধ্যে মধ্যস্থতার ইচ্ছা প্রকাশও করেন।

কী কারণে বিবাদ?
মূলত অঞ্চলভিত্তিক অধিকারকে কেন্দ্র করে একাধিক বিতর্কিত বিষয়ের জেরে দুই দেশের মধ্যে সমস্যা তৈরি হয়েছিল৷ চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর এলাকায় তৈরি হওয়া সমস্যা সেই দ্বন্দ্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল৷ দুই দেশই আস্তে আস্তে ওই এলাকায় সেনা মোতায়েন বাড়াতে থাকে৷

গালওয়ান সংঘর্ষ
এই পরিস্থিতিতে ১৫ জুন রাতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয় পূর্ব লাদাখের ভারত-চিন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায়৷ দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষে শহিদ হন তিনজন৷ গুরুতর জখম হয়েছিলেন আরও বহু জওয়ান৷ ভারতীয় সেনার তরফে জানানো হয়েছিল, অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে জখম সেনাদের মধ্যে ১৭জনের মৃত্যু হয়৷ অন্যদিকে, এই সংঘর্ষে চিনের ৪৩জন সেনা হতাহত হয়েছে বলে জানিয়েছিল ভারতীয় সেনা৷ সেনার তরফে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছিল, গালওয়ান ভ্যালিতে সেনা প্রত্যাহারের সময় সংঘর্ষ বাধে৷ সংঘর্ষে ভারতের একজন আধিকারিক ও দুই জওয়ান শহিদ হন৷ ঘটনার একদিন পর জানা যায়, এই সংঘর্ষে মৃত্যু হয়েছে চিনের এক কমান্ডিং অফিসারের৷ কিন্তু, বিষয়টি নিয়ে চিনের তরফে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি৷

ঠিক কী ঘটেছিল ১৫ জুন?
ঠিক কী ঘটেছিল ১৫ জুন? আসলে এটা ১৫ জুন নয়৷ তার কয়েকদিন আগেই চিনা সেনা আকসাই চিন এলাকায় প্রবেশ করেছিল৷ পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মতো এই সীমান্তের কোনও চিহ্ন নেই৷ ওই উচ্চতায় বরফের মধ্যে দুই দেশই নিজেদের ধারণা মতো সীমান্ত নির্ধারণ করে৷ সারা বছর ধরে সেনারা একদিক থেকে আর একদিকে যায়৷ আবার ফিরে আসে৷ এই সময় কয়েকদিন ধরে ভারতীয় সেনা লক্ষ্য করছিল যে, প্যাট্রল পয়েন্ট ১৪-তে যেখানে কোনও সেনা মোতায়েন থাকে না সেখানে সেনা রয়েছে৷ এর ১০ দিন আগে উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক হয় গালওয়ানে৷ সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ওরা প্যাট্রল পয়েন্ট ১৪ থেকে সমস্ত পোস্ট সরিয়ে নেবে৷ চিনা পর্যবেক্ষণ পয়েন্টও ভারতীয় সীমান্তের ভিতরে৷

ভারতের ২০জন শহিদ হন
১৫ জুন সকালেই চিনা অফিসারদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন কর্নেল সন্তোষ বাবু ৷ বিকেল পাঁচটা নাগাদ চিনা সেনারা তাদের পোস্ট সরিয়েছে কিনা তা দেখতে সন্তোষ বাবু ১৬ বিহার রেজিমেন্টের আরও কয়েকজন অফিসারদের নিয়ে যান৷ কিন্তু, কিছুটা যাওয়ার পরই তাঁরা বুঝতে পারেন একটাও পোস্ট সরানো হয়নি৷ উল্টে তারা ভারতের অন্তর্ভুক্ত এলাকায় তাঁবু খাটায়৷ তাদের কাছে জানতে চান কেন এখনও সরানো হয়নি পোস্টগুলি৷ তারপরই ওই বাহিনী কর্নেলকে ধাক্কা মেরে চিনা সীমান্তে নিয়ে যায়৷ তিনি জখম ছিলেন৷ কর্নেলকে ওই অবস্থায় দেখে ভারতীয় জওয়ানরাও এগিয়ে আসেন৷ তারপরই মুখোমুখি সংঘর্ষ শুরু হয়৷ ততক্ষণে রাত ১১টা বেজে গিয়েছে৷ ভারতের ২০জন শহিদ হন৷

সংকটপূর্ণ অবস্থা তৈরি হয়
১৯৬২ সালের পর এটাই সবচেয়ে বড় সংকটপূর্ণ অবস্থা তৈরি হয়৷ ১৯৬২ সালে যুদ্ধের সময় চিনা সেনা পশ্চিম লাদাখের ৩৮ হাজার কিলোমিটার দখল করে নেয়৷ এটিই এলএসি৷ না এটির ম্যাপে রয়েছে, তবে বাস্তবে কোনও সীমারেখা নেই৷ তাই দুই পক্ষের মধ্যেই এই নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে৷ এছাড়া আরও অনেক অনুপ্রবেশ হলেও সেগুলি ছিল স্থানীয় ঘটনা৷ তাই হিংসা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে মিটিয়ে নেওয়া হয়েছিল সমস্যাগুলি৷ তবে ১৫ জুন সংঘর্ষের পর দুই দেশের অবস্থা একদমই আলাদা৷

লাদাখে যান স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী
এরপর ৩ জুলাই লাদাখে যান স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেখানে মোতায়েন সেনা জওয়ানদের উদ্বুদ্ধ করতে বক্তৃতা রাখেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। সে দিন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল যথেষ্ট কড়া ও চাঁছাছোলা। চিনের এই আগ্রাসী আচরণের প্রতিবাদ করে তিনি বলেছিলেন, 'ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে যে, সম্প্রসারণবাদীরা হয় হেরে গিয়েছে, না হয় পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে।'

অপারেশন স্নো লেপার্ড
এরই মাঝে ভারতীয় সেনা অপারেশন স্নো লেপার্ড চালায়। অপারেশন স্নো-লেওপার্ড লঞ্চ করার আগে তিনমাস ধরে ভারতীয় সেনা পরিকল্পনা কষছিল এই বিষয়ে। চিনের বারংবার অনুপ্রবেশের চেষ্টা বিফল করে ভারতীয় সেনা লাদাখের প্যাংগংয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চূড়ার দখল নেয়। যার জেরে প্যাংগং এলাকায় চিনের গতিবিধি ভারতীয় সেনার নখদর্পণে চলে আসে। পাশাপাশি চিনের থেকে কৌশলগত দিক দিয়ে এগিয়ে যায় ভারত।

বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পৌঁছে যায় ভারত
এই অপারেশনের মাধ্যমে ভারতীয় সেনা ফিঙ্গার ২ এবং ফিঙ্গার ৩-এ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পৌঁছে যায়। প্যাংগংয়ের দক্ষিণে ভারতীয় সেনা এই অপারেশ চলাকালীন অবশ্য এলএসি পার করেনি বলে জানা গিয়েছে। যদিও চিন এখনও ফিঙ্গার ৪-এর রিজলাইন দখল করে রয়েছে। চিনা সেনারা ফিঙ্গার ৪ থেকে ফিঙ্গার ৮-এর মধ্যে ৮-কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকাজুড়ে তাদের তৈরি কাঠামোগুলিকেই এলএসি বলে দাবি করে যাচ্ছে এখনও।

টহলদারী সীমান্ত নিয়ে চাপা উত্তেজনা
টহলদারী সীমান্ত নিয়ে বরাবরই ভারত ও চিনের মধ্যে চাপা উত্তেজনা ছিল। ভারত বিশ্বাস করে 'ফিঙ্গার ১' থেকে 'ফিঙ্গার ৮' পর্যন্ত টহল দেওয়ার অধিকার রয়েছে তাদের এবং চিন মনে করে যে 'ফিঙ্গার ৮' থেকে 'ফিঙ্গার ৪' পর্যন্ত টহল দেওয়ার অধিকার রয়েছে তাদেরই। ১৫ জুন, এই 'ফিঙ্গার ৪' এলাকাতেই উভয় পক্ষের সেনার মধ্যে সহিংস সংঘর্ষ বাঁধে। পরে উভয় পক্ষের সীমানা যেখানে কয়েক হাজার ভারতীয় সৈন্যকে কাঁটাতারের সাথে জড়িত লাঠির মতো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছিল। 'ফিঙ্গার ৪'-এ এই জন্যেই উল্লেখযোগ্য হারে সেনার সংখ্যা বাড়িয়েছিল চিন যাতে ভারতীয় সেনারা আর 'ফিঙ্গার ৮' এর দিক দিয়ে টহল দেওয়ার সুযোগ না পায়।

ফের সংঘর্ষ
এরপর জানা যায়, অগাস্টের ২৯ থেকে ৩১ তারিখের মধ্যে ভারতীয় বাহিনী ও চিনা সেনার মধ্যে ফের গুলি বিনিময় হয়। জানা যায়, লাদাখের প্যাংগং লেকের দক্ষিণ দিকে চিনা সেনার অনুপ্রবেশের চেষ্টা বানচাল করে দেয় ভারতীয় সেনা। এরপরেই উত্তর দিকে লাল ফৌজের গতিবিধি নজরে আসে। সেপ্টেম্বরের ৮ তারিখ ভারতীয় সীমানার কাছাকাছি চলে আসে লাল ফৌজ। এরপরই সীমান্তে ভারতীয় সেনার নজরদারি বাড়াতে থাকে। এমনকী অরুণাচল প্রদেশের বিপরীত দিকেও চিনা সেনার গতিবিধি নজরে পড়ে ভারতীয় জওয়ানদের।

চুশুলে একের পর এক বৈঠক
এরই মাঝে সীমান্তের বিরোধ মেটাতে পূর্ব লাদাখের চুশুল সেক্টরে ভারত ও চিনের সামরিক বাহিনীর মধ্যে বেশ কয়েক দফা আলোচনা চলে। যদিও একাধিকবার সেনা প্রত্যাহারের কথা বলেও উল্টোটা করেছে চিন। এই পরিস্থিতিতে মস্কোতে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গনাইজেশনের সম্মেলনে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বৈঠকে বসেন সেদেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও দেখা করেন চিনা বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে। তবে এখনও চিন থেকে থেকে নিজেদের আগ্রাসী মনোভাব প্রকাশ করছে। যার জেরে ফের অশান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে লাদাখে। সেনা প্রত্যাহারে দেরি হচ্ছে। তাছাড়াও শীতকালীন সংঘাতের জন্যেও তৈরি হচ্ছে দুই দেশ।












Click it and Unblock the Notifications