১৩ বছর ধরে কোমায় থাকা হরিশ রানার জন্য প্যাসিভ ইউথানেশিয়ার অনুমতি সুপ্রিম কোর্টের, ঐতিহাসিক রায়
ভারতের বিচারব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। ১৩ বছর ধরে কোমায় থাকা তরুণ হরিশ রানাকে 'প্যাসিভ ইউথানেশিয়া' বা জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের অনুমতি দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বুধবার বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা ও বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জানায়। ২০১৮ সালের 'কমন কজ' মামলার রায় ও ২০২৩ সালের সংশোধিত নির্দেশিকার আইনি কাঠামোর ভিত্তিতেই এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এই মামলা দায়ের করেছিলেন হরিশ রানার বাবা। বর্তমানে ৩২ বছর বয়সী হরিশ প্রায় ১৩ বছর ধরে এক অনির্বচনীয় যন্ত্রণার মধ্যে রয়েছেন। ২০১৩ সালে চণ্ডীগড়ে পড়াশোনার সময় হোস্টেলের চতুর্থ তলা থেকে পড়ে গুরুতর দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। সেই দুর্ঘটনায় মারাত্মক মস্তিষ্কে আঘাত লাগে ও তিনি 'পারসিস্টেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেটে' চলে যান। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থায় রোগী সচেতন থাকেন না, আর হরিশের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ চার অঙ্গ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। গত ১৩ বছরে তাঁর শারীরিক অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি বলেই চিকিৎসা রিপোর্টে জানানো হয়েছে।

বর্তমানে কৃত্রিম পদ্ধতিতে শরীরে পুষ্টি সরবরাহ করেই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে স্থাপিত 'পিইজি টিউব' এর মাধ্যমে দেওয়া ক্লিনিক্যালি অ্যাডমিনিস্টার্ড নিউট্রিশনই তাঁর একমাত্র জীবনরক্ষাকারী সহায়তা।
রায় দিতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, হরিশকে এআইআইএমএস এর প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করতে হবে। সেখানেই চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ধাপে ধাপে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। আদালত স্পষ্ট করে দেয়, পুরো প্রক্রিয়াটি মর্যাদা, সহমর্মিতা ও কঠোর চিকিৎসা নৈতিক বিধি মেনেই সম্পন্ন করতে হবে।
বিচারপতিরা আরও জানান, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁরা হরিশের পরিবারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাঁদের মানসিক অবস্থাও বোঝার চেষ্টা করেছিলেন।
এআইআইএমএসের চিকিৎসকদের রিপোর্ট অনুযায়ী, হরিশের সুস্থ হয়ে ওঠার কোনও সম্ভাবনাই নেই। বিচারপতি পারদিওয়ালা বলেন, "এই রিপোর্ট অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কিন্তু এই তরুণকে অনন্তকাল এমন যন্ত্রণার মধ্যে রেখে দেওয়া যায় না। এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।"
আদালত আরও জানায়, 'ক্লিনিক্যালি অ্যাডমিনিস্টার্ড নিউট্রিশন'ও চিকিৎসারই অংশ। তাই প্রয়োজন হলে তা প্রত্যাহার করা যেতে পারে। প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি মেডিক্যাল বোর্ড দুই পক্ষই মত দেয় যে এই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার কোনও বাস্তব চিকিৎসাগত লাভ নেই, বরং তা শুধু তাঁর জৈবিক অস্তিত্বকে দীর্ঘায়িত করছে। হরিশের বাবা মাও একই মত পোষণ করেন।
এই সব দিক বিবেচনা করেই সুপ্রিম কোর্ট জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা প্রত্যাহারের অনুমতি দেয়। আদালতের মতে, এই সিদ্ধান্তই রোগীর সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষা করে ও মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুবরণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।
এই রায়কে দেশের বিচারব্যবস্থায় এক মাইলফলক হিসেবেই দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। কারণ 'রাইট টু ডাই উইথ ডিগনিটি' বা মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকারের প্রশ্নে এই প্রথম সুপ্রিম কোর্ট কোনও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্যাসিভ ইউথানেশিয়ার অনুমোদন দিল।












Click it and Unblock the Notifications