উডুপি কলেজে পড়ুয়াদের প্ররোচনায় হিন্দুত্ববাদী সংগঠন, চাঞ্চল্যকর তথ্য সংবাদমাধ্যমের তদন্তে
উডুপি কলেজে পড়ুয়াদের প্ররোচনায় হিন্দুত্ববাদী সংগঠন
পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের মুখে কর্নাটকে হিজাব কাণ্ড নিয়ে উত্তাপ ক্রমশঃ বাড়ছে। উডুপি জেলার সরকারি কলেজের ক্লাসরুমে হিজাব পরে মেয়েদের প্রবেশ আটকানো নিয়ে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হচ্ছে। ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকার হিংসাত্মক ঘটনা এড়াতে ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে বুধবার থেকে রাজ্যের সব স্কুল–কলেজে তিনদিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। এক সর্বভারতায় সংবাদমাধ্যমের তদন্তে উঠে এসেছে যে উডুপির হিন্দু জাগরণ বেদিক এমজিএম কলেজের পড়ুয়াদের তাঁদের হিজাব–পরিহিতা সহ–পড়ুয়াদের বিরপদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্য প্ররোচনা দিচ্ছে এবং ওই কলেজের পড়ুয়াদের গেরুয়া চাদর ও পাগড়ি দেওয়া হচ্ছে।

গেরুয়া চাদর ও হিজাব পরিহিত পড়ুয়াদের মধ্যে সংঘর্ষ
মঙ্গলবার, ৮ ফেব্রুয়ারি এমজিএম কলেজে দেখা গিয়েছে একশোজনের ওপর গেরুয়া চাদর পরা পড়ুয়া ও একদল হিজার পরা মুসলিম মেয়েদের মধ্যে বচসা হচ্ছে। এটা অবশ্য সেই কলেজ নয়, যেখানে প্রথম কর্নাটকের হিজাব কাণ্ড শুরু হয়েছিল। ওই সংবাদমাধ্যমের তদন্তে এও জানা গিয়েছে যে গেরুয়া-চাদর জড়ানো প্রতিবাদী পড়ুয়ারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তাঁরা আগে দেখবে উদুপির মহিলা সরকারি পিউ কলেজে হিজাব পরা নিয়ে কি ঘটনা ঘটছে তারপরই তাঁদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করা হবে। তবে সংবাদমাধ্যমের তদন্তে এও উঠে এসেছে যে এই প্রতিবাদটি স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না, এবং গেরুয়া চাদর এবং পাগড়ি হিন্দু জাগরণ বেদিক দ্বারা আয়োজন করা হয়েছিল।

পড়ুয়াদের প্ররোচনা
এই সংবাদমাধ্যমের হাতে একটি মেসেজ এসেছে যা এমজিএম কলেজ পড়ুয়াদের মধ্যে মঙ্গলবারের বচসার দু'দিন আগে ছড়িয়ে পড়েছিল। কন্নড় ভাষায় লেখা সেই মেসেজে লেখা রয়েছে, 'উডুপিতে ইতিমধ্যেই এই হিজাব কাণ্ড নিয়ে বড়সড় ইস্যু তৈরি হয়ে গিয়েছে এবং একটা ছোট্ট কাপড় গত একমাস ধরে মুসলিম মেয়েরা মুখের সামনে লাগিয়ে সমস্যার সৃষ্টি করছে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় মেসেজ পোস্ট করছে। আমরা সতর্ক করে জানাচ্ছি যে হিজাব সমস্যা এমজিএম কলেজেও রয়েছে। এমনকী আমাদের কলেজে আমরা চাই যে এই হিজাব কাণ্ড এই শিক্ষাবর্ষের মধ্যেই শেষ হোক এবং আমাদের সকলের অভিন্নতা রক্ষার জন্য লড়াই করা অপরিহার্য। তাই সকল পড়ুয়াদের সোমবার গেরুয়া রঙের চাদর আনা বাধ্যতামূলক এবং তা ব্যাগের মধ্যেই রাখবে যতক্ষণ না সংগঠনের পক্ষ থেকে নির্দেশ আসে যে এটা কাঁধে নিয়ে কলেজে প্রবেশ করার।' এই মেসেজের শেষে লেখা রয়েছে 'জয় শ্রী রাম'।

বাইরে থেকে পাঠানো হয় মেসেজ
এই কলেজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এক ব্যক্তি, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে তাঁরা জানেন না এই মেসেজটি কে বা কোন সংগঠন পাঠিয়েছে, তবে মনে করা হচ্ছে যে কলেজের বাইরে থেকেই এই মেসেজটি এসেছে। ওই ব্যক্তি বলেছেন, 'এই মেসেজটি সব ক্লাসের পড়ুয়াদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পিইউসি প্রথম বর্ষের পড়ুয়াদের মধ্যে।' তিনি আরও বলেন, 'তবে এই মেসেজটি কোথা থেকে এসেছে সেটা স্পষ্ট নয় তবে আমরা জানি এই মেসেজ কলেজের বাইরে থেকেই এসেছে।' ওই সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে প্রতিবাদের ভিডিও বিশ্লেষণ করে ও কলেজে ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলার পর জানতে পেরেছে যে মঙ্গলবার সকালে কলেজে গেরুয়া চাদর পরা ছাত্রদের একত্রিত করার পেছনে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী হিন্দু জাগরণ বেদিক ছিল।

বিজেপি নেতা যশপাল সুবর্ণের উপস্থিত
অজ্ঞাত পরিচয়ের পাঠানো ওই মেসেজে পড়ুয়াদের সোমবার গেরুয়া চাদর নিয়ে আসার জন্য বলা হয়। যদিও সোমবার কোনও প্রতিবাদ হয়নি তবে মঙ্গলবার গেরুয়া চাদর পরা ছাত্রদের সঙ্গে হিজাব পরে আসা মেয়ে পড়ুয়াদের মুখোমুখি ঝামেলা বাঁধে। তদন্তে উঠে এসেছে যে মঙ্গলবার পড়ুয়াদের সংঘর্ষের সময় এমজিএম কলেজে সেই সময় বিজেপি নেতা যশপাল সুবর্ণ উপস্থিত ছিলেন। পড়ুয়াদের স্লোগান দেওয়ার মাঝখানে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। এরপর এমজিএম কলেজ কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে এই মুখোমুখি সংঘর্ষ থেমে যায় এবং দুপুর একচার মধ্যে পড়ুয়ারা গায়েব হয়ে যান কলেজ থেকে। দেখা গিয়েছে যে এই প্রতিবাদের পরই গেরুয়া চাদর পরিহিত পড়ুয়ারা এমজিএম কলেজ সংলগ্ন জনপ্রিয় আজাম্মা ক্যাফেতে গিয়ে হিন্দু জাগরণ বেদিকের সদস্যদের কাছে এই গেরুয়া চাদরগুলি জমা দিয়ে আসে। হিন্দু জাগরণ বেদিকের বিভাগীয় সম্পাদক প্রকাশ কুক্কেহালি সেই সময় আজাম্মা ক্যাফেতে উপস্থিত ছিলেন, যখন পড়ুয়ারা সংগঠনকে গেরুয়া চাদর ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি এই সংবাদমাধ্যমকে বিষয়টি জানিয়েছেন।

হিন্দু জাগরণ বেদিকার ভূমিকা
এমজিএম কলেজে দুই পড়ুয়া গোষ্ঠীর সংঘর্ষে হিন্দু জাগরণ বেদিকের ভূমিকা কি? এ প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমকে প্রকাশ বলেছেন, 'সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলি হিজাব ইস্যুকে কেন্দ্র করে উডুপিতে পড়ুয়াদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করার চেষ্টা করছে এবং সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টায় রয়েছে। আমরা শুধু তার প্রতিবাদ করেছি।' মঙ্গলবার এমজিএম কলেজের কাছে কেন হিন্দু জাগরণ বেদিকের সদস্যদের দেখা গিয়েছিল, এ প্রসঙ্গে উডুপির জেলা সভাপতি প্রশান্ত নায়েক পুরো বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, 'এখনও পর্যন্ত যা ঘটে চলেছে তা সবই পড়ুয়াদের সৃষ্ট এবং আমরা এর মধ্যে যুক্ত নই। সমাজের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমরা এ বিষয়ে চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে পারি না। আমাদের ধর্ম বলে যে কোনটা সঠিক এবং কোনট ভুল এবং কীভাবে আচরণ করা উচিত। আমরা নিষ্ঠুরতাকে সমর্থন করি না এবং কখনই সমর্থন করব না। কিন্তু আমরা সবসময় হাত বেঁধে বসে থাকতে পারি না, আমাদের সমাজকে রক্ষা করা আমাদের কাজ।' তিনি আরও বলেন, 'দেখুন, এখানে এমন কোনও পড়ুয়া নেই যে তাঁর কাছে চাদর কেনার টাকা নেই। পড়ুয়ারা নিজেরাই একই ধরনের চাদর জোগাড় করেছে এবং পড়ুয়ারা কি করতে পারে এটা তারই উদাহরণ।'

গেরুয়া স্কার্ফ ও পাগড়ি ফিরিয়ে দিতে হয়
যদিও পড়ুয়াদের এই স্কার্ফ ও পাগড়ি অক্টোবরে হিন্দু জাগরণ বেদিকের 'দুর্গা দাউদ' ইভেন্টে ব্যবহার হতে দেখা গিয়েছিল। গেরুয়া স্কার্ফ পরিহিত এক পড়ুয়া সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে এটি তাঁর 'ব্যক্তিগত স্কার্ফ', যা গত বছরের অক্টোবরে হিন্দু জাগরণ বেদিকের পক্ষ থেকে দুর্গা দাউদ ইভেন্টের সময় দেওয়া হয়েছিল এবং ওই পড়ুয়া তা মঙ্গলবার ব্যবহার করবে বলে ঠিক করে। অন্য এক পড়ুয়ার কাছে গেরুয়া চাদর ও পাগড়ি না থাকায় তিনি কলেজ চত্ত্বরের বাইরে থাকা হিন্দু জাগরণ বেদিক সংগঠনের সদস্যদের থেকে দুর্গা দাউদ ইভেন্টে ব্যবহৃত চাদর ও পাগড়ি নেন। শুধু তাই নয় সংবাদমাধ্যমের তদন্তে উঠে এসেছে যে পড়ুয়াদের ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার পর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যরা এই স্কার্ফ ও পাগড়ি প্রতিবাদী পড়ুয়াদের থেকে সংগ্রহ করে আবার গুছিয়ে রেখেও দেয়। এই প্রতিবাদে অংশ নেওয়া এক পড়ুয়া জানিয়েছেন যে তাঁরা চাদর তাঁদের সঙ্গে করে সোমবারও এনেছিল। তিনি বলেন, 'আমরা অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলি এবং তাঁকে ক্লাসরুমে হিজাব পরা আটকাতে বলি। তিনি আমাদের কথা দেন যে সোমবার সকাল ১০টার মধ্যে তা বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু তারপরও পড়ুয়ারা হিজাব পরে আসছে দেখে আমরা প্রতিবাদ জানাই।' তদন্তে জানা গিয়েছে যে ওই ছাত্রটি সংঘ পরিবারের ছাত্র শাখা অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের সদস্য।

হিজাব পরা নিয়ে কখনও নিষেধাজ্ঞা ছিল না
এমজিএম কলেজের পড়ুয়া ও প্রাক্তনীরা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে গত সপ্তাহ থেকে পড়ুয়ারা কলেজে নির্ভয়ে হিজাব পরে আসছে। কলেজের প্রাক্তন ছাত্র অর্ণব আমিন জানিয়েছেন যে ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে তিনি যখন পড়ুয়া ছিলেন ওই কলেজের তখন থেকেই হিজাব পরে আসার অনুমতি ছিল। তাঁর ক্লাসেও অনেক হিজাব পরিহিত পড়ুয়ারা ছিল এবং তাঁরা নির্ভয়ে হিজাব পরে কলেজে আসত। কোনও নিষেধাজ্ঞান ছিল না।

কলেজে কলেজে প্রতিবাদের পেছনে কে রয়েছে
কর্নাটকের হিজাব কাণ্ড নিয়ে প্রতিবাদের অন্যদিকও উঠে এসেছে এই তদন্তে। উডুপিতে বিজেপি এবং হিন্দু জাগরণ বেদিকের মতো হিন্দুত্ববাদী দলগুলি বারবার বলেছে যে হিজাব পরিহিত মুসলিম মেয়েদের নিয়ে উডুপিতে প্রতিবাদ করার পেছনে ক্যাম্পাস ফ্রন্ট অফ ইন্ডিয়া (সিএফআই) রয়েছে, যা ভারতের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এসডিপিআই) দ্বারা সমর্থিত। যদিও সিএফআই-এর পক্ষ থেকে জানা গিয়েছে যে হজাব পরে ক্লাসে উপস্থিত হতে নিষেধ করার পরই তারা উডুপির মহিলা সরকারি প্রাক-উনিভার্সিটি কলেজে মেয়েদের ব্যক্তিগত অধিকার নিয়ে সমর্থন করা শুরু করেছিল। সিএফআইয়ের রাজ্য সভাপতি আটাভুল্লা পুঞ্জলকাট্টে এ প্রসঙ্গে বলেছেন, 'উডুপির সরকারি কলেজে হিজাব পরে আসা মেয়েদের ক্লাস করতে না দেওয়ার ঘটনার পরই আমাদের সংগঠন এই বিষয়টির সঙ্গে যুক্ত হয়। বলা হচ্ছে যে এটি সিএফআই দ্বারা একটি আন্দোলন কিন্তু এটি সত্য নয়। আমরা জানতে চাই, এমজিএম কলেজে ছাত্র সমাবেশে বিজেপি নেতা যশপাল সুবর্ণ কী করছিলেন? তাঁরা এটাকে নিয়ে রাজনীতি করছেন।'

আরও তিন কলেজে হিজাব নিয়ে শোরগোল
এমজিএম কলেজের পাশাপাশি কুন্দাপুরের আরও তিনটে কলেজে গেরুয়া চাদর পরিহিত পড়ুয়াদের প্রতিবাদের পর মুসলিম মেয়েরা হিজাব পরে আসলে বাধা পান। কুন্দাপুরের সরকারি পিইউ কলেজে, সোমবার মুসলিম মেয়েদের আলাদা করে আলাদা ক্লাসরুমে রাখা হয়েছিল। সেদিন তাঁদের কোনও ক্লাস নেওয়া হয়নি। ইতিমধ্যে হাইকোর্টে এই বিষয়টি নিয়ে পিটিশন জমা পড়েছে। তবে এটা বৃহত্তর বেঞ্চে বিবেচনার জন্য যাওয়া উচিত বলে মনে করছে হাইকোর্ট।












Click it and Unblock the Notifications