মসজিদ জরিপে বাধা, জ্ঞানবাপী নিয়ে দেখে নিন টাইমলাইন ও পিটিশনারদের দাবি
মসজিদ জরিপে বাধা, জ্ঞানবাপী নিয়ে দেখে নিন টাইমলাইন ও পিটিশনারদের দাবি
আবারও বিতর্কের কেন্দ্রে জ্ঞানবাপী মসজিদ। শুক্রবার আদালতের কমিশনার দল বারাণসীর জ্ঞানবাপী–শৃঙ্গার গৌরী মন্দির চত্ত্বর পরিদর্শন করতে আসলে তাঁদের দু’ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তাঁরা মসজিদের ভেতরে ভিডিওগ্রাফি–জরিপ করতে ব্যর্থ হন। কারণ কমিশনার দলকে দেখে প্রতিবাদে মুখর হন মুসলিমরা। মুসলিমরা এই জরিপের বিরোধিতা করেন। এমনকী মসজিদ পরিচালনা কমিটি বর্তমান অজয় কুমার মিশ্র ছাড়া বারাণসী আদালতের দ্বারস্থ হয়ে আলাদা কোর্ট কমিশনার নিয়োগের জন্য আবেদন করেন। স্থানীয় আদালত জানিয়েছে যে এই সংক্রান্ত শুনানি হবে ৯ মে।

১৯৯১ সাল থেকে শুরু হয় বিতর্ক
এই মসজিদ বিতর্ক জানতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে ১৯৯১ সালে, যখন স্থানীয় পুরোহিত সহ বেশ কিছু পিটিশনার বারাণসী আদালতের দ্বারস্থ হয়ে জ্ঞানবাপী মন্দির চত্ত্বরে পুজো করার জন্য অনুমতি চান। পিটিশনাররা দাবি করেন যে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের একটি অংশ ভেঙে নাকি ১৭ শতাব্দীতে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব এই মসজিদটি তৈরি করেছিলেন।

এক নজরে দেখে নিন জ্ঞানবাপী মসজিদের বিতর্ক
পিটিশনারদের মধ্যে একজন বিজয় শঙ্কর রস্তোগি, যিনি বারাণসীর একজন আইনজীবী, তিনি কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের অধিষ্ঠাতা দেবতার 'পরবর্তী বন্ধু' হিসাবে আবেদন করেছিলেন। আইনি ভাষায় যেটাকে, একজন 'পরবর্তী বন্ধু' হল এমন একজন যিনি এমন কাউকে প্রতিনিধিত্ব করেন যিনি আদালতে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করতে অক্ষম। ১৯৯১ সালে এই পিটিশন জমা পড়ে এবং পিটিশনে রস্তোগি দাবি করেন যে মহারাজা বিক্রমাদিত্য ২,০৫০ বছর আগে বর্তমান মসজিদ যেখানে অবস্থিত, সেখানে মন্দির তৈরি করেছিলেন। তিনি জ্ঞানবাপী মসজিদকে আর্জি জানিয়েছিলেন যে সেটা ভেঙে ফেলা হোক যাতে হিন্দুরা পুরো জমিটির মালিকানা পেতে পারেন, সেই সঙ্গে মসজিদের ভেতরে পুজো করার অধিকারও তাঁরা পাবেন।

মসজিদ–মন্দির বিতর্ক
এটা ছাড়াও পিটিশনার জানিয়েছেন যে কারণ জ্ঞানবাপী মসজিদটি একটি আংশিকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের উপর নির্মিত হয়েছিল, প্লেস অফ ওয়ারশিপ (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১ প্রযোজ্য হয়নি। এই মামলার শুনানি চলাকালীন ১৯৯৭ সালে, বারাণসীর বিচার আদালত রায় দিয়েছিল যে পিটিশনকারীদের নিষ্পত্তি প্লেস অফ ওয়ারশিপ (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১ দ্বারা সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর এক সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুসারে, বারাণসীর বিচার আদালতে পুর্নবিবেচনার জন্য পিটিশনগুলি জমা, একত্রিত ও শুনানি করা হয়েছিল।

প্লেস অফ ওয়ারশিপ (বিশেষ বিধান) আইন
অন্যদিকে, এর ঠিক একবছর পর ১৯৯৮ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টে এআইএম আবেদন করে প্লেস অফ ওয়ারশিপ (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১-এর ধারা 4 উদ্ধৃত করে দাবি করেছিল যে সিভিল আদালতে এই বিষয়টির মীমাংসা হয়নি। এরপর এলাহাবাদ হাইকোর্ট সিভিল আদালতের প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশ জারি করে।

বিশ্বনাথ করিডরের কাজ অসম্পূর্ণ
তবে এতদিন দিব্যি পাশাপাশিই ছিল এই মন্দির ও মসজিদ। মন্দিরের ট্রাস্ট ও মসজিদ পরিচালন কমিটির মধ্যেও এ সংক্রান্ত কোনও দ্বন্দ্ব ছিল না এতদিন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশ্বনাথ করিডর গড়ার উদ্যোগেও জমি দান করেছিল মসজিদ কমিটি। সেইমতো ২০১৯ সালের মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের করিডরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তবে উত্তেজনা দেখা যায় যখন ঠিকদার ২০১৯ সালের অক্টোবরে করিডর নির্মাণের অংশ হিসাবে জ্ঞানবাপী মন্দিরের ৪ নম্বর প্রবেশদ্বারের চবুতরা সরিয়ে দেয়, যার ফলে আশপাশের এলাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা শুরু হয়। তবে স্থানীয় মুসলিমদের প্রতিবাদের মুখে পড়ে ঠিকাদাররা রাতারাতি ভবনটি নির্মাণ করে দেয়।

প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্যায়নের দাবি
২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিক রায় দান করে দীর্ঘদিন ধরে চলা বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভূমি বিতর্কের ওপর, এই রায়ের একমাস পরেই আইনজীবী বিজয় শঙ্কর রস্তোগি শম্ভু জ্যোতিলিঙ্গ ভগবান বিশ্বেশরের পক্ষ থেকে নতুন করে পিটিশন দায়ের করেন এবং সেখানে জ্ঞানবাপী মসজিদের প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্যায়নের দাবি জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে ১৯৯৮ সালে, জ্ঞানবাপীর ধর্মীয় চরিত্র নির্ধারণের জন্য সমগ্র মসজিদ চত্ত্বর থেকে প্রমাণ সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এলাহাবাদ হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তকে স্থগিত করে দেয়।

সাম্প্রতিক মামলার রায়
সাম্প্রতিক মামলায়, দিল্লির রাখি সিং, লক্ষ্মী দেবী, সীতা সাহু, মঞ্জু ব্যাস এবং রেখা পাঠক ২০২১ সালের ১৮ এপ্রিল একটি মামলা করেছিলেন, যেখানে প্রতিদিন শৃঙ্গার গৌরী, ভগবান গণেশ, ভগবান হনুমান এবং নন্দীর পুজো এবং আচার অনুষ্ঠানের অনুমতি চাওয়া হয়, সেইসঙ্গে মূর্তিগুলিকে ক্ষতিগ্রস্থ করা থেকে বিরোধীদের প্রতিরোধ করা। অত্যন্ত সংবেদনশীল জ্ঞানবাপী মসজিদের বাইরের দেওয়ালে রয়েছে ভগবান শৃঙ্গার গৌরীর ছবি। প্রসঙ্গত, রাম জন্মভূমি আন্দোলনে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর থেকে মসজিদের নিরাপত্তা কঠোর করে দেওয়া হয় এবং ভক্তদের নিয়মিত প্রবেশও বন্ধ করা হয়। শুধুমাত্র চৈত্র নবরাত্রির চতুর্থ দিনে ভক্তদের প্রবেশের ওপর অনুমোদন ছিল। শৃঙ্গার গৌরী পুজো মামলায় বারাণসীর সিভিল বিচারক (সিনিয়র ডিভিশন), রবি কুমার দিবাকর ২০২২ সালের ২৬ এপ্রিল তাঁর রায়ে অ্যাডভোকেট কমিশনার কাশী বিশ্বনাথ-জ্ঞানবাপী মসজিদ চত্ত্বরের শৃঙ্গার গৌরী মন্দিরের ভিডিওগ্রাফি করার নির্দেশ দেন ইদের পর ও ১০ মে-এর আগে। আদালত বলেছিল যে অ্যাডভোকেট কমিশনার এবং পার্টিগুলি ছাড়াও, একজন সহযোগী প্রক্রিয়া চলাকালীন উপস্থিত থাকতে পারেন।












Click it and Unblock the Notifications