ঘনঘন রূপ বদল, দ্রুত ছড়ায়, জানুন দক্ষিণ আফ্রিকার করোনার নতুন ভ্যারিয়ান্ট নিয়ে কিছু তথ্য
জানুন দক্ষিণ আফ্রিকার করোনার নতুন ভ্যারিয়ান্ট নিয়ে কিছু তথ্য
বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের তৃতীয় ওয়েভের আতঙ্কের মাঝেই ফের উদ্বেগ দেখা দিল। দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বাধিক জনবহুল গুয়ানটেং জেলায় নতুন ধরনের করোনা ভাইরাসের ভ্যারিয়ান্ট সনাক্ত হয়েছে। যার জেরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারকে এই ভ্যারিয়ান্ট নিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সংক্রমণ বিশেষজ্ঞদের পরিভাষায় এই ভ্যারিয়ান্টটি বারবার বিবর্তন হওয়ার উচ্চ প্রবণতা রয়েছে এবং খুব দ্রুত তরুণ–তরুণীদের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ছে।

ভাইরাসটি ক্রমাগত বিকাশ হচ্ছে
যদিও উদ্বেগজনক বিবর্তন সহ নতুন করোনা ভাইরাসের ভ্যারিয়ান্টের অনেক সময়ই মৃত্যু ঘটে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় তাদের সম্ভাব্য প্রভাবগুলি কেমন হবে তা বুঝতে একটু সময় লাগবে কারণ এই ভাইরাসটি এখনও ক্রমাগত বিকশিত হচ্ছে এবং এই বিবর্তিত ভ্যারিয়ান্ট আরও অনেক বেশি সংক্রমণযুক্ত বা পূর্বে ধরে নেওয়ার চেয়ে বেশি মারাত্মক হওয়ার ঝুঁকি সবসময় থাকে।

৩২ বার স্পাইক প্রোটিন বদল
দক্ষিণ আফ্রিকায় সনাক্ত হওয়া এই ভ্যারিয়ান্টটি বি.১.১.৫২৯ নামে সনাক্ত হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার যাত্রীদের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে বৎসোয়ানা ও হংকংয়েও। পুনরায় এই সংক্রমণের ওয়েভ নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্রিটিশ সরকার ইতিমধ্যেই দক্ষিণ আফ্রিকা সহ এই মহাদেশের দক্ষিণ অংশের পাঁচটি দেশের বিমান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। নির্দেশ এও দেওয়া হয়েছে যে কেউ যদি সম্প্রতি ওই দেশগুলি থেকে ফিরে আসেন তবে যেন ভালো সতর্কতা হিসাবে তাঁরা কোভিড-১৯ টেস্ট করিয়ে নেন। দক্ষিণ আফ্রিকার জেনোমিক সার্ভেলেন্স নেটোয়ার্কের সদস্য তুলিও ডে অলিভেরা, যিনি এই দেশে ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট সংক্রমণ সনাক্ত করেছিলেন, তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, 'খুব বেশি সংখ্যার মিউটেশন' সহ এই নতুন করোনা বাইরাসের ভ্যারিয়ান্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নষ্ট করে দিতে পারে এবং সংক্রমণযুক্ত। তিনি বলেন, 'ভ্যারিয়ান্টটির মিউটেশনের অস্বাভাবিক গতিবিধি দেখা যাচ্ছে। ভ্যারিয়ান্টটি আমাদের অবাক করেছে। এর বিবর্তনের উচ্চ প্রবণতা দেখা গিয়েছে, আরও বহুবার এটি রূপ বদল করবে। অন্তত ৩২ বার স্পাইক প্রোটিন বদলে করোনা ভাইরাসের এই রূপ তৈরি হয়েছে।' তিনি এও জানিয়েছেন যে গত কয়েকদিন ও সপ্তাহের মধ্যেই স্বাস্থ্যপরিষেবার ওপর চাপ পড়া শুরু হয়ে যাবে।

ব্যর্থ হতে পারে করোনার টিকা
এই নতুন ভ্যারিয়ান্টের কথা অবশ্য প্রথম জানা গিয়েছিল ২৩ নভেম্বর, মঙ্গলবারই। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের ভাইরোলজিস্ট ড. টম পিকক, সোশ্যাল মিডিয়ায় করোনার এই নয়া রূপটির বিশদ বিবরণ জানিয়েছিলেন। তিনি জানান, এই কোভিড-১৯ ভাইরাসের এই রূপটিতে অবিশ্বাস্যরকম উচ্চ পরিমাণে স্পাইক অভিযোজন ঘটেছে। যা, নতুন করে উদ্বেগের কারণ তৈরি করেছে। কারণ, অধিকাংশ পরিচিত মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডিগুলিই এই স্পাইক প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় করার কাজই করে থাকে। সেটা করতে না পারলে, ব্যর্থ হবে সব করোনা টিকাই। টুইটারে ড. টম পিকক তাই বলেছিলেন, এই 'ভয়াবহ স্পাইক প্রোফাইল' এর জন্য, করোনার এই রূপভেদটিকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত। দুদিন পর, একই কথা জানালো দক্ষিণ আফ্রিকাও।

তীব্র বিবর্তনযুক্ত ভ্যারিয়ান্ট
বি.১.১.৫২৯ করোনা ভাইরাস ভ্যারিয়ান্ট নিয়ে রবীন্দ্র গুপ্তা, যিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক, তিনি বলেন, 'এটি সর্বোচ্চ সংখ্যার তীব্র মিউটেশন, যা সংক্রমণযোগ্যতা ও রোগ প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।' তবে তিনি এও জানিয়েছেন যে দক্ষিণ আফ্রিকার করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সাম্প্রতিক এই তীব্রতা নতুন ভ্যারিয়ান্টের কারণেই হচ্ছে কিনা তা বুঝতে হবে। যদিও এ নিয়ে উচ্চ মাত্রায় সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন গুপ্তা।

দক্ষিণ আফ্রিকায় লাফ দিয়ে বেড়েছে সংক্রমণ
গত সপ্তাহে নাটকীয়ভাবে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ বাড়তে দেখা গিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকাতে। দৈনিক ২০০টি করে কেস সনাক্ত করার পর বুধবার এই দেশে দৈনিক ১২০০ কেস রিপোর্ট হয়। বৃহস্পতিবারই করোনা কেস লাফ দিয়ে ২,৪৬৫-তে গিয়ে পৌঁছায়। তীব্র করোনা বৃদ্ধি দেখা যায় প্রিটোরিয়া ও সোয়ানে মেট্রোপলিটন এলাকার আশেপাসে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের একত্রীতকরণের জন্য এই সংক্রমণ আরও বেড়েছে। কেমব্রিজ মাইক্রোবায়েলজির অধ্যাপক সতর্ক করে জানিয়েছেন যে 'এটা খুব স্পষ্ট এবার এই ভ্যারিয়ান্টকে গুরুত্ব দেওয়ার সময় চলে এসেছে।'

ভারতেও জারি সতর্কতা
প্রসঙ্গত, দক্ষিণ আফ্রিকায় চিহ্নিত করোনাভাইরাসের নতুন রূপ নিয়ে রাজ্যগুলিকে সতর্ক করল কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক। এ নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রকের সচিব রাজেশ ভূষণ সব রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। সেখানে করোনার এই নতুন রূপে জিনের চরিত্রবদলকে 'খুব বিরল সমাবেশ' বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

চারটে রূপ উদ্বেগজনক
বর্তমানে, করোনাভাইরাসের মাত্র চারটি রূপভেদকে, উদ্বেগজনক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। আলফা (বি.১.১.৭ বা ইউকে ভ্যারিয়ান্ট ), বিটা (বি.১.৩৫১ বা দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্যারিয়ান্ট), গামা (পি.১ বা ব্রাজিল ভ্যারিয়ান্ট) এবং ডেল্টা (বি.১৬১৭.২)। এর মধ্যে করোনার মহামারির দ্বিতীয় ওয়েভে ভারতকে ছাড়খাড় করে দিয়েছিল ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট। এবার এই চারটির সঙ্গে নতুন পাওয়া দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়ান্ট যুক্ত হতে পারে। সবথেকে বড় কথা, টিকাকরণ শুরুর পর, যে মহামারি মুক্তির আশা দেখা গিয়েছিল, তাতে আবার নতুন সংযোজনে চিন্তার মেঘ জমল।












Click it and Unblock the Notifications