কংগ্রেসের দখলদারির রাজনীতি কোনও নতুন ঘটনা নয়, বারবার ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি
সম্প্রতি কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে কাশ্মীরের বুকে দাঁড়িয়ে একটি মন্তব্য করেছেন। যেখানে তিনি বলেন, জম্মু-কাশ্মীরের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের জয় হলে ধীরে ধীরে সারা দেশই তাঁরা দখল করার মতো অবস্থায় চলে যাবেন। অর্থাৎ সারা দেশে ফের একবার তাঁদের আধিপত্য কায়েম হবে। এই একটি বক্তব্য ফের একবার কংগ্রেসের মানসিকতাকে সমালোচনার মুখে ফেলেছে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে এই দখল করার মানসিকতাই বারবার কংগ্রেস দলের কার্যকলাপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ক্ষমতায় থাকতে বা ক্ষমতা দখল করতে কীভাবে কংগ্রেস দল ঐতিহাসিকভাবে বারবার এই দখলের রাজনীতির আশ্রয় নিয়েছে, যা অনেকের মতে, জাতীয় ঐক্য এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে, আসুন তা নিয়ে আলোচনা করা যাক।

দখলদারির মানসিকতা: এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
কংগ্রেস দল একেবারে শুরু থেকেই যে কোনও ভাবেই ক্ষমতা ধরে রাখা বা দখল করার মানসিকতা নিয়ে পথ চলেছে, এই অভিযোগ বরাবরের। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার একাধিক উদাহরণও রয়েছে।
১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি করাই হোক অথবা বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংস্থাগুলিকে পদদলিত করা হোক অথবা কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালীন ক্ষমতার কেন্দ্রীভূতকরণ হোক; সব জায়গাতেই দেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দলের একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব ফুটে উঠেছে।
শুধু যে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ থেকেছে তা নয়। কংগ্রেস দল ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন অঞ্চল এবং গোষ্ঠীর উপর তাদের বিভেদমূলক নীতির মাধ্যমে অশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে বলে অনেকে মনে করেন। উদাহরণ হিসেবে জম্মু ও কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা এবং ৩৫ এ ধারা প্রবর্তনের বিষয়টি উল্লেখ করা যেতে পারে। এই ধারাগুলির মাধ্যমে রাজ্যটিকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল যা অনেকে মনে করেন কংগ্রেস এটা করেছিল একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভোটকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়ে। কাশ্মীরে যখন এই ধারাগুলির সাহায্য নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, সেই সময়ও দল হিসেবে কংগ্রেস উদাসীন থেকে এই বিষয়গুলোকে আরও উৎসাহ দিয়েছে যাতে উপত্যকার অশান্তি বজায় থাকে এবং তাঁরা ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।
ওয়াকফ বোর্ডের স্টাইল আপন করা: ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখার খেলা
ওয়াকফ বোর্ডের কর্মকাণ্ড নিয়ে যেমন নানা আলোচনা চলেছে ঠিক সেভাবেই মল্লিকার্জুন খাড়গের মন্তব্যও কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে। ধার্মিক ভাবনার আড়ালে ওয়াকফ বোর্ডের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। সেভাবেই কংগ্রেসও বিভিন্নভাবে নিজের ভোট ব্যাঙ্ক বাঁচিয়ে রেখে ক্ষমতা দলের রাজনীতি করেছে, এই অভিযোগ বহুদিনের।
ওয়াকফ বোর্ডের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে তা সমালোচিত হয়েছে। ঠিক একইভাবে কংগ্রেস দলের সরকার পরিচালনাতেও বারবার সেই স্বচ্ছতার অভাবই ফুটে উঠেছে। এবং শুধু ভোটব্যাঙ্ক ধরে রেখে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষকে যেভাবে তোষামোদ করা হয়েছে তা নিয়ে বারবার সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এই রণকৌশলের ফলে শুধু যে জাতীয় ঐক্য ধাক্কা খেয়েছে তা নয়, বরং দেশের মধ্যে জাতিগতভাবে মতানৈক্যের পরিবেশও বারবার তৈরি হয়েছে।
৩৭০ এবং ৩৫ এ ধারাকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা: বিভেদমূলক রাজনীতির দিকে একধাপ এগিয়ে যাওয়া
কাশ্মীরে জয় পেলেই সারাদেশে বিজয় পতাকা ওড়াবে কংগ্রেস, মল্লিকার্জুন খাড়গের এই মন্তব্য আসলে এক নতুন করে আশঙ্কার জায়গা তৈরি করেছে ৩৭০ ধারা এবং ৩৫ এ ধারা নিয়ে। কারণ কংগ্রেস ক্ষমতায় ফিরলে তাঁরা ফের একবার এই ধারাগুলিকে লাগু করবে। ২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদীর সরকার এই ধারাগুলিকে বিলুপ্ত করে। বহুদিন ধরে এই ধারাগুলো নিয়ে ভারতীয় রাজনীতি উত্তপ্ত থেকেছে। নিন্দুকেরা বলেন, জম্মু ও কাশ্মীরের স্বতন্ত্রতা বজায় রাখতে চেয়ে কংগ্রেস এই ধারাগুলির পক্ষে সওয়াল করে এসেছে। কিন্তু ঘটনা হল, এর আসল প্রভাব হল- কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ আরও প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এই ধারাগুলির আড়ালে।
এই ধারাগুলিকে নতুন করে বলবৎ করার অর্থ ফের একবার পিছনের দিকে হাঁটা। কারণ এতে ফের একবার জাতীয় ঐক্য ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকছে এবং একইসঙ্গে যে বিভেদের রাজনীতির আগুন কাশ্মীর উপত্যকায় দশকের পর দশক ধরে ধিকি ধিকি করে জ্বলেছে, তা একবার ফের দাবানলের রূপ নিতে পারে। এমনকী জাতীয় নিরাপত্তার বিনিময়ে উপত্যকাকে বিশেষ অঞ্চলের মর্যাদা দিয়ে কংগ্রেস পুরনো রণকৌশল কাজে লাগিয়ে ওই এলাকায় ক্ষমতা ধরে রাখার খেলায় নামবে।
জাতীয় নিরাপত্তা: ফিরে দেখা কংগ্রেসের রেকর্ড
বহু বিশেষজ্ঞ এবং ইতিহাসবিদেরা মনে করেন যে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ করে জম্মু এবং কাশ্মীরের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের রেকর্ড, মনে রাখার মতো কিছু নয়। কেন্দ্রে কংগ্রেস বহুদিন শাসন করেছে এবং সেই সময়ে উপত্যকায় বিচ্ছিন্নতাবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও নাশকতার ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। আঞ্চলিক দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের সঙ্গে কংগ্রেসের জোট - যে দলের ইতিহাস রয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদী ভাবনাকে মদত দেওয়ার - এই পরিস্থিতিকে নিঃসন্দেহে আরও জটিল করেছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের শাসনকালে কংগ্রেস কড়া মনোভাব নিতে না পারার জন্যই কাশ্মীর উপত্যকা বারবার অশান্ত হয়েছে, কংগ্রেসের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও বহুদিনের।
মল্লিকার্জুন খাড়গের মন্তব্য তাই কাশ্মীরের নির্বাচন জিততে চাওয়া কংগ্রেসের পরিপ্রেক্ষিতে শুধু নয়, এটি একটি সচেতনবাণী আম জনতার জন্য কারণ রাজনৈতিক সুবিধার জন্য জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে কখনও আপোষ করা যায় না। সংবিধানের ৩৭০ ধারা ও ৩৫ এ ধারা নিয়ে বারবার বিতর্ক তৈরি করে কংগ্রেস আদতে আগুন নিয়ে খেলছে এবং উপত্যকায় বহু যুগ বাদে যে শান্তি ফিরেছে তা ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে নষ্ট করার চেষ্টা করছে।












Click it and Unblock the Notifications