ভূমি পুজোর মাধ্যমে অযোধ্যায় অবসান ঘটবে ১৬৬ বছরের দীর্ঘ বিতর্কের, জেনে নিন সেই অজানা ইতিহাস
ভূমি পুজোর মাধ্যমে অযোধ্যায় অবসান ঘটবে ১৬৬ বছরের দীর্ঘ বিতর্কের, জেনে নিন সেই ইতিহাস
৫ অগাস্ট অযোধ্যায় রাম মন্দিরের ভূমি পুজো উপলক্ষ্যে রীতিমত সাজোসাজো রব পড়ে গিয়েছে। ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের পরই শুরু হয়ে যাবে মন্দির নির্মাণের কাজ। এই উপলক্ষ্যে বুধবার অযোধ্যায় আসবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তবে তিনি প্রথমেই যাবেন হনুমান গরহি মন্দিরে পুজো দিতে। এই মন্দিরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভগবান হনুমান অযোধ্যা ও রাম ভক্তদের রক্ষা করবে বলে জানিয়েছিলেন।

মোদী হনুমান গরহি দর্শনে যাবেন
হনুমান গরহি মন্দিরের প্রধান পুরোহিত মহন্ত রাজু দাস বলেন, ‘এখানে প্রায় সাত মিনিট প্রার্থনা করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এরপর তিনি ভূমি পুজোর জায়গায় যাবেন। এখানে মোদীর জন্য বিশেষ পুজোর বন্দোবস্ত করা হয়েছে। ভূমি পুজোর রীতি আসলে ৪ অগাস্ট থেকে হনপমান গরহি থেকেই শুরু হয়ে যাবে। এটা অনেকেই বিশ্বাস করেন যে কোনও কাজ প্রাথমিকভাবে শুরু করার আগে হনুমানজির কাছে প্রার্থনা করা এবং তিনি যেন ওই কাজটি সুষ্ঠুভাবে হতে সাহায্য করেন তা প্রার্থনার মাধ্যমে বলা।' বুধবারের এই ভূমিপুজো প্রায় ১৬৬ বছরের বিতর্কের অবসান ঘটাবে।

ঘটনার সূত্রপাত ১৯৫৩ সাল থেকে
মন্দির নিয়ে এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় ১৮৫৩ সালে। মসজিদ নির্মাণের পর হিন্দুরা দাবি করে বসেন যে জায়গায় মসজিদ তৈরি হয়েছে, সেখানে আগে ভগবান রামের মন্দির ছিল, যেটি মসজিদ তৈরির জন্য ভেঙে ফেলা হয়। ১৮৮৫ সালে প্রথমবার মহন্ত রঘুবর দাস আদালতে নিয়ে যায় এই মামলাটি এবং তিনি ফৈজাবাদ আদালতের কাছে বাবরি মসজিদ সংলগ্ন জায়গায় রাম মন্দির তৈরির অনুমতির আবেদন করেন। ১৮৫৯ সালে ব্রিটিশ সরকার বিতর্কিত জমির ভেতর ও বাইরে হিন্দু-মুসলিমদের আলাদা আলাদা প্রার্থনার জন্য তারের বেড়া দিয়ে দেয়।

বিতর্কিত জমিতে রামের মূর্তি
১৯৪৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর, ভারত স্বাধীনতা পাওয়ার দু'বছর পর, বিতর্কিত জমির মধ্যভাগে ভগবান রামের মূর্তি বসানো হয় এবং হিন্দুরা সেখানে পুজো করতে শুরু করেন। বাধ্য হয়ে মুসলিমদের নমাজ পড়া বন্ধ করতে হয়। ১৯৫০ সালের ১৬ জানুয়ারি গোপাল সিং বিশারদ আবার ফৈজাবাদ আদালতে আবেদন জানিয়ে রাম লালার পুজোর জন্য বিশেষ অনুমতি চান। ওই বছরের কিছু মাস পর ৫ ডিসেম্বর মহন্ত পরমহমংস রাম চন্দ্র দাসও বিতর্কিত জায়গায় রামের মূর্তি রাখার ও হিন্দুদের প্রার্থনা করার জন্য মামলা করেন। এর প্রায় ন'বছর পর ১৯৫৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর নির্মোহি আখাড়া বিতর্কিত স্থান স্থানান্তর করার জন্য মামলা দায়ের করেছিল এবং ১৮ ডিসেম্বর, ১৯৬১ সালে উত্তরপ্রদেশের সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডও বাবরি মসজিদের মালিকানা এবং মসজিদ চত্বর থেকে। প্রতিমা অপসারণের জন্য একটি মামলা দায়ের করেছিল।

বিভিন্ন হিন্দু সংগঠন মামলা করে
১৯৮৪ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বিতর্কিত জমির তালা খোলার জন্য প্রচার শুরু করে। এই বিষয়ে কমিটিও গঠন করা হয়। ১৯৮৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ফৈজাবাদ জেলা বিচারক কে এম পাণ্ডে হিন্দুদের ওই স্থানে পুজো করার অনুমতি দেন। তালা পুনরায় খোলা হয় কিন্তু কিছু ক্ষুব্ধ মুসলিম সংগঠন তারা বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটি গঠন করে প্রচিবাদ করতে শুরু করে। ১৯৮৯ সালে বিজেপি ভিএইচপিকে সমর্থন করার ঘোষণা করেন, যার ফলে মন্দির আন্দোলন নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পায়। এইবার থেকেই রাম মন্দির নিয়ে বিশাল আন্দোলন শুরু হয়, যা এক বছরের মধ্যে জাতীয় রাজনীতির দিক ঘুরিয়ে দেয়। ১৯৮৯ সালের ১ জুলাই ফের পঞ্চম মামলা দায়ের হয় ভগবান রামলালা বিরাজমান নাম দিয়ে। ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর তৎকালীন দেশের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী বিতর্কিত জমির পাশে শিলান্যাসের অনুমতি দেন।

রথযাত্রা দিয়েই সূচনা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের
১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরে মন্দির আন্দোলন অন্য দিকে মোড় নেয়। বিজেপি সভাপতি লাল কৃষ্ণ আদবানি গুজরাতের সোমনাথ থেকে উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যা পর্যন্ত রথযাত্রার সূচনা করেন। তবে লালু যাদব সরকার তাঁকে সমস্তিপুরে গ্রেফতার করে। ১৯৯১ সালের অক্টোবরে উত্তরপ্রদেশের কল্যাণ সিং সরকার বিতর্কিত জমির কাছে ২.৭৭ একর জমি অধিগ্রহণ করে এবং রাম জন্মভূমি ন্যাসকে ইজারা দেয়। যদিও এলাহাবাদ হাই কোর্ট নির্দেশ দেয় যে কোনও স্থানী কাঠামো তৈরি করা যাবে না সেখানে।

বাবরি মসজিদ ধ্বংস
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর মন্দির আন্দোলন অন্য এক মাত্রায় চলে যায়। এদিন শত শত কর সেবকরা অযোধ্যায় জমায়েত হয়ে বিতর্কিত কাঠামো ভেঙে ফেলে, যার জেরে গোটা দেশে সাম্প্রদায়িক হিংসার সৃষ্টি হয়। ৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভেঙে দেওয়ার পরে উত্তরপ্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান এবং হিমাচল প্রদেশে বিজেপি সরকারগুলিকে বরখাস্ত করে দেওয়া হয়। মসজিদটি ভেঙে দেওয়ার জন্য দায়ি ব্যক্তিদের তদন্তের জন্য কয়েক দিন পরে লিবারহান কমিশন গঠন করা হয়েছিল।

বিতর্কিত জমির নীচে মন্দিরের কাঠামো
২০০২ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী তাঁর অফিসে একটি অযোধ্যা বিভাগ চালু করেছিলেন। এই বিভাগের কাজ ছিল হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি করা। একই বছরের এপ্রিলে তিন বিচারপতির বেঞ্চ অযোধ্যায় বিতর্কিত জমির মালিকানা নিয়ে শুনানি শুরু করে। ২০০৩ সালে ভারতের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ অযোধ্যার বিতর্কিত জমিতে খনন কার্য শুরু করেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশে। তাদের দাবি ছিল যে বিতর্কিত জমির নীচে মন্দিরের কাঠামোর অংশ রয়েছে, যদিও মুসলিমদের এ নিয়ে ভিন্ন মত ছিল।

২০১৯ সালে শেষ হয় ১৬৬ বছরের বিতর্ক
২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে এলাহাবাদ হাইকোর্টের লখনউ বেঞ্চ ঐতিহাসিক রায় দেয় এবং বিতর্কিত জমিকে তিনভাগে ভাগ করে। এক ভাগ দেওয়া হয় রাম মন্দিরের জন্য, অন্য ভাগ সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডকে ও তৃতীয় ভাগ নির্মোহি আখাড়াকে। হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ শুনানি ও অপেক্ষার পর ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে। যেখানে বিতর্কিত জমি হিন্দুদের দেওয়া হয় মন্দির নির্মাণের জন্য এবং আলাদা করে ৫ একর জমি দেওয়া হয় মুসলিমদের মসজিদ তৈরির জন্য।

মন্দির নির্মাণের জন্য ট্রাস্ট গঠন
শীর্ষ আদালতের পক্ষ থেকে সরকারকে মন্দির নির্মাণের জন্য ট্রাস্ট গঠন করতে বলা হয়। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতেই মন্দির নির্মাণ লক্ষ্যে শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট গঠন হয়। এপ্রিলে রাম নবমীর দিন মন্দির নির্মাণের কাজ শুরুর কথা থাকলেও তা করোনা ভাইরাস ও মহামারির কারণে সম্ভব হয় না। ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকার মুসলিমদের অযোধ্যার ধান্নিপুর এলাকায় ৫ একর জমি দিয়েছে।












Click it and Unblock the Notifications