নির্ভয়ার চার সাজাপ্রাপ্তদের আগে বালির বস্তা দিয়ে ফাঁসির মহড়া তিহার জেলে
নির্ভয়ার চার সাজাপ্রাপ্তদের আগে বালির বস্তা দিয়ে ফাঁসির মহড়া তিহার জেলে
মঙ্গলবারই দিল্লি আদালতের পক্ষ থেকে নির্ভয়া গণধর্ষণ ও খুনেরর চার সাজাপ্রাপ্তদের মৃত্যু পরোয়না জারি করা হয়েছে। আদালতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে ২২ জানুয়ারি সকাল সাতটায় তাদের ফাঁসি দেওয়া হবে। তিহার জেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে চার সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের জেল নম্বর ৩–এ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
মৃত্যু পরোয়ানা যেটি পরিচিত কালো পরোয়ানা নামেও, তা তিহার জেল প্রধানের নামে দিয়েছেন অতিরিক্ত দায়রা বিচারক সতীশ কুমার অরোরা। মৃত্যু পরোয়ানাতে নাম রয়েছে মুকেশ (৩২), পবন (২৫), বিনয় শর্মা (২৬) ও অক্ষয় কুমার সিংয়ের (৩১)। জেল সূত্রে জানা গিয়েছে, 'আমরা আদালতের নির্দেশ পেয়েছি এবং সেই অনুযায়ী চারজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। চার সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে আলাদা সেলে রেখে দেওয়া হয়েছে এবং অন্য বন্দীদের সঙ্গে তাদের কথাবার্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’ অন্য এক সূত্রে জানা গিয়েছে, এশিয়ার সবচেয়ে বড় কারাগার চত্ত্বরে এই ফাঁসি কার্যকর করার জন্য উত্তরপ্রদেশের জেল কর্তৃপক্ষ মিরাট থেকে ফাঁসুড়ে নিয়ে আসার বন্দোবস্ত করছে। চারজনকে একসঙ্গে ফাঁসি দেওয়ার জন্য নতুন ফাঁসিকাঠ এই ফাঁসির জন্যই তৈরি করা হয়েছে। তিহার জেলের এক আধিকারিক বলেন, 'আমাদের চিকিৎসকের দল ওই চার আসামিদের নিয়মিত স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন। আমরাও তাদের নিরাপত্তার দিকে নজর রাখছি। এই সময় ওই চার আসামির পরিবারের সদস্যরা আসতে পারেন এবং তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন।’

আগামী কয়েকদিন জেল কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি
উত্তরপ্রদেশ কারাগার কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত নেওয়া মৃত্যুদণ্ডের তারিখ জানানো হয়েছে। এটি তিহারের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় চিঠি। প্রথম চিঠিটি ছিল, ফাঁসুড়ের বন্দোবস্ত করা নিয়ে। তবে দ্বিতীয় চিঠিটি মৃত্যুদণ্ডের তারিখ ও সময় জানিয়ে লেখা হয়েছে। তিহার জেলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে মিরাট থেকে যে ফাঁসুড়ে আসবে তিনি চার আসামিকে একসঙ্গে ফাঁসি দেবেন। নির্ভয়ার দোষীদের মধ্যে তিনজন রয়েছে ২ নম্বর জেলে এবং বাকি একজন রয়েছে ৪ নম্বর জেলে। এদের মধ্যে একজন আগে মন্ডোলী জেলে ছিল, কিন্তু ডিসেম্বরেই তাকে তিহার জেলে ফিরিয়ে আনা হয়। তাদের আলাদা কক্ষে রাখলেও জেল কর্তৃপক্ষ তাদের যাতে দেখতে ও অন্য বন্দীরা তাদের কথা শুনতে পায়, সেরকম বন্দোবস্ত করা হয়েছে। কিন্তু অন্য বন্দীদের সঙ্গে তাদের কথা বলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। চার সাজাপ্রাপ্তদের বিবরণ নথিভুক্ত করার কাজ শুরু করে দিয়েছে তিহার। ডিএসপির উপস্থিতিতে ওই চার আসামিদের রোজ পরীক্ষা করা হয়। কারাগার অফিসারের পক্ষ থেকে তাদের আচরণ ও মানসিক স্বাস্থ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চার আসামিকে ২৪ ঘণ্টার কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে। প্রতি ৩ ঘম্টা অন্তর অন্তর বদল করা হয় পাহারাদারকে। যথাযথ নিরাপত্তা ছাড়া আসামিদের বাইরে বের করা হয় না।

আসামিদের সুযোগ–সুবিধা
ধর্মীয় বই, ধর্মীয় ছবি সহ অন্য ধর্ম সংক্রান্ত জিনিস যথাযথ পরীক্ষা করার পরই চার আসামির কাছে যায়, এছাড়াও সংবাদপত্র ও বইও তাদের পড়তে দেওয়া হয়। জেল কর্তৃপক্ষ চার আসামিকে জিজ্ঞাসা করেছে যে তারা যদি চায় তবে পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সঙ্গে চাইলে দেখা করতে পারে। যদি সেটার ইচ্ছা হয়, তবে জেল কর্তৃপক্ষ সেই অনুযায়ী বন্দোবস্ত করবে। সপ্তাহে দু'দিন ওই চার আসামি পরিবার, বন্ধু বা আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি রয়েছে। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করলে যদি আসামিদের সান্তনা বা উপকার হয়, তবে এই বিষয়টি বাড়াতে পারে জেল কর্তৃপক্ষ। আসামি ও পরিবারের দেখা করার সময় তিহার জেলের পক্ষ থেকে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হবে।

মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা
ডিসেম্বরেই তিহার জেল কর্তৃপক্ষ ফাঁসিকাঠে পরিদর্শন করেছে। এই পরিদর্শনের দলে ছিলেন পিডব্লিউডির এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার ও তিহার জেলের আধিকারিকরা। বুধবার আরও একটি পরিদর্শন করা হয়। চূড়ান্ত পরিদর্শন করা হবে মৃত্যুদণ্ডের আগের দিন সন্ধ্যায়। ফাঁসিকাঠের পাশাপাশি দড়িও পরীক্ষা করা হয়ে গিয়েছে। এর জন্য, আসামির ওজনের ১.৫ কেজি ওজনের একটি ডামি বালির বস্তাকে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং ১.৮৩০ মিটার থেকে ২.৪৪০ মিটারের মধ্যে নামানো হয়। সাজাপ্রাপ্তদের প্রত্যেকের জন্য দুটি অতিরিক্ত দড়ি (যার অর্থ আটটি অতিরিক্ত দড়ি) রাখা হবে, যাতে কোনও ধরনের ঘটনা ঘটলে ওই দড়িগুলি ব্যবহার করা যায়। ফাঁসির দড়িতে মোম বা মাখন লাগানো হবে। দড়ি এবং অন্য সামগ্রী পরীক্ষা করার পর তা নিরাপদে তালাবন্ধ কর রাখা হয়েছে স্টীল বক্সে এবং তা ডিএসপির নজরদারিতে রয়েছে।

মৃত্যুদণ্ডের সময় কে কে থাকবে
পুলিশের সুপারিটেনডেন্ট, ডিএসপি, দায়িত্বপ্রাপ্ত মেডিক্যাল অফিসার এবং জেলের মেডিক্যাল অফিসার ও জেলা শাসক। যদি কোনও কারণে জেলা শাসক না আসতে পারেন তবে অতিরিক্ত জেলা শাসক উপস্থিত থাকবেন। সাজাপ্রাপ্তরা যে ধর্মে বিশ্বাসী, সেই ধর্মের পুরোহিত উপস্থিত থাকবে। আসামিদের পরিবারের লোককে মৃত্যুদণ্ডের সময় উপস্থিত থাকার অনুমতি নেই। দশজন কনস্টেবল ও দু'জন হেড কনস্টেবল সেই সময় উপস্থিত থাকবেন। সেই সময় অন্য বন্দীদের জেলের ভিতর আটকে রাখা হবে।

মৃত্যদণ্ড দেওয়ার পদ্ধতি
২২ জানুয়ারি প্রথমে সুপারিটেনডেন্ট তাঁর অফিসে গিয়ে নিশ্চিত করবেন যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের আর কোনও বিষয় মুলতুবি নেই। সকাল সাতটার আগেই পুলিশ আধিকারিক সহ অন্যান্যরা সাজাপ্রাপ্তদের সেলে যাবেন। কোনও নথিতে যদি দোষীদের সই-সাবুদের দরকার হয় তবে তা করিয়ে নেওয়া হবে। এটা অধিকাংশক্ষেত্রেই দোষীদের স্ব-ঘোষণা বা তাদের ইচ্ছাপত্র হয়। ফাঁসিকাঠের কাছে শুধুমাত্র সুপারিটেনডেন্ট, জেলা শাসক বা অতিরিক্ত জেলা শাসক এবং মেডিক্যাল অফিসার উপস্থিত থাকবেন। চারজনকে জেল থেকে যখন বের করা হবে তখন তাদের সুরক্ষায় থাকবেন ডিএসপি, প্রধান কনস্টেবল এবং ছ'জন কনস্টেবল। দু'জন পেছনে, দু'জন সামনে এবং অন্য দু'জন বন্দুক ধরে থাকবেন। ফাঁসিকাঠের কাছে চারজনকে নিয়ে আসার পর সুপারিটেনডেন্ট জেলা শাসকের সামনে তাদের সনাক্ত করবেন। ৪ জনের চোখেই থাকবে সুতির ক্যাপ এবং মুখ ঢাকা থাকবে যাতে তারা ফাঁসিকাঠ দেখতে না পায়। তাদের হাতও বাঁধা থাকবে। ফাঁসুড়ে সাজাপ্রাপ্তদের পা শক্ত করে বেধে দেবে এবং গলায় দড়ি পরিয়ে দেবে। ফাঁির ঘরটি ফাঁসি দেওয়ার আগে পরিদর্শন করবেন পুলিশ আধিকারিক। এরপর তিনি আসামিদের গলার দড়িও যথাযথভাবে পরানো হয়েছে কিনা তাও দেখবেন।
প্রধান কনস্টেবল আসামিদের বাহু ততক্ষণ ধরে রাখবেন যতক্ষণ না ফাঁসির সংকেত দেওয়া হচ্ছে। সুপারিটেনডেন্ট এই সংকেত দেবেন এবং এরপরই ফাঁসুড়ে লিভার সরিয়ে গোপন দরজা খুলে দেবে। ফাঁসির পর ৩০ মিনিট দেহ ঝোলানো থাকবে। জেলের মেডিক্যাল অফিসার তীআদের মৃত্যু নিশ্চিত করার পরই তাদের নামানো হবে।

মৃতদেহের এরপর কি করা হবে
তিহার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দোষী সাব্যস্তকারীদের দেহগুলি তাদের নিজ নিজ ধর্ম অনুসারে শেষকৃত্য করা হয়। বন্দীর কোনও আত্মীয় বা পরিবারের সদস্য যদি শেষকৃত্য করতে চান, তবে সেই ব্যক্তিকে লিখিতভাবে তিহার জেলকে দিতে হবে যে কোনও প্রকাশ্য প্রদর্শন করা হবে না, অন্যথায় তাদের গ্রেপ্তার করা হবে এবং তাদের আবেদনও বাতিল হতে পারে।












Click it and Unblock the Notifications