এনআরসি-র নামে উগ্র প্রাদেশিকতার বিষ, লড়াই থেকে পিছু হঠতে রাজি নয় বাঙালিরা
'এক শূন্যতা যেন গ্রাস করেছে। চারিদিকে থমথমে পরিস্থিতি। জাতীয় নাগরিক পঞ্জীকরণ বা এনআরসি নিয়ে যা চলছে তাতে অসম জুড়ে কেউ খুশিতে নেই। নিজভূমে পরবাসী শব্দটা শুনেছিলাম।
অনুলিখন- 'এক শূন্যতা যেন গ্রাস করেছে। চারিদিকে থমথমে পরিস্থিতি। জাতীয় নাগরিক পঞ্জীকরণ বা এনআরসি নিয়ে যা চলছে তাতে অসম জুড়ে কেউ খুশিতে নেই। নিজভূমে পরবাসী শব্দটা শুনেছিলাম। কিন্তু, কোনও দিন অন্তর দিয়ে অনুভব করতে পারিনি। এনআরসি-র দৌলতে এখন আমার মতো বহু বহু বাঙালি ও অবাঙালি এটা অনুভব করছে।

সোমবার সকাল থেকেই সংবাদপত্র থেকে টেলিভিশনে নজর ছিল। নাগরিক মঞ্চ মানে অসম নাগরিক রক্ষা সমন্বয় সমিতি-র সমস্ত ইউনিটকে আগাম নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যাতে এনআরসি-র চূড়ান্ত খসড়া তালিকা পুঙ্খনাপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা হয়।
গত কয়েক বছরের চেষ্টা অসম নাগরিক রক্ষা সমন্বয় সমিতির ছাতার তলায় ৪৩টি সংগঠনকে আনা সম্ভব হয়েছে। এদের কোনওটা মানবাধিকার সংগঠন, কোনটা আবার সাহিত্য ও সংস্কৃতির সংগঠন। কিন্তু এই মুহূর্তের সকলের একটাই লক্ষ এনআরসি-র তালিকায় হওয়া অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করা।
প্রায় ৪১ লক্ষ লোককে রাতারাতি রাষ্ট্রহীন বলে ঘোষণা করা হয়ে গেল। এর বাইরে আরও প্রায় তিন লক্ষ মানুষের পরিচয়কে 'ডিটেন' করে রাখা হয়েছে। মানে সবমিলিয়ে সংখ্যাটা প্রায় চুয়াল্লিশ লক্ষ। এনআরসি-নিয়ম অনুযায়ী এরা না পাবে কোনও সাংবিধানিক স্বীকৃতি বা কোনও অধিকার। এমনকী কর্মসংস্থানের সুযোগও হারাবেন। এদের পাঠিয়ে দেওয়া হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে। এনআরসি-তে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে বাঙালিরা। অসমে বসবাসকারী অন্য কিছু জাতি গোষ্ঠীর বহু মানুষেরও নাম নেই এনআরসি-তে। এঁদের মধ্যে রয়েছে নেপালি, কার্বিরাও। মাঝে মাঝে বলা হচ্ছে বাঙালি হিন্দু যাঁদের নাম ওঠেনি তাঁরা নাম না ওঠা অন্য হিন্দু জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে এক হয়ে আবেদন করুক। এদের নাম এনআরসি-তে তুলে দেওয়া হবে। তাহলে বাঙালি মুসলিমরা কী দোষ করল? বৈধ কাগজ-পত্র থাকলে তাঁদের নাম কেন থাকবে না? আসলে এটা আরএসএস-এর দেখানো পথ। মহারাষ্ট্রেও এভাবে জাতি বিভাজনের রাজনীতি খেলার চেষ্টা করছে বিজেপি ও আরএসএস। কিন্তু, সেখানে শিবসেনার সঙ্গে এই নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। অসমে এই জাতি বিভাজনের খেলাটা চালু করার চেষ্টা করছে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ।
আসলে উগ্র প্রাদেশিকতার এক বীজ রোপনের চেষ্টা চলছে। স্বাধীনতার সময় থেকে অসম ফর অসামিজ বলে যে ডাক উঠেছিল তার হিংস্রতা ভয়াবহ আকার নেয় ষাটের দশকে। শুরু হয়েছিল বাঙালি খেদাও অভিযান। বরাক উপত্যকায় এই দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে জোরসে রুখে দাঁড়িয়েছিল বাঙালিরা। কারণ ভৌগলিক পরিচয় অনুযায়ী বরাক মূলত বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা। এবারও এনআরসি প্রয়োগের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে বরাক। এখানকার কাছাড়, হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ-এ গণ আন্দোলনে ব্যাপক সাড়া পড়েছে।
স্বাধীনতার পরে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে জাতীয় নাগরিক পঞ্জীকরণ-এর কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু তখনও যে পদ্ধতিতে এই এনআরসি-কে প্রয়োগ করা হয়েছিল তা নিয়ে বিতর্ক দানা বাধে। আর সেই কারণে মাঝপথেই এনআরসি-ক কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এই এনআরসি-র কাজ শুরু করতে হলে তাহলে তো সব সীমান্ত রাজ্যেই শুরু হওয়া উচিত। শুধু অসমে কেন জাতীয় ,নাগরিক পঞ্জীকরণের আপডেট করা হচ্ছে? এর পিছনে রয়েছে এক সুগভীর চক্রান্ত। অসমের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাঙালি সমাজের যে অবদান তাকে অস্বীকার করার চলটা শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার সময় থেকে। অসমে বসবাসকারী বাঙালিদের অর্ধেককেও যদি ভিটে-মাটি থেকে উৎখাত করা যায় তাহলে সেই ফেলে যাওয়া স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা কারা পাবে? বুঝতে নিশ্চয় কারোর কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আর্থিকভাবে দুর্বল অসমিয়াভাষীদের একটি অংশের ভোটব্য়াঙ্কের জন্য বারবার বাঙালিদের ভিলেন বানিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলি। যার জেরে একটা সময় শুরু হয়েছিল বাঙালি খেদাও অভিযান। সেই ষড়যন্ত্রকে রূপায়িত করতেই এখন এনআরসি-র মাধ্যমে বাঙালি খেদাও অভিযান শুরু হয়েছে।
আমরা অবশ্য মনে বল হারাচ্ছি না। বারবার একটা কথাই মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, আমাদের মতো লোকেরা না হয় কাগজপত্র সামলে-টামলে রেখেছি। কিন্তু, যে গরিব না খেতে পাওয়া মানুষগুলো কাগজের মর্মই কোনও দিন বুঝতে পারেনি তাদের কী হবে? এটা ভেবেই শঙ্কিত আমরা। তবু আমরা লড়াই করছি। আইনি পথে এনআরসি-র মোকাবিলা যেমন হচ্ছে তেমনি গণ-আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। অসমের বাঙালি এখন আরও এক লড়াই-এর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।'
(এই প্রতিবেদনটি অনুলিখন করা হয়েছে, প্রতিবেদনের বক্তা তাঁর পরিচয়কে গোপন রাখতে চান, সেই কারণে তাঁর পরিচয় আমরা প্রকাশ করলাম না।)












Click it and Unblock the Notifications