১০টি শহরে ১.৫ গুণ বেশি মৃত্যু, নেপথ্যে দূষণের সাথে মিলিত উচ্চ তাপমাত্রা! চাঞ্চল্যকর তথ্য
অন্যান্য বছরে তুলনায় চলতি বছরে গরমের দাপট অনেকটাই বেশি থাকবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর। আবহবিদদের মতে, চলতি বছরে এল নিনো যেভাবে নিজেকে তৈরি করবে সেখান থেকে দেখতে হলে অন্যবারের তুলনায় গরম বেশি থাকবে। এদিকে উচ্চ তাপমাত্রা এবং দূষণের কারণে প্রত্যেক বছরই বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়।
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দূষণ এবং উচ্চ তাপমাত্রার কারণে ভারতের দশটি শহরে স্বাভাবিক এর চেয়ে ১.৫ গুণ বেশি মৃত্যু হয়েছে। বিশেষ করে স্বল্প মেয়াদি পিএম ২. ৫ এর সংস্পর্শে থাকার কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়েছে। এই দূষণ স্থানীয়ভাবে সৃষ্ট দূষক দ্বারা আরও বেশি প্রভাবিত। গবেষণায় এমন ফলাফল উদ্বেগ জনক। কারণ ভারত বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলির মধ্যে একটি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রেকর্ড তাপমাত্রা এবং তীব্র তাপপ্রবাহের (Severe heat wave) সম্মুখীন হয়।

নয়া দিল্লির সেন্টার ফর ক্রনিক ডিজিজ কন্ট্রোল এবং বারানসীর বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের একটি বিশ্বব্যাপী দল দ্বারা পরিচালিত সর্বশেষ গবেষণা মতে, ২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দিল্লি, আহমেদাবাদ, ব্যাঙ্গালুরু, চেন্নাই, হায়দ্রাবাদ, কলকাতা, মুম্বাই, পুনে, শিমলা এবং বারাণসী সহ দশটি শহরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, এই শহরগুলিতে দৈনিক গড় পিএম ২.৫ এর গড় ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ২০ থেকে ১০০ মাইক্রোগ্রামের মধ্যে থাকা ৩.৬ মিলিয়ন মৃত্যুর মধ্যে দেখা গিয়েছে যে বায়ু দূষণ মৃত্যুর হারের ওপর অত্যন্ত বড় প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে উচ্চ তাপমাত্রা (High temperature) দিনগুলিতে।
মাঝারি উচ্চ তাপমাত্রায় যা ভৌগোলিক অবস্থানের উপর নির্ভর করে শহর গুলির মধ্যে পরিবর্তিত হতে পারে, পিএম ২.৫ এর গড় ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম বৃদ্ধি তাপ সম্পর্কিত মৃত্যু হারে ০.৪ শতাংশ বৃদ্ধির সাথে যুক্ত ছিল। কিন্তু দৈনিক মৃত্যুর হারের সাথে পিএম ২.৫ এর সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে অত্যন্ত বেশি তাপমাত্রায় মৃত্যুর হার ৪.৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, অত্যাধিক পরিবেশগত তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মৃত্যুর ঝুঁকি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে পিএম ২.৫ এর গড় ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ২০ মাইক্রোগ্রামের ক্ষেত্রে ৮.৩ শতাংশ থেকে প্রতি ঘন মিটারে ১০০ মাইক্রোগ্রাম পিএম ২.৫ এর সংস্পর্শে আসার মাত্রায় ৬৩.৯ শতাংশে পৌঁছেছে। সুতরাং যে দিনগুলিতে দৈনিক পিএম ২.৫ ঘনত্ব এবং তাপমাত্রা চরম থাকে, সেই দিনগুলিতে মৃত্যুর ঝুঁকি সবথেকে বেশি থাকে এবং এই প্রবণতা বিশেষভাবে আহমেদাবাদ, চেন্নাই, দিল্লি এবং কলকাতায় লক্ষ্য করা গিয়েছে।
গবেষকরা আরও বলেছেন, ভালো দৃশ্যমান্যতার কারণে গ্রীষ্মকালে বায়ু দূষণের প্রভাব সাধারণত কম দেখা গেলেও দূষণ কিন্তু অব্যাহত থাকে। দিল্লীর মতো শহরে গ্রীষ্মকালেও পিএম ২.৫ এর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দ্বারা নির্ধারিত নিরাপদ সীমার অনেক বেশি। বার্ষিক দৈনিক পিএম ২.৫ এর মাত্রা সাধারণত উচ্চ থাকে এবং এখন তাপের চাপও বাড়ছে।
একটি প্রতিদেবন অনুসারে, দিল্লি বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে দূষিত রাজধানী শহর হিসেবে রয়ে গিয়েছে। যেখানে ভারত ২০২৪ সালে বিশ্বের পঞ্চম সর্বাধিক দূষিত দেশ হিসেবে স্থান পেয়েছে, যা ২০২৩ সালে তৃতীয় ছিল। তালিকার বেশিরভাগ ভারতীয় শহর রাজস্থান থেকে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ পর্যন্ত উত্তর-পশ্চিম ভারতের কেন্দ্রীভূত। এর মধ্যে রয়েছে রাজস্থানের ভিওয়াড়ি, গঙ্গানগর এবং হনুমানগড়, পাঞ্জাবের মুল্লানপুর, হরিয়ানার ফরিদাবাদ এবং গুরুগ্রাম, উত্তর প্রদেশের লোনি, মুজাফফরনগর, নয়ডা এবং গ্রেটার নয়ডা।
মূলত, এই গবেষণায় বায়ু দূষণের মাত্রা বৃদ্ধির সাথে তাপমাত্রা দৈনিক মৃত্যুর একটি রৈখিক সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে। শুধু বায়ু দূষণের মাত্রায় নয় বরং পিএম ২.৫ এর গঠন এবং বিষাক্ততাও বছরের উষ্ণতম মাসগুলিতে পরিবর্তিত হয়। যা কখনও কখনও রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে দূষণকারী এবং গৌণকণা তৈরির পক্ষে সহায়ক হয়ে ওঠে। দিল্লির মতো শহরে কার্সিনোজেনিক ব্ল্যাক কার্বন বেশি থাকতে পারে, তবে বারানসীর মত অন্যান্য শহরে ধুলোর পরিমাণ বেশি থাকতে পারে।
উল্লেখ্য এর আগের গবেষণাগুলিতে দেখা গিয়েছিল, তীব্র তাপ ও তাপপ্রবাহ মানব দেহের বায়ু দূষণকারী পদার্থগুলিকে বিষমুক্ত করার ক্ষমতা হ্রাস করতে পারে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যার কারণে দুর্বলতাও সৃষ্টি করতে পারে। ফলস্বরূপ বায়ু দূষণকারী পদার্থের গ্রহণ এবং বিতরণ বৃদ্ধি পায়। এরই সঙ্গে এই এক্সপোজারগুলি অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, প্রদাহ জনক প্রতিক্রিয়া, কোষের ক্ষতি বৃদ্ধি করতে পারে। আবার এই সমস্ত কারণগুলিই উচ্চ মৃত্যুর ঝুঁকির সঙ্গেও যুক্ত।
উচ্চ তাপমাত্রা এবং দূষণের প্রভাবে সৃষ্ট রোগ:
- হৃদরোগ: উচ্চ তাপমাত্রায় শরীরের উপর চাপ পড়ে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
- শ্বাসকষ্ট: দূষণ শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা যেমন হাঁপানি, ব্রংকাইটিস এবং ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
- অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা: দূষণ এবং উচ্চ তাপমাত্রা উভয়ই নিউমোনিয়া, স্ট্রোক, এবং দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ তাপমাত্রা এবং দূষণের কারণে এইসব স্বাস্থ্য সমস্যা হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকে শিশু, গর্ভবতী মহিলা এবং বয়স্করা। এছাড়াও হাঁপানি বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এই পরিস্থিতিতে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।












Click it and Unblock the Notifications