চোখে স্বপ্ন বিশ্বকাপ ফুটবলে রেফারি হওয়ার, তবু দারিদ্র চা বেচতে বাধ্য করে!
কলকাতা, ৩ সেপ্টেম্বর : বছর চব্বিশের ছিপছিপে চেহারার ছেলেটি। ফুটবলের নাম শুনলেই চোখদুটো যেন চিকচিক করে ওঠে। না ফুটবলে পা ঠেকিয়া খেলা তাঁর স্বপ্ন নয়। বরং মনে দৃঢ় বিশ্বাস একদিন বিশ্বকাপের ম্যাচে লাইন্সম্যান হয়েই ম্যাচ পরিচালনা করবেন।
নাম উজ্জ্বল হাজরা। সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন (AIFF)-এর রেফারি কমিটির স্পেশ্যালিস্ট লাইন্সম্যান। সম্ভবত বাংলা থেকে উঠে আসা ফেডারেশনের একমাত্রা লাইন্সম্যান উজ্জ্বল। কল্যাণীতে বাড়ি। এতবড় কৃতিত্বের পরও সেভাবে উচ্ছ্বাসের লেসমাত্র নেই উজ্জ্বলের শরীরি ভাষায়।

সেকেন্ড ডিভিশন আইলিগে সেরা চার পারফর্মারের মধ্যে থেকেও চোখে মুখে একটা চাপা উদাসীনতা। যদিও কারণটা বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হয় না। মাত্র চব্বিশ বছরের জীবনে এত সংঘর্ষ সংগ্রাম করে জীবনে এগোতে হয়েছে বা আজও হচ্ছে, যে সময়ই তাকে এত সহনশীল ও সহিষ্ণু করে তুলেছে। দারিদ্র, দুর্দশা, যন্ত্রণা তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। তাঁর বড় বড় কৃতিত্ব তাকে দুবেলা দুমুঠো ভাত খাওয়াতে অপারগ।
১০ ফুট বাই ১০ ফুটের একটা ছোট্ট বাড়িতে মায়ের সঙ্গে থাকেন উজ্জ্বল। বাবা ছোটবেলাতেই মারা গিয়েছেন। বাড়ির সামনেই মা নীলুরানির একটা চায়ের ঘুমটি রয়েছে। সেখানে দু পয়সা রোজগারের চেষ্টা মায়ের সঙ্গে চায়ের ঘুমটিতে হাত লাগিয়েছেন উজ্জ্বল।
উজ্জ্বলের কথা, "সবই তো বোঝেন, কত টাকাই বা আর রোজগার হয় চা বিক্রি করে। কিন্তু টাকা রোজগারের আর পথও নেই যে।"
কলকাতা প্রিমিয়ার ফুটবল লিগে ম্যাচপিছু লাইন্সম্যানদের আয় মাত্র ৪৫০ টাকা। তাই লিগ শেষে রেফারি হোক বা দুই লাইন্সম্যান, এতই কম টাকা ঝুলিতে আসে যে কেউ রেফারিং করার জন্য এগিয়ে আসতে চায় না।
কিন্তু রেফারিং করা উজ্জ্বলের পেশা নয় নেশা। গত বছর সরকারি অফিসে অস্থায়ী একটা চাকরি জুটেছিল খুব কষ্টে। কিন্তু সন্তোষ ট্রফিতে লাইন্সম্যান হিসাবে কাজের সুযোগ পেয়ে সরকারি চাকরিও ছেড়ে দিয়েছিলেন অনায়াসে।
আক্ষেপ মেশান গলায় উজ্জ্বল জানালেন, "ভারতীয় অভিজাত কোনও চ্যাম্পিয়ানশিপ বা আন্তর্জাতিক ম্যাচে রেফারি হয়ে হুইসেল বাজারো আমার হবে না জানি। হাইটেই (উজ্জ্বলের উচ্চতা ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি)মার খেয়ে গেছি।" দুবছর আগে দেশের জনপ্রিয় এবং অভিজ্ঞ রেফারিদের পরামর্শেই লাইন্সম্যান হওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন উজ্জ্বল।
কে শঙ্করের পথ অনুসরণ করেই বিশ্বকাপের ম্যাচ পরিচালনার স্বপ্ন আজ উজ্জ্বলের চোখে মুখে। এই প্রসঙ্গেই বললেন, "বেঁটে হওয়া সত্ত্বেও কে শঙ্কর ভারতীয় রেফারির ময়দানে কিংবদন্তী। বিশ্বকাপেও লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন। আমিও ওনার পথ অনুসরণ করেই এগোচ্ছি। উনি আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। অনেক টিপস দিয়েছেন। আমি ওর দেখানো পথেই হাঁটতে চাই।"












Click it and Unblock the Notifications