কিয়ানের প্রেরণা জামশিদই! এটিকে মোহনবাগানের ডার্বি জয়ের নায়ক নাসিরির উত্থান কীভাবে?
বছর ২১-এর কিয়ানকে দীপক টাংরির পরিবর্ত হিসেবে নামানোই আজ এটিকে মোহনবাগান কোচ হুয়ান ফেরান্দোর মাস্টারস্ট্রোক। কোচের আস্থার মর্যাদা দিয়ে ভাইচুং ভুটিয়া, চিডি এডের পর তৃতীয় ফুটবলার হিসেবে কলকাতা ডার্বিতে হ্যাটট্রিক সেরে নায়ক কিয়ান। আইএসএলে চারটি সাক্ষাতের চারটিতেই এসসি ইস্টবেঙ্গল হারল এটিকে মোহনবাগানের কাছে। দ্বিতীয়ার্ধের ইনজুরি টাইমেই জোড়া গোল কিয়ানের। আইএসএলকে দেওয়া সাক্ষাতকারে কিয়ান আগেই বলেছিলেন, বাবার কাছে ডার্বি নিয়ে অনেক গল্প শুনেছি। কতটা তীব্রতা থাকে এই ম্যাচে ও কতটা উত্তেজনাপূর্ণ হয় ডার্বি, সবই শুনেছি। উনি সবময়ই চান, আমিও ডার্বিতে খেলি। বাবার সেই ইচ্ছাপূরণ করলেন রীতিমতো ইতিহাস তৈরি করে। পিতা-পুত্রের ডার্বিতে গোল করার নজির গড়ে।

পিতা-পুত্রের নজির
আশির দশকের শুরুর দিকে কলকাতার ময়দান মাতিয়েছিলেন ইরানের দুই ফরওয়ার্ড জামশিদ নাসিরি ও মজিদ বিসকার। মজিদ দেশে ফিরে গেলেও জামশিদ কলকাতাতেই সপরিবারে থেকে যান। জামশিদই ভারতে খেলতে আসা প্রথম বিদেশি ফুটবলার যাঁর এ দেশে বিভিন্ন ক্লাব টুর্নামেন্টে শতাধিক গোল করার নজির রয়েছে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৬- এই সাত মরশুম কলকাতার ইস্টবেঙ্গল ও মহমেডান স্পোর্টিংয়ে খেলেছেন জামশিদ। লাল-হলুদ জার্সি গায়ে দু-দফায় ৬৪টি এবং মহমেডানে চার বছরে ৫৮ গোল করেন তিনি। সেই সময়ে সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া বিদেশি ফুটবলারদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জামশিদ। লাল-হলুদ জার্সি গায়ে একাধিক ডার্বি খেলেছেন, গোলও করেছেন। বাবার মুখেই ডার্বির গল্প শুনে ডার্বি খেলা, গোল করার স্বপ্ন দেখা শুরু কিয়ানের।
|
মানসিক প্রস্তুতি আগেই
এবারের আইএসএলে ডার্বিতে নামার লক্ষ্যে নিজেকে দারুণভাবে তৈরি রেখেছিলেন কিয়ান। তিনি বলেছিলেন, ডার্বিতে খেলার জন্য আমি তৈরি। যে কোনও সময়ে বললেই আমি মাঠে নামতে পারি। শুধু ডার্বি কেন, যে কোনও ম্যাচেই মাঠে নামতে তৈরি আমি। আমাদের সে ভাবেই অনুশীলন করানো হয়, যাতে যে কোনও দলের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে সফল হতে পারি। বাবার সাফল্যের কথা লোকের মুখে মুখে শুনেছেন। ভালো ফুটবলার হওয়ার জেদ নিয়ে এগিয়ে চলা কিয়ানের কাছে আজকের ডার্বি মাইলস্টোন হয়েই রইল। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা একমত, ভারতীয় ফুটবলার এক অসাধারণ স্ট্রাইকার পেয়ে গেল। ডার্বি উপহার গিল ভবিষ্যতের তারকার।
|
বাবার কাছেই শেখা
কিয়ানের কথায়, ছোটবেলা থেকেই ফুটবল ভালোবাসি আমি। এগারো বছর বয়স পর্যন্ত যেখানে সুযোগ পেতাম ফুটবল খেলতাম। ১২ বছর বয়সে জুনিয়র বাংলা দলে ডাক পাই। ১৩-য় মোহনবাগান যুব দলে সুযোগ আসে। ২০১৬-য় জুনিয়র আই লিগে মহমেডান স্পোর্টিংয়ের হয়ে খেলার সুযোগ পাই। পরে কলকাতা লিগে সিএফসি-র হয়ে সিনিয়রদের সঙ্গে খেলার সুযোগ আসে। এর পরে মোহনবাগানের অনূর্ধ্ব ১৯ দলের ডাক আসে এবং ২০১৯-২০ মরশুমে আই লিগের দলেও আমাকে সুযোগ দেওয়া হয়। ওখান থেকেই আমার পেশাদার ফুটবল জীবন শুরু হয়। ছোটো থেকেই আমার বাবা ও পরিবারের অন্যান্যরা ফুটবলকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ব্যাপারে খুবই উৎসাহ দেন আমাকে। ছোটোবেলা থেকেই বাবার কোচিংয়ে ছিলাম। কোচ ও বাবার মধ্যে সব সময়ই একটা দূরত্ব বজায় রাখতেন তিনি। তবে সবসময়ই তিনি আমাকে উৎসাহ জুগিয়েছেন, ভালো কিছু করলে প্রশংসাও করেছেন। আজকের ম্যাচের পর জামশিদ চান, ছেলের গায়ে উঠুক ভারতের জার্সি। জামশিদ নিজে মোহনবাগানে খেলেননি। ফলে পুত্র এটিকে মোহনবাগানের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে আরও উন্নতি করুক সেটাই প্রার্থনা গর্বিত পিতার।
|
গর্বিত পরিবার
কিয়ান এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, এটিকে মোহনবাগানে যখন যোগ দিই, তখন পরিাবারের সবাই খুব খুশি হয়েছিলেন। কারণ, গত কয়েক বছর ধরে যে পরিশ্রম ও ত্যাগস্বীকার করে এসেছি আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা, এ তারই ফল। তাই এটা আমার ফুটবল জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। বাবার খেলা দেখার সৌভাগ্য হয়নি কিয়ানের। তবে বাবার বন্ধু ও অন্যদের কাছে থেকে বাবার খেলা নিয়ে অনেক কথা শুনেছি। তখন ফুটবল কীরকম ছিল, তা শুনে অবাকও হয়েছেন। কিয়ানের কথায়, আমার বাবার সাফল্যের জন্য সবাই মনে করেন আমিও তাঁর মতোই সফল হব। অনেকে তা বলেও থাকেন। এ সব শুনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। বাবার সঙ্গে তুলনা বা বাবার মতো খেলতে না পারলে তার সমালোচনা শোনাটা এক দিক দিয়ে ভালো। উন্নতি করার তাগিদটা অনুভব করি সব সময়। আশা করি ওই জায়গায় নিজেকে নিয়ে যেতে পারব।
|
এগিয়ে চলার পথ
জুনিয়র বাংলা দলের হয়ে খেলার পর সেখান থেকেই মোহনবাগানের কর্তাদের চোখে পড়ে যান কিয়ান। তাদের যুব দলে খেলার সুযোগ পান। তখন অনুর্ধ্ব ১৬ ভারতীয় দলের কোচ বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজের নজরেও পড়েছিলেন। অনুর্ধ্ব ১৯ জাতীয় লিগ খেলার পরে নিজেকে ক্রমশ ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করেন কিয়ান। গোয়ায় ট্রায়ালে দেখে তাঁকে দলে নিয়েছিলেন স্প্যানিশ কোচ কিবু ভিকুনা। একটাই ম্যাচ খেলেন সিনিয়র মোহনবাগানের হয়ে, ট্রাউয়ের বিরুদ্ধে জেতা ম্যাচে। তার পরেই এটিকে মোহনবাগান। কিয়ানের কেরিয়ার আজ অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিল শনিবাসরীয় ডার্বি। কিয়ানের সাফল্যে গর্বিত জামশিদের কোচিংয়ে খেলা রহিম নবি-সহ অনেক তারকাও।












Click it and Unblock the Notifications