মমতা যতই হাঁক পাড়ুন, মোদীর মোকাবিলা তিনি ঠিকঠাক পারছেন না; উল্টে সুবিধা করছেন বিজেপিরই
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক সময়ে বঙ্গীয় রাজনৈতিক জীবনে এক আশার আলো ছিলেন। যতদিন বামেদের একপেশে দাপট চলেছে রাজ্যের মাটিতে, একা বুক চিতিয়ে লড়াই করে গিয়েছেন নেত্রী।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক সময়ে বঙ্গীয় রাজনৈতিক জীবনে এক আশার আলো ছিলেন। যতদিন বামেদের একপেশে দাপট চলেছে রাজ্যের মাটিতে, একা বুক চিতিয়ে লড়াই করে গিয়েছেন নেত্রী। তাঁর উপরে শারীরিক নিগ্রহ হলেও নিজের "অগ্নিকন্যা" খেতাবের সঙ্গে কোনওদিন আপোস করেননি মমতা। বাংলায় কংগ্রেস বামেদের সঙ্গে আসলে সমঝোতা করে, এই অভিযোগে তিনি দল ছেড়ে নিজের পৃথক দল তৃণমূল কংগ্রেস তৈরী করে সেই কংগ্রেসকেই আইসিসিইউতে পাঠিয়ে দেন। ২০১১ সালে তিনি চৌত্রিশ বছরের ক্ষমতাসীন বামেদেরও গণেশ উল্টে দেন।
আদর্শ নয়, শুধুমাত্র রাজনৈতিক লড়াইয়ের উপর ভর করে মমতা একসময়ে বাংলার বামপন্থীদের উৎখাত করেছিলেন। তাঁর তৃণমূল কংগ্রেসের ভিত্তি কী আজও কেউই জানে না, কিন্তু এইটুকু অবশ্যই জানে যে বাম নামক বিষাক্ত অহিকে দমন করতে এমন নকুলের জুড়ি মেলা ভার ছিল বাংলায়। নৈতিক কারণে দিদি পাশে পান রাজ্যবাসীকে এবং দলের বিরুদ্ধে দলকে লেলিয়ে দিয়ে তিনি শেষ অবধি জয়লাভ করেন।
আজকে, প্রথম ক্ষমতায় আসার আট বছর পরে মমতা সম্মুখীন হয়েছেন এক নতুন প্রতিপক্ষের, নাম তার ভারতীয় জনতা পার্টি -- কেন্দ্রে এই মুহূর্তে শাসন রয়েছে তারা। মমতা বুঝতে পারছেন যে বঙ্গের আকাশে বাতাসে যেভাবে বিজেপির নামে ধুয়ো উঠছে, তাতে রাজ্যের রাজনীতিতে তাঁর একপেশে দাপটের বিরুদ্ধে বড়সড় চ্যালেঞ্জ আসতে পারে আগামী দিনে।

মমতা বুঝছেন বিজেপি বড় চ্যালেঞ্জ, কিন্তু করতে পারছেন না প্রায় কিছুই
কিন্তু বুঝেও তিনি যে বিশেষ কিছু করে উঠতে পারছেন, তা কিন্তু নয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে উঠতে বসতে গালাগালি করছেন; হিন্দিতে বক্তৃতা দিচ্ছেন, নিজের রাজ্যেও; মোদীকে রাবণের মতো দেখতে বলে কটাক্ষ করছেন; বিজেপি এই নির্বাচনে ক'টা আসন পাবে বা পাবে না, তাও বলে দিচ্ছেন; মোদীভক্তরা "জয় শ্রীরাম" বলে জয়ধ্বনি তুললে গাড়ি থেকে নেমে তেড়ে যাচ্ছেন -- কিন্তু কোথাও মনে হচ্ছে মোদীর জনপ্রিয়তাকে তিনি মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন এবং তাঁর কথা-বার্তা-ভঙ্গিমায় বারবার বেরিয়ে পড়ছে যে তিনি দিনের শেষে একজন আঞ্চলিক দলনেত্রী যার পক্ষে বিজেপির মতো জাতীয় দল ও মোদীর মতো জাতীয় নেতাকে হারানো বেশ কঠিন। অন্তত, ইস্যু তুলে তিনি সেই লড়াই লড়তে এখনও পর্যন্ত ব্যর্থ। প্রশাসকের ভূমিকাতেও মোদীকে চ্যালেঞ্জ করতে তাঁকে দেখা যাচ্ছে না। উল্টে সব ব্যাপারেই মোদীর বিরোধিতা করতে গিয়ে (যেমন সাইক্লোন ফণীর ত্রাণকার্যের সময়ে মোদীর ফোন না নেওয়া) তিনি নিজের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন।

দু'টি কারণে মমতা পিছিয়ে পড়ছেন
এই ব্যর্থতার মূল কারণ আসলে দু'টি।
প্রথমত, বিজেপির মতো সাংস্কৃতিক আদর্শের রাজনীতির মোকাবিলা কীভাবে করা যায়, মমতার জানা নেই। কারণ রাজ্যে এর আগে তিনি এই ধরনের রাজনীতি করেননি। বিজেপিকে "দাঙ্গাবাজ" দল বলে আক্রমণ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক প্রকার নিজের সংখ্যালঘু তোষণের ভাবমূর্তিটি আরও জোরালো করে তুলছেন। বিজেপির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ নতুন কথা নয় কিন্তু মমতা তাঁর আক্রমণের দিশাটি পুরোপুরি একবগ্গা এবং অনেক সময়ে ছেলেমানুষি বিরোধিতায় নিয়ে গিয়ে যেন নিজের হাতেই নিজের আক্রমণটিকে ভোঁতা করে দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই তিনি বিজেপির উস্কানিমূলক কথাবার্তা বা কাজকর্ম অবজ্ঞা করে যেতে পারতেন, কিন্তু নৈতিক লড়াইয়ের খাতিরে সেটা না করে তিনি একপ্রকার উৎসাহিত করছেন দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদেরই। নিজের অজান্তেই মমতা বিজেপির ফাঁদে পা দিয়ে ধর্মীয় রাজনীতির মেরুকরণ করে দিচ্ছেন আরও। এটা একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর এক বড় ব্যর্থতা।

অতীতে বিজেপির সঙ্গে ঘর করা মমতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন
দ্বিতীয়ত, অতীতে বেশ কয়েকবার বিজেপির সঙ্গে ঘর করার জন্যে আজ মমতার বিজেপি-বিরোধিতা অনেকের চোখেই অভিনয়-সম ঠেকে। রাজ্যে বামেদের হারাতে বিরোধী নেত্রী হিসেবে মমতা বেশ কয়েকবার কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। এমনকী, বলা হয় বঙ্গের রাজনীতিতে যদি কেউ বিজেপিকে নিয়ে এসে থাকেন, তবে তিনি মমতাই। একবার কংগ্রেস বা একবার বিজেপির হাত ধরে মমতা অতীতে প্রমাণ করেছেন যে উনি আদর্শের রাজনীতির ধার ধারেন না, যেটা সুবিধার সেটাই করেন আর তাই করার জন্যে আজ রাজ্যের অনেকের কাছেই তাঁর বিজেপি-বিরোধিতার রাজনীতি খুব বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না।
মোদী স্বয়ং সেই কথা জানেন বলেই "দিদি আমাকে কুর্তা, মিষ্টি পাঠান" বলে প্রকাশ্যে মন্তব্য করছেন যাতে তৃণমূল নেত্রী মনস্তাত্বিক চাপে পড়েন। মমতা প্রকাশ্যে সেই চাপের কথা স্বীকার করবেন না স্বাভাবিক কিন্তু তিনি এটাও বুঝছেন যে মোদীকে মসনদ থেকে টলানোর মতো ব্রহ্মাস্ত্র তাঁর তূণীরে বিশেষ নেই। তিনি বড়জোর বাংলাকে নিজের নাগালে রাখতে পারেন।












Click it and Unblock the Notifications