সৌরভ ও ধোনির মধ্যে কাকে এগিয়ে রাখলেন হরভজন? ভাজ্জিকে বল দিতে লক্ষ্মণকে কেন বারণ মহারাজের?

সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের টিম ইন্ডিয়ার সর্বশেষ সদস্য হিসেবে আজ ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেন হরভজন সিং। আর তারপরই তিনি অকপটে জানিয়ে দিলেন, দাদা না থাকলে এই জায়গাতেই পৌঁছাতে পারতাম না। মহেন্দ্র সিং ধোনির নেতৃত্বে দুটি বিশ্বকাপ জিতলেও ক্রিকেটারদের আদর্শ ক্যাপ্টেন হিসেবে সৌরভকেই বেছে নিলেন ভাজ্জি। কেরিয়ারের সেরা পারফরম্যান্স হিসেবে বেছে নিলেন ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দেশের মাটিতে তিন টেস্টের সিরিজে ১৭.০৩ গড় রেখে নেওয়া ৩২টি উইকেট, যে রেকর্ড আজও অটুট। তবে এর পিছনেও রয়েছে চোয়াল চাপা সংগ্রাম।

কুম্বলের চোটেই আসে সুযোগ

কাঁধে চোটের কারণে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছিল অনিল কুম্বলের। ২০০০ সালের অক্টোবর থেকে এক বছর তিনি খেলতে পারেননি। কুম্বলের বিকল্প হিসেবে কাউকে পেতে চলছে সন্ধান। এরই মধ্যে ভারতের বিরুদ্ধে টেস্টে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে তুলে ফেলল চারশো। এরপর জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে দেশের মাটিতে দুই টেস্টের সিরিজ। ভারত ১-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতলেও অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার স্যুইপ ও রিভার্স স্যুইপ মেরে ভারতীয় স্পিনারদের নিয়ে ছেলেখেলা করেছেন। সুনীল যোশী, শরণদীপ সিং ও মুরলী কার্তিক মিলে ১৪ উইকেট পেয়েছেন। ১০৪ বলে এসেছে একটি উইকেট! এরপরই সিরিজ স্টিভ ওয়ার অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। যারা তখন টানা ১৫টি টেস্ট জিতে ভারতে। চেন্নাইয়ে সম্ভাব্য ২৫ জনকে নিয়ে শিবির বসল। সেখানে কুম্বলেও ছিলেন। এক বছর কোনও টেস্ট খেলেননি, তবু শিবিরে ছিলেন ভাজ্জি। তবে তাঁর বোলিং নজর কাড়ল টিম ম্যানেজমেন্টের।

শিবিরে নজরকাড়া বোলিং

শিবিরে জন রাইটের পরামর্শে নিজেকে ক্ষুরধার করলেন ভাজ্জি। নাগপুরে ভারতীয় এ দলের হয়ে তিনি প্রথমে দলে ছিলেন না। কিন্তু শিবিরে তাঁর বোলিং দেখে অস্ট্রেলিয়া সিরিজের দল নির্বাচনের আগে দেখে নিতে চাইলেন নির্বাচকরা। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচে ভারত এ দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ভিভিএস লক্ষ্মণ। তিনি পরে বলেছিলেন, হরভজন নিজের বোলিংয়ের অনেক উন্নতি ঘটিয়েছিলেন। স্লিপে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম নাগপুরের ফ্ল্যাট উইকেট থেকেও হরভজন ভালো বাউন্স আদায় করে নিয়ে বল ঘোরাচ্ছেন। বল গিয়ে লাগছে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের ব্যাটের উপরভাগে। হরভজন জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর নিজের বোলিং অ্যাকশন-সহ খুঁটিনাটি বিষয়কে আরও নিখুঁত করেছিলেন।

কঠিন সময়

এর আগে এতটাই কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন হরভজন যে, ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। শৃঙ্খলাজনিত কারণে ন্যাশনাল ক্রিকেট আকাদেমি থেকে বহিষ্কৃত হন। পাঞ্জাব রঞ্জি দল থেকেও বাদ পড়তে চলেছিলেন, কয়েকজন সিনিয়র ভাজ্জির উপর আস্থা রেখে তাঁর কেরিয়ার বাঁচিয়ে দেন। এরই মধ্যে প্রয়াত হন তাঁর পিতা। বন্ধুরা তখন অনেকে আমেরিকায় গিয়ে রোজগার করে বাড়িতে টাকা পাঠাতেন। তাই দেখে হরভজনও ভাবেন, সব কিছু ছেড়ে বিদেশে চলে যাবেন। ট্রাক ড্রাইভার, শ্রমিক বা পেট্রোল পাম্পের কর্মচারীর কাজ জুটিয়ে নেবেন। কিন্তু পরবর্তীকালে সেই ভাবনা দূরে রেখে ক্রিকেটেই ফোকাস বাড়ান। বাবার মৃত্যুর বড় ধাক্কা হরভজনকে আরও দায়িত্বশীল, পরিণত ও শৃঙ্খলাপরায়ণ করে তোলে। বাকিটা ইতিহাস।

কঠোর অনুশীলন

ঠিক সকাল ১১টায় মাঠে পৌঁছে যেতেন। সন্ধ্যা হলে ফিরতেন সকলের শেষে। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং কিছুতেই খামতি রাখেননি। সবশেষে ফের ১০-১২-১৫টা বল করে নিজের ছন্দ যাচাই করে নেওয়াটাই ছিল ভাজ্জির রুটিন। জলন্ধনে বার্লটন পার্কে বৃষ্টির মধ্যেই ৪৫-৫০ পাক দৌড়েছিলেন। হৃদয় থেকে কিছু করে নিজেকে উজাড় করে দিলে ঈশ্বর তার পুরস্কার দেবেনই, এই বিশ্বাস নিয়েই এগিয়ে গিয়েছেন হরভজন। তাঁর কথায়, অনূর্ধ্ব ১৪ ক্রিকেট খেলার সময় থেকেই বাউন্স আদায় করতে পারতাম। নতুন কিছু করার জন্য সব সময় পরামর্শ দিয়ে গিয়েছেন কোচ দাভিন্দর অরোরা। প্রাক্তন ভারতীয় কোচ জন রাইট বলেছেন, হরভজনকে দেখে আমার ভালো লেগেছিল। তবে তাঁকে দলে নিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ই। জহুরির চোখ বলে কথা!

সৌরভের বারণ!

লক্ষ্মণ জানিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচে হরভজন ছাড়াও ছিলেন রাহুল সাঙ্গভি, বালাজি রাও। সৌরভ আমার কাছে জানতে চান, কে ভালো বল করছেন। প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেন সাঙ্গভি। কিন্তু হরভজনেরও প্রশংসা করেন লক্ষ্মণ। তখন সৌরভ বলেন হরভজনকে দিয়ে বল না করাতে। সৌরভ চাননি অস্ট্রেলিয়ানরা ভাজ্জির বল দেখে নিক। তখনই বুঝে গিয়েছিলাম সৌরভ হরভজনকে দলে নেবেন বলে মনস্থির করেই ফেলেছেন। পরের সেশনে হরভজনকে আর বল দেননি লক্ষ্মণ, যাতে ক্ষুব্ধ হন ভাজ্জিও। তবে তাঁকে সৌরভের কথা বলে দেন লক্ষ্মণ। নির্বাচকমণ্ডলীর চেয়ারম্যান চাঁদু বোর্দেও জানতে চান হরভজনকে বল না দেওয়ার কারণ। তাঁকেও সৌরভের কথা বলা হয়। তবে তিনি বলেন, হরভজনের বল আমরা দেখতে চাই। পরে ভাজ্জিকে দিয়ে বোলিং করানও লক্ষ্মণ।

দাদাকেই এগিয়ে রাখলেন ভাজ্জি

হরভজন আজ বলেছেন, যদি অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক-সহ ৩২ উইকেট না পেতাম তাহলে আজ জায়গায় হয়তো পৌঁছাতেই পারতাম না। নিজেকে পরিচিত করানোর সুযোগ আমাকে করে দিয়েছেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, অধিনায়ক হিসেবে। আর ধোনি যখন অধিনায়ক হলেন তখন আমার দক্ষতার সঙ্গে সকলেই পরিচিত। অস্ট্রেলিয়ার সিরিজের সঙ্গেই জড়িয়ে আমার অস্তিত্ত্ব। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্যই আজ আমি এই জায়গায়। দাদা আমার দক্ষতা সম্পর্কে জানলেও কেমন খেলব তা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না। ধোনি যখন অধিনায়ক হন তার আগে আমি অনেক ম্যাচ জিতিয়েছি। সকলের জীবনেই সঠিক সময় একজনকে দরকার যিনি পথপ্রদর্শকের ভূমিকা নেবেন আর আমার কেরিয়ারে সেই মানুষটিই হলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি যদি লড়ে আমাকে দলে না ঢোকাতেন, আজ আমি কোথায় থাকতাম জানি না। ধোনিও সৌরভের উত্তরাধিকার বহন করে নিয়ে গিয়েছেন। আমরা একসঙ্গে লড়াই চালিয়ে বেশ কিছু মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রেখেছি, যা আজও উপভোগ করি।

এরপর রাজনীতি?

২০১১ সালে চোট সারিয়ে ফেরার পর থেকে দলের কাছ থেকে যতটা সাপোর্ট প্রত্যাশা করেছিলেন তা পাননি বলেই জানিয়েছেন হরভজন। তবে এ জন্য তিক্ততা আজ আর নেই। অবসর নেওয়ার কথা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, জয় শাহ, আকাশ আম্বানিদের জানিয়েছেন। হরভজনের কথায়, দাদা, ভিভিএস, যুবরাজ, শেহওয়াগ, আশিস নেহরা আমরা সকলে একটা পরিবারের মতোই। রাজনীতিতে নামার সম্ভাবনা উড়িয়ে না দিলেও ভাজ্জি জানিয়েছেন, যা সিদ্ধান্ত নেবেন তা ভেবেচিন্তেই নেবেন।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+