অভিষেক টেস্টেই ঝলমলে শ্রেয়স আইয়ার! কানপুরে কেন কেরিয়ারের বৃত্ত সম্পূর্ণ?
বিরাট কোহলির পরিবর্ত হিসেবে ভারতীয় টেস্ট দলে ডাক পেয়েছিলেন ২০১৭ সালে। এবারও ভারতীয় টেস্ট দলে ডাক পেয়েছেন বিরাট কোহলির অনুপস্থিতিতেই। তবে চার বছর আগে অজিঙ্ক রাহানের নেতৃত্বেই অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেক না হলেও এদিন সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটল শ্রেয়স আইয়ারের। ১০৬ রানে ভারত যখন তিন উইকেট হারিয়েছে তখন ব্যাট করতে নামেন শ্রেয়স। দিনের শেষে দলকে মজবুত জায়গায় পৌঁছে দিলেন দুরন্ত অর্ধশতরানের মাধ্যমে। প্রথম দিনে আলোর অভাবে খেলা বন্ধের সময় ভারতের স্কোর ৪ উইকেটে ২৫৮ রান। সাতটি চার ও দুটি ছয়ের সাহায্যে ১৩৬ বলে ৭৫ রান করে অপরাজিত শ্রেয়স আইয়ার। ১০০ বলে ৫০ রানে ক্রিজে রবীন্দ্র জাদেজা। তাঁদের অবিচ্ছেদ্য পঞ্চম উইকেট জুটিতে উঠেছে ১১৩ রান।

কানপুরে বৃত্ত সম্পূর্ণ
২০১৪ সালের ডিসেম্বরের কথা। রঞ্জি ট্রফিতে সেবার জম্মু ও কাশ্মীরের কাছে প্রথম হেরেছিল মুম্বই। পরের ম্যাচে রেলওয়েজ প্রথম ইনিংসে লিডের সুবাদে পয়েন্ট ছিনিয়ে নেয়। চাপে থাকা প্রবীণ আমরের প্রশিক্ষণাধীন মুম্বইয়ের পরের ম্যাচ ছিল কানপুরে উত্তরপ্রদেশের বিরুদ্ধে। প্রবীণ আমরে শ্রেয়স আইয়ারের ১২ বছর বয়স থেকেই তাঁকে চিনতেন। জানতেন তাঁর ইস্পাতকঠিন মানসিকতার কথা। উত্তরপ্রদেশ ম্যাচ হারলে আমরের যেমন চাকরি যাওয়া অবধারিত ছিল, তেমনই হারিয়ে যেতে পারতেন শ্রেয়সও। কারণ তার আগের ম্যাচগুলিতে শ্রেয়স আহামরি কিছু করতে পারেননি। আমরে তাঁকে বলেছিলেন, মাঠের বাইরে বসে অন্যের জন্য হাততালি না দিয়ে এমন কিছু করে দেখাও যাতে লোকে তোমার খেলা দেখে হাততালি দেয়।

ইস্পাতকঠিন মানসিকতা
উত্তরপ্রদেশের ২০৬ রানের জবাবে খেলতে নেমে সূর্যকুমার যাদবের নেতৃত্বাধীন মুম্বইয়ের ৫৭ রানে ৬ উইকেট পড়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে মুম্বই লিগ নিতে পেরেছিল সাতে নামা শ্রেয়স আইয়ার ৭৮ বলে ৭৫ ও শার্দুল ঠাকুর ১০০ বলে ৮৭ রান করায়। শ্রেয়স সেই ম্যাচে আউট হয়েছিলেন দলের ১৭৩ রানের মাথায়। এরপর শার্দুল নবম উইকেট জুটিতে ৯৭ রান যোগ করেছিলেন ওয়েইনগনকরকে নিয়ে। এই ম্যাচে শ্রেয়স যখন ব্যাট করতে নামেন তখন মুম্বই ধুঁকছে ৫৩ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে। তারই মধ্যে শ্রেয়স এক কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। নিজের কিট ফেলে এসেছিলেন হোটেলেই। দলের উইকেট পড়তে থাকায় যখন আমরে চিন্তিত তখনই শ্রেয়সের এই কথা জেনে চটে গিয়েছিলেন মুম্বই কোচ। কোনওরকমে শার্দুল ঠাকুরের ক্রীড়া সরঞ্জাম নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন শ্রেয়স। পরে তিনি বলেছিলেন, এই ম্যাচে যদি ব্যর্থ হতাম আর সুযোগই পেতাম না কোনও দলে। ব্যাট করতে নেমে প্রবীণ কুমারের ওভারে পরপর তিনটি চার মেরে পাল্টা লড়াই শুরু করেন শ্রেয়স। প্রথম ১০ বলের মধ্যে মেরেছিলেন ৬টি চার। মোট ১১টি চার মেরে ৭৮ বলে ৭৫ রান করেছিলেন শ্রেয়স।

গ্রিন পার্কে দুরন্ত শ্রেয়স
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে যে মাঠে নিজের প্রতিভা দারুণভাবে মেলে ধরেছিলেন সেই মাঠেই হলো টেস্ট অভিষেক। ২০১৭ সালে বিরাট কোহলি ধরমশালা টেস্টের আগে চোট পেয়ে ছিটকে যান। ডাক পান শ্রেয়স। অবশ্য সেটিও এমনিতে হয়নি। অস্ট্রেলিয়া ভারতীয় 'এ' দলের বিরুদ্ধে যে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছিল মুম্বইয়ে তাতে ২৭টি চার ও ৭টি ছক্কার সাহায্যে তিনে নেমে ২১০ বলে ২০২ রানে অপরাজিত ছিলেন শ্রেয়স। ভারতীয় 'এ' দল অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ৭ উইকেটে ৪৬৯ রানের জবাবে তুলেছিল ৪০৩, তার অর্ধেকেরই বেশি রান এসেছিল শ্রেয়সের ব্যাট থেকে। সপ্তম উইকেট জুটিতে কৃষ্ণাপ্পা গৌতম (৭৪)-কে নিয়ে ১৩৮ রান যোগ করেছিলেন। ওই বছরই নিউজিল্যান্ড 'এ' দলের বিরুদ্ধে আনঅফিসিয়াল টেস্টে তিনি বিজয়ওয়াড়ায় ১০৮ ও ৮২ রানের ইনিংস খেলেছিলেন।

আগ্রাসী ব্যাটিং পছন্দ
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচে শ্রেয়স ব্যাট করতে নামার সময় স্লেজিংয়ের মাধ্যমে ডেভিড ওয়ার্নার বলেছিলেন, তোমার খেলা তো এমন কিছু নয়। দেখি কী করতে পারো! জবাবটা ব্যাট দিয়েই দিয়েছিলেন। ব্যাট করতে নেমে প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন নাথান লিয়ঁর বলে। তারপর যে দ্বিশতরানটি করেছিলেন সেটি শ্রেয়সের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বাধিক রান। প্রবীণ আমরের কথায়, শ্রেয়স ছয়-সাতে ব্যাট করতেন। তাঁকে উপরের দিকে আমি নিয়ে আসি। কিন্তু তাঁর খেলার ধরনের জন্য আমিও সমালোচিত হয়েছি নিজের সিদ্ধান্তের জন্য। মুম্বই ক্রিকেটে সকলে যেটা পছন্দ করেন তা হলো উইকেটে থিতু হয়ে বড় ইনিংস খেলা। কিন্তু শুরু থেকেই আগ্রাসী ব্যাট করতে পছন্দ করেন শ্রেয়স, তাঁর খেলার ধরন মুম্বইয়ের ব্যাটারদের থেকে আলাদা।
|
ডিপি বদলাবে?
শ্রেয়সের বাবা সন্তোষ আইয়ারের হোয়াটসঅ্যাপের ডিপিতে আজ অবধি রাখা ২০১৭ সালের একটি ছবি। যাতে শ্রেয়স বর্ডার-গাভাসকর ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে। এই ছবিটি রাখার একটাই কারণ, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে শ্রেয়স যতই সফল হোন না কেন, তাঁর বাবা পুত্রের টেস্ট অভিষেকের প্রতীক্ষায় ছিলেন। ২০১৭ সালে ধরমশালা টেস্টে অজিঙ্ক রাহানের নেতৃত্বে অজিদের বিরুদ্ধে অভিষেক হয়নি। ঘনিষ্ঠ মহলে শ্রেয়স ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, অন্য দেশ হলে এতদিন তিনি বেশ কয়েকটি টেস্ট খেলে ফেলতেন। তবে তাঁকে ধৈর্য্য ধরে সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন আমরে। মাঝে চোট, অপারেশনে মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে কয়েক মাস। কিন্তু মনের জোরে আইপিএলে কামব্যাক করেন শ্রেয়স। আজ কিংবদন্তি সুনীল গাভাসকরের হাত থেকে পেলেন কাঙ্ক্ষিত টেস্ট ক্যাপ। দিল্লি ক্যাপিটালস কোচ রিকি পন্টিং শ্রেয়সকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন, কঠোর পরিশ্রমেরই পুরস্কার এই টেস্ট অভিষেক। রাহুল দ্রাবিড় যে বছর দিল্লি ডেয়ারডেভিলসের মেন্টর হন সে বছর আইপিএলে ভালো যায়নি শ্রেয়সের। তবে ভারতীয় 'এ' দলের হয়ে খেলার সময়ই রাহুল দ্রাবিড়ের আস্থা অর্জন করেন। সেই দ্রাবিড়ের কোচিংয়েই ভারতীয় দলে শ্রেয়সের টেস্ট অভিষেক।












Click it and Unblock the Notifications