বিশ্বকাপ ক্রিকেটে হঠাৎ সেনার প্রতীক নিয়ে মাঠে নামার কী প্রয়োজন ছিল ধোনির?
এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারতের প্রথম ম্যাচের পারফরম্যান্স নিয়ে বিশেষ কোনও সমালোচনার স্থান নেই। মোটামুটি কর্তৃত্বের সঙ্গেই প্রোটিয়াদের হারায় বিরাট কোহলির দল, ৬ উইকেটে।
এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারতের প্রথম ম্যাচের পারফরম্যান্স নিয়ে বিশেষ কোনও সমালোচনার স্থান নেই। মোটামুটি কর্তৃত্বের সঙ্গেই প্রোটিয়াদের হারায় বিরাট কোহলির দল, ৬ উইকেটে। সেঞ্চুরি করে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হন রোহিত শর্মা।
কিন্তু ২২ গজের পারফরম্যান্সে নয়, বিতর্ক দেখা দেয় উইকেটরক্ষক মহেন্দ্র সিং ধোনির গ্লাভস নিয়ে। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে যে সবুজ রঙের গ্লাভস পরে কিপিং করেছেন, তাতে ভারতের প্যারা স্পেশ্যাল ফোর্সেস-এর
প্রতীক চিহ্ন অঙ্কিত থাকাতে আপত্তি তোলে আইসিসি; বলে কোনওরকম ধর্মীয় বা বাণিজ্যিক অর্থবহ কোনও প্রতীক পরে মাঠে নামা যাবে না। তবে ধোনির সমর্থনে মুখ খুলেছে আপামর ভারতীয় ফ্যান; এমনকি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড চালায় যে কমিটি অফ এডমিনিস্ট্রেটর্স -- তার মুখ্য বিনোদ রাই-ও বলেছেন যে ধোনি ভুল কিছু করেননি।

টেকনিক্যালি ধোনি ভুল নন, কিন্তু ওই দস্তানা না পড়লে কিছু ক্ষতি হত না দেশপ্রেমের
টেকনিক্যালি ধোনি অবশ্যই ভুল কিছু করেননি। সেনা-সম্পর্কিত কিছু ধর্মীয় বা বাণিজ্যিক নয় কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ধোনির ওই বিশেষ দস্তানা পরে মাঠে নামার প্রয়োজনটাই বা কী ছিল?
এর আগেও দেখা গিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটারদের মাথায় সেনাবাহিনীর ধরনের টুপি পরে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে একদিনের ম্যাচ খেলতে। গত মার্চে ধোনিরই বড় রাঁচিতে সেই বিশেষ টুপি পরে মাঠে নামেন কোহলির দলের সদস্যরা, উদ্দেশ্য ছিল ফেব্রুয়ারিতে জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামাতে জঙ্গিহানায় মৃত চল্লিশ জনেরও বেশি আধাসেনার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। সেবারেও পাকিস্তানের তরফ থেকে এই নিয়ে ওজর-আপত্তি ওঠে, আইসিসি-র কাছে নালিশও জানায় তারা। আর এবারেও ধোনিকে এবং তাঁকে সমর্থন জানানো মিডিয়াকে একহাত নিয়েছেন পাকিস্তানের এক শীর্ষ মন্ত্রী। বলেছেন, ইংল্যান্ডে ধোনির কাজ ক্রিকেটে খেলা, মহাভারত বাধানো নয়।

কোথায় সূক্ষ সীমা টানতে হয়, সেই বোধটা থাকা দরকার
ক্রিকেট খেলার মধ্যে হঠাৎ সেনার প্রতীক নিয়ে অবতারণার কারণ বোধগম্য হয় না। হতে পারে, ধোনিকে সেনার তরফ থেকে সাম্মানিক পদ দেওয়া হয়েছে তাঁর
খেলোয়াড়ি জীবনের নানা কৃতিত্বের কারণে, কিন্তু তাই বলে তাঁকে সেনার প্রতীক লাগিয়ে মাঠে নামতে হবে কেন? দেশাত্মবোধ ভালো কিন্তু দেশাত্মবোধের সূক্ষ সীমানা কোথায় টানা দরকার, সেই বোধ না থাকাটা বিশেষ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়।
ধোনির আগে বিশ্বকাপে কম বড় খেলোয়াড় খেলেননি। তিনি নিজেও এই প্রথম বিশ্বকাপ খেলছেন, তাও নয়। যদি কোনও কমবয়সী খেলোয়াড় প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে এসে আবেগঘন হয়ে পরে এই কাজ করত, তাহলেও না হয় বোঝা যেত, কিন্তু ধোনি বিশ্বকাপের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিযোগিতার মাঝে এমন একটা কান্ড করে দলের মনোসংযোগে বিচ্যুতি ঘটাচ্ছেন কেন?

অতি-জাতীয়তাবাদের সুড়সুড়ি এখন সর্বত্র
আসলে শুধু রাজনীতি নয়, এদেশে মানুষের জীবনের সর্বক্ষেত্রেই এক অতি-জাতীয়তাবাদের রমরমা চলছে। ধোনি যদি প্রতীকের ছবি দেওয়া বিশেষ দস্তানা পরে সাউদাম্পটনের মাঠে না নামতেন, তাহলে কি তাঁর বা অগুনতি ভারতীয় মানুষের মনে সেনার প্রতি শ্রদ্ধা কমে যেত? নিশ্চই নয়। তবে তাহলে তাঁর এই বিতর্কের জন্ম দেওয়ার অর্থ কী? তবে কি বুঝতে হবে যে সেই দিন এসেছে যে আমাদের প্রতিনিয়ত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর স্তুতি গেয়ে যেতে হবে, এমনকি যেখানে প্রয়োজন নেই সেখানেও? একজন রোল মডেল হয়ে কি ধোনি সেই বার্তাই দিলেন? কিন্তু আইসিসি-র নিয়মকানুন যদি এই বিষয়টিকে অনুমোদন না
করে, তবে একজন বর্ষীয়ান খেলোয়াড় হয়ে তিনি তাকে অশ্রদ্ধা কেন করছেন?
বিশেষ দস্তানা পরার পিছনে কী কারণ তা ধোনিই ভালো জানেন কিন্তু বিশ্বকাপ ক্রিকেট মোটেই অন্য কোনও উপায়ে দেশাত্মবোধ জাহির করার জায়গা নয়। ভালো করে খেল, কাপ নিয়ে বাড়ি ফেরো, এই যথেষ্ট। আচমকা সেনার প্রতীক নিয়ে সেখানে আস্ফালন করে কোন কার্যোদ্ধার হবে, তা ভগবানই জানেন। আর এটা যদি শুধুই দেখনদারি হয়, তবে তো সে কাজ আরওই বর্জনযোগ্য।












Click it and Unblock the Notifications