ধোনি ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির নন যে নিম্নমানের আম্পায়ারিং দেখেও চোখে ঠুলি এঁটে থাকবেন
পঁচিশে মার্চের 'ম্যানকাডিং' বিতর্কের পর গত ১১ এপ্রিল জয়পুরের সোয়াই মানসিং স্টেডিয়ামে ফের ঘটল আরেকটি ঘটনা।
পঁচিশে মার্চের 'ম্যানকাডিং' বিতর্কের পর গত ১১ এপ্রিল জয়পুরের সোয়াই মানসিং স্টেডিয়ামে ফের ঘটল আরেকটি ঘটনা। এবারে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে দেখা গেল চেন্নাই সুপার কিংস-এর অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনিকে। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলায় রাজস্থান রয়্যালসের বিরুদ্ধে ১৫২ রান তাড়া করতে নেমে চেন্নাই-এর তখন শেষ ওভার চলছে। দরকার আরও বেশ কিছু রান। রয়্যালসের ইংরেজ ক্রিকেটার বেন স্টোকস-এর একটি বল ব্যাটসম্যানের বুকের উচ্চতায় এলে আম্পায়ার উল্লাস পান্ডে প্রথমে হাত দুলে নো-বল ডেকেও পরে হাত নামিয়ে নেন। আর তাতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে চেন্নাই শিবির। নন-স্ট্রাইকার রবীন্দ্র জাদেজা সোজাসুজি গিয়ে আম্পায়ারদের কাছে এর প্রতিবাদ জানান। ওই সময়ে একটি নো-বল খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারত যে কোনও দিকে। আর তখনই দেখা যায় ধোনি স্বয়ং ডাগ আউট থেকে সোজা মাঠে ঢুকে পড়ে আম্পায়ারদের কাছে চলে গিয়ে জানান নিজের প্রতিবাদ। প্রশ্ন তোলেন নো-বল ডেকেও কেন আম্পায়ার তা নাকচ করলেন?

ধোনির এই আচরণে অনেকেই বিস্মিত হন। কারণ বর্ষীয়ান এই ক্রিকেটারকে অনেকেই ব্যবহারিক দিক দিয়ে আদর্শ মনে করেন; 'ক্যাপ্টেন কুল' বলেও তাঁর সুনাম রয়েছে। কিন্তু জয়পুরে ওই দিন যেভাবে ধোনি সোজা মাঠে গটগট করে ঢুকে পরে আম্পায়ারদের চ্যালেঞ্জ করে বসেন, তাতে অনেকেরই মনে হয়েছে যে তিনি ক্রিকেটের স্বার্থে ঠিক কাজটি করেননি। এরপর অনেকেই এরকম দৃষ্টান্ত তৈরী করতে চাইবে বলে তাঁদের অভিমত।
ধোনির শাস্তি হিসেবে তাঁর ম্যাচ ফি-র ৫০ শতাংশ জরিমানা করার কথা শুনেও মুখ বেঁকিয়েছেন বিষাণ সিং বেদি-র ঠোঁটকাটা প্রাক্তনীরা। "ও তো ছেলেমানুষই শাস্তি," বলেছেন তিনি।
বিষয়টি হচ্ছে, এই বিষয়টিতে ধোনির ব্যবহারের দিকে বেশি নজর দিচ্ছেন মানুষ কারণ তিনি সুপারস্টার, তাঁর ফলোইং বেশি আম্পায়ার উল্লাসের থেকে। কিন্তু ধোনির উপরে অতিরিক্ত মনোনিবেশ করতে গিয়ে অনেকেই একটি মৌলিক ভুল করে ফেলছেন আর তা হল তাঁর ব্যক্তিগত আচার-আচরণ নিয়ে প্রয়োজনাতিরিক্ত চর্চা। সবাই এই বিতর্কে শুধু এটাই ভাবছে: "আহা! ধোনি এটা কী করল? নিজের ইমেজের কথা একবারও ভাবল না?"
ধোনির কাছে ,নিজের 'ক্যাপ্টেন কুল' ইমেজ বাঁচিয়ে রাখা শেষ কথা নয়
সমস্যাটা এখানেই। ধোনি যখন মানসিং স্টেডিয়ামের পিচে গিয়ে আম্পায়ারদের একহাত নিচ্ছেন, তখন তিনি নিজের নিষ্কলঙ্ক ভাবমূর্তি রক্ষা করার জন্যে এতটুকু ভাবিত নন। তিনি তখন ক্রিকেটের একনিষ্ঠ সৈনিক হিসেবে এটা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন যে খেলাটিকে যেন ঠিকভাবে চালনা করা হয় আর সেটা যখন আম্পায়াররা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন বার বার, তখন একজন নেতা হিসেবে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাটা ধোনির অধিকারের মধ্যেই পড়ে। হ্যাঁ, বিশুদ্ধবাদী নিন্দুকেরা বলতেই পারেন যে ধোনি যেভাবে তেড়েফুঁড়ে মতে ঢোকেন সেটা ভালো দেখায়নি। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো যে আজকের দিনে জীবনের সব ক্ষেত্রেই ভিক্টরীয় যুগের মূল্যবোধ বেশ অপ্রতুল এবং বিশেষ করে খেলার মতো একটি ক্ষেত্রে যেখানে জিৎ-হারের উপরে নির্ভর করে অনেক ব্যবসায়িক এবং খেলোয়াড়ি ভবিষ্যৎ, সেখানে শিক্ষানবিশি আম্পায়ারিংকে যে বড়মাপের অধিনায়করা সহজে ছেড়ে কথা বলবেন না, সেটাই স্বাভাবিক। আর মনে রাখতে হবে, ধোনি কাউকে নিজে থেকে কিছু বলেননি বা করেননি;ভুল দেখে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শুধু।
ব্যাপারটার কেন্দ্রবিন্দুতে কোহলি থাকলে হয়তো আমরা এতটা প্রতিক্রিয়া দেখাতাম না
আসলে ধোনির মতো আচরণ যদি বিরাট কোহলি করতেন তাহলে হয়তো অনেকের কাছেই ব্যাপারটা গা-সওয়া লাগতো কেন না মাঠের মধ্যে তাঁর তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং রাগ দেখতে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু ধোনির ক্ষেত্রে আমরা যেন একটু বেশিই ধার্মিক হয়ে পড়েছি; আশা করেছি ক্রিকেটের যুধিষ্ঠির কেন এমন ভঙ্গি করবেন মাঠে? এটা তো তাঁকে সাজে না।
দিনের শেষে ধোনিও একজন ক্রিকেটার যিনি জিততে খেলতে নামেন আর তাই নিম্নমানের কোনও কিছু যা তাঁর জেতার আশায় জল ঢালতে পারে তাঁর চোখে পড়লে তিনি রুখে দাঁড়াবেনই। যদি না দাঁড়ান, তাহলে প্রশ্ন উঠবে তাঁর খেলোয়াড়ি আচরণ নিয়েই।
ধোনিকে নিয়ে প্রচুর শব্দ খরচ করে ফেলেছেন আপামর ক্রিকেটপ্রেমী। এবারে কি তাহলে আম্পায়ারদের প্রতি শক্ত হওয়ার কথা ভাবা যেতে পারে?












Click it and Unblock the Notifications