জম্মু ও কাশ্মীর নয়, গোটা দেশের ছেলে উমরান মালিক! উত্থানের কথা জানিয়ে বললেন গর্বিত পিতা
উমরান মালিক। জন্ম জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগরে। ২২ পূর্ণ করতে চলা এই পেসারের নাম নিয়েই এখন চর্চা চলছে বিশ্ব ক্রিকেটে। মাসখানেকের মধ্যে উত্থান উল্কার গতিতে। সানরাইজার্স হায়দরাবাদ দলের নেট বোলার থেকে দলে আসা, আইপিএল অভিষেক। আইপিএলে তিনটি ম্যাচেই উমরান ঘণ্টায় দেড়শো কিলোমিটারের আশেপাশে টানা বোলিংয়ের ফাঁকে চলতি আইপিএলের দ্রুততম, প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৫৩ কিলোমিটার বেগের বলটি করেছিলেন দেবদত্ত পাড়িক্কলকে। আগুনে পেস এবং ধারাবাহিকতা উমরানকে টি ২০ বিশ্বকাপে ভারতীয় দলের সঙ্গে নেট বোলার হিসেবে থাকার সুযোগ করে দিল।
উল্কার গতিতে উত্থান
গুজ্জর নগরের উমরান সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে শেষ তিনটি ম্যাচ খেলে দেশে ফেরার প্রস্তুতি সারছিলেন। হঠাৎই জানতে পারেন তাঁকে থেকে যেতে হবে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে। ফেরার কথা জানানোর কিছু সময় পর ফের বাড়িতে ফোন করে সুখবরটি জানান উমরান। কয়েক দিন আগেও যিনি ছিলেন সাধারণ ক্রিকেটার, তিনিই এখন ভারতের নেট বোলার! সানরাইজার্সের হয়ে আইপিএল অভিষেকের পর গর্বিত এলাকাবাসী একবারেই দেখিয়ে দিচ্ছেন উমরানের বাড়ি যাওয়ার রাস্তা। স্বাভাবিকভাবেই খুশির আবহ উমরানের বাড়িতে।
ক্রিকেট শয়নে-স্বপনে-জাগরণে
উমরানের বাবা আবদুল রশিদ মালিক স্ত্রী ও দুই কন্যাকে নিয়ে টিভিতে উমরানের খেলা দেখে গর্বিত। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিন-চার বছর বয়স থেকেই উমরানের ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ। শয়নে-স্বপনে-জাগরণে শুধুই ক্রিকেট। ছোটবেলায় স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই মাঠে যেতেন উমরান। মা খেয়ে যেতে বললে উমরানের জবাব ছিল, রাতে খাব, এখন শুধুই ক্রিকেট। ক্রিকেট, ক্রিকেট, ক্রিকেট- উমরানের এই আবেগ আর ইচ্ছাকে সম্মান দিয়ে পাশে থেকেছে পরিবার। উমরানের বাবার সবজি-ফলের দোকান শাহিদি চকে। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই উমরান বলে এসেছেন, আমি দোকান বা চাকরি-বাকরি করব না। ক্রিকেট খেলেই পরিবারের সকলকে গর্বিত করব। পরিবারও উমরানকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে হাঁটতে বাধ্য করেনি। ফলে উমরানের উত্থান তাই স্বাভাবিকভাবেই আবেগপ্রবণ করেছে তাঁর বাবা-মাকে।
স্থানীয় ক্রিকেট খেলে উত্থান
উমরান মালিক ক্লাস টেন ড্রপ আউট। তবে ক্রিকেট নিয়েই এগোতে চেয়েছেন ছোটবেলা থেকে। ১৭ বছর বয়সে তিনি রণধীর সিং মানহাসের নজরে পড়েন। স্থানীয় টেনিস বলের ক্রিকেটে ঘণ্টায় ১৪০-১৪৫ কিলোমিটার বেগে বল করতেন। তাঁর বাবা সে কথা বিশ্বাস করতেন না। পরে অনেকের কাছে শোনেন উমরানের জোরে বোলিং কীভাবে সকলকে বেগ দিচ্ছে। রাতে বেরিয়ে যেতেন স্থানীয় টুর্নামেন্টে খেলতে। সন্দেহের বশে বাবা দুইজনকে পাঠিয়েছিলেন ছেলে কোথায় যায় তা দেখার জন্য। তাঁরা এসে বলেছিলেন ক্রিকেটই খেলেন। রাতে বাবা ঘুমিয়ে পড়লে দিদিদের সঙ্গে কথা বলে চুপিসারে বাড়ি ঢুকতেন। এখন উমরানের ক্রিকেট মাঠে চমকে বুক চওড়া হয়েছে বাবা আবদুলের। তাঁর কথায়, উমরান শুধু জম্মু ও কাশ্মীরের সন্তান নন। দেশের সন্তান। দেশের হয়ে খেলে সকলকে ছেলে গর্বিত করতে পারবেন বলেও নিশ্চিত উমরানের বাবা।
অনুশীলনে ব্যাঘাত
অনূর্ধ্ব ১৯, অনূর্ধ্ব ২৩ দল হয়ে জম্মু ও কাশ্মীরের হয়ে বিজয় হাজারে ও সৈয়দ মুস্তাক আলি টি ২০-তে একটি করে ম্যাচ খেলেছিলেন। তারপর আইপিএল। পেশাদার ক্রিকেট সম্পর্কে ২০১৮ সাল অবধি তেমন ধারণাও ছিল না স্থানীয় ক্রিকেটে নজরকাড়া উমরানের। হার্ড বলে প্র্যাকটিস এড়িয়ে টেনিস বলে ক্রিকেটই বেশি খেলতেন উমরান। ১৭ বছর বয়সে তিনি নজরে পড়েন কোচ রণধীর সিং মানহাসের। রাজন স্যর নামে যিনি পরিচিত। হার্ড বলকে তিনি প্রাধান্য দিলে নাম করতে পারবেন এই বিশ্বাসটা উমরানের মধ্যে তিনিই এনে দেন। এরপর জম্মু ও কাশ্মীরের মেন্টর ইরফান পাঠানের টিপসেও নিজেকে সমৃদ্ধ করেন উমরান। ইরফানের তত্ত্বাবধানে বোলিং অ্যাকশন বদলান। সানরাইজার্সে সুযোগ পাওয়া আবদুল সামাদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ পান। উমরান ২০১৯ সাল থেকে যখন জোরকদমে অনুশীলন শুরু করেছেন, ব্যাঘাত আসে তখনই। ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার ইস্যুতে কাশ্মীরে কারফিউয়ের জেরে বন্ধ থাকে ক্রিকেট অনুশীলন। তারপরও নিজেকে মেলে ধরেছেন উমরান।
আন্তর্জাতিক অভিষেকের অপেক্ষা
উমরানের দিদি শেহজাদ জম্মুর একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তাঁর কথায়, উমরান জোরে বল করতে পারেন ডায়েটের বিষয়ে সচেতন থেকে। উমরানের খাদ্যাভ্যাসের খেয়াল রাখেন তাঁর মা সীমা বেগম। মিষ্টি একেবারেই খান না উমরান। পাঞ্জাবি গান গাইতে ভালোবাসেন, ভালোবাসেন লং ড্রাউভে যেতে। ক্রিকেট খেলেই আই-২০ গাড়ি কিনেছেন উমরান। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে স্রেফ মনের জোরকে সম্বল করে উঠে এসেছেন উমরান। এখনও অনেক পথ চলার বাকি। তবে তাঁর প্রত্যয়ের কারণেই অনেকে উমরানকে লম্বা রেসের ঘোড়া বলে অভিহিত করেন। রাজ্যের হয়ে রঞ্জি ট্রফির ট্রায়াল দেওয়ার ডাক পেয়ে কিছুটা মন খারাপ হয়েছিল উমরানের। তখন তিনি সানরাইজার্সের নেট বোলার! বাবা বলেছিলেন ফিরে আসতেই, কেন না তাঁর বিশ্বাস ছিল উমরান ঠিক উন্নতি করবেন। তারপর মিলল আইপিএলে সুযোগ। এবার নেট বোলার হিসেবে ভারতের বিশ্বকাপ দলে। উমরান পরিবারের আশা, যেভাবে গত এক মাসে উত্থান হয়েছে উমরানের কেরিয়ারের কে বলতে পারে বিশ্বকাপে অভিষেকটাও হবে না? উপরওয়ালার উপর আস্থা রেখে উমরানের পরিবার আশায় যদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই সুযোগ পান উমরান, বেগ দেবেন পাক ব্যাটারদের।
From bowling on pitches filled with potholes to bowling the fastest ball of #IPL2021.
— SunRisers Hyderabad (@SunRisers) October 9, 2021
Tell us a better inspirational story from this year's #IPL, we'll wait.#OrangeArmy #OrangeOrNothing pic.twitter.com/0RWdCahrdF












Click it and Unblock the Notifications