আফগানিস্তান ক্রিকেটে টালমাটাল পরিস্থিতির জন্য দায়ী কি কেবলই তালিবান? কী বলছে ইতিহাস
আফগানিস্তান ক্রিকেটে অস্থিরতার জন্য দায়ী কি কেবল তালিবানরা, কী বলছে পরিসংখ্যান।
আসন্ন টি২০ বিশ্বকাপের জন্য ঘোষিত আফগানিস্তান ক্রিকেট দলের অধিনায়ক পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন রশিদ খান। তারই মধ্যে সে দেশে মহিলা ক্রিকেটের ওপর তালিবানিদের জারি করা নিষেধাজ্ঞা জারি করা নিয়ে বিশ্বে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। প্রত্যাশিত এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে রীতিমতো ক্ষিপ্ত হয়ে আফগান দলের সঙ্গে ক্রিকেট না খেলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ড। এমনই এক টালমাটাল পরিস্থিতিতে আফগানিস্তান ক্রিকেটের ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর জন্য কি কেবলই দায়ী তালিবান? কী বলছে ইতিহাস?
|
রশিদ খানে সিদ্ধান্ত
আফগানিস্তানে বাড়তে থাকা টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই দেশের ১৫ জনের টি২০ বিশ্বকাপগামী দলের অধিনায়ক পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন স্পিনার রশিদ খান। গত বৃহস্পতিবার তাঁর এ সংক্রান্ত এক টুইট ভাইরাল হয়। যেখানে রশিদ লেখেন, আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড এবং নির্বাচন কমিটি অধিনায়ক হওয়ার প্রেক্ষিতে তাঁর সঙ্গে আলোচনা না করেই দল ঘোষণা করেছে। সেই অপমানে জাতীয় দলের হয়ে টি২০ বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছেন আফগান স্পিনার রশিদ। তাঁর পরিবর্তে দলে অভিজ্ঞ মহম্মদ নবিকে জায়গা দেওয়া হয়েছে। যিনি আসন্ন টুর্নামেন্টে আফগানিস্তানের সাফল্য নিয়ে আশাবাদী। তাতে যে রশিদ খানকে নিয়ে বিতর্ক একফোঁটাও লাঘব হয়নি, তা বলাই যায়। বরং রশিদের সিদ্ধান্তে আফগান ক্রিকেটে বড়বড়ে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

মহিলা ক্রিকেট ও অস্ট্রেলিয়া
প্রত্যাশা মতোই ফের ক্ষমতায় বসে মহিলা ক্রিকেটের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তালিবান। তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে আগামী ২৭ নভেম্বর ঘরের মাঠে হোবার্টে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত হতে চলা টেস্ট ম্যাচ দল না নামানোর হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক সংগঠন ও ক্রীড়া সংগঠনের পরামর্শ মতো আফগানদের সঙ্গে ক্রিকেট সংক্রান্ত সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করারও হমকি দিয়ছে স্টিভ স্মিথদের ক্রিকেট বোর্ড। এক বিবৃতি জারি করে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার তরফে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী মহিলা ক্রিকেটের বিস্তার ঘটানো তাদের লক্ষ্য। সেখানে তালিবানিদের আচরণ দুর্ভাগ্যজনক বলে আখ্যা দিয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। এ ব্যাপারে বোর্ডের সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়িয়েছন অস্ট্রেলিয়া টেস্ট দলের অধিনায়ক টিম পেইন। এহেন পরিস্থিতি তৈরি হওয়াটা যে আফগানিস্তান ক্রিকেটের জন্য খুব একটা ভাল বিজ্ঞাপন নয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখ না।

অধিনায়ক নির্বাচন নিয়ে অস্থিরতা
আফগানিস্তান ক্রিকেটে তৈরি হওয়া অস্থিরতার জন্য তালিবানদের ঘাড়ে পুরো দোষ চাপিয়ে দিল ভুল কাজ করা হবে। দলের অধিনায়ক নির্বাচনের মধ্যেই রয়েছে গিয়েছে অনিশ্চিয়তা। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে গুলাবদিন নাইবকে সরিয়ে আফগান ক্রিকেট দলের তিন ফর্ম্যাটের অধিনায়ক রশিদ খানকে নির্বাচন করা হয়েছিল। একই বছরের ডিসেম্বরে রশিদকে সরিয়ে আফগানিস্তান দলের অধিনায়ক আসগার আফগানকে বাছা হয়েছিল। যিনি তার আগে অর্থাৎ ২০১৮ সাল থেকে ২০১৯ সালে এপ্রিল মাস পর্যন্ত এই দলের অধিনায়র ছিলেন। সেই সময় নিয়মভঙ্গের অভিযোগে আসগারকে স্যাক করা হয়েছিল। দ্বিতীয় দফায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত আফগান ক্রিকেট দলের নেতা ছিলেন আসগার। এবারও তাঁকে বাধ্য হয়েই উক্ত দায়িত্ব ছাড়তে হয়। অর্থাৎ গত দুই বছরে পাঁচ বার নেতা বদল হতে দেখেছে আফগানিস্তান ক্রিকেট দল। যা দলের ক্রিকেটীয় পরিবেশ ও ঐক্য টুকরো টুকরো করে ভেঙেছে বলে মনে করেন সে দেশের ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা।

ক্রিকেটে রাজনৈতিক প্রভাব
তালিবানরা আসার পরেই যে আফগানিস্তান ক্রিকেট রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে, এমনটা ভাবলে ভুল হবে। কারণ এই সমস্যা আফগান ক্রিকেট বোর্ডের দীর্ঘদিনের সঙ্গী। বিগত পাঁচ বছরে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে বহুবার দেশের ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তাদের পদে রদবদল ঘটানো হয়েছে। বারবার পরিবর্তন হয়েছে জাতীয় নির্বাচক। দেশকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে স্থায়ী সরকারের প্রয়োজন যতটা, দীর্ঘস্থায়ী ক্রিকেট বোর্ডের প্রশাসকদের কার্যকারিতাও ঠিক একই রকম।

মহিলা ক্রিকেটকে অবহেলা
দুই দশকেরও পরে আফগানিস্তানে ক্ষমতায় আসা তালিবানকেই সে দেশের মহিলা ক্রিকেট শেষ করার প্রধান কালপ্রিট ভাবা হচ্ছে। তবে শুরুটা যে তারা করেনি, তারও ইতিহাস বহন করছে আফগানিস্তান ক্রিকেট। আফগান মহিলাদের ক্রিকেটের প্রতি বোর্ডের অনীহা প্রদর্শনের অভ্যাস বেশ পুরনো। অনেক কষ্টে ২০১০ সালে আফগানিস্তানে মহিলা ক্রিকেট চালু করা সম্ভব হয়েছিল। ৯ বছর বছর সেই উদ্যোগ আইসিসি-র স্বীকৃতি লাভ করেছিল। ইতিমধ্যে ২০১৪ সালে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেলেও আফগান মহিলাদের তাদের ক্রিকেট বোর্ডের তরফে সহযোগিতা মেলেনি বলে জানা যায়। ২০২০ সালে আফগানিস্তান বোর্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন সে দেশের ২৫ জন মহিলা ক্রিকেটার। কিন্তু তালিবানদের প্রত্যাবর্তনে তাঁদের ভবিষ্যতও অন্ধকারে চলে গেল বলা চলে।












Click it and Unblock the Notifications