IPL 2023: ইডেনে প্রেস বক্সের টিকিট ব্ল্যাক! সিস্টেম বদলালেও দোষীদের শাস্তি দিতে হাত কাঁপছে সিএবির?
ইডেনে আইপিএলের লিগ পর্বের শেষ ম্যাচটি শনিবার। লখনউ সুপার জায়ান্টসের বিরুদ্ধে খেলবে কলকাতা নাইট রাইডার্স। তারই মধ্যে জোর চর্চা চলছে ইডেনে প্রেস বক্সের টিকিট ব্ল্যাকের ঘটনা নিয়ে! চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার নজির দেশে কেন, বিদেশেও নেই। বাংলাতেই প্রথম!
টিকিটের কালোবাজারি নতুন ঘটনা নয়। কলকাতা পুলিশের সামনেই বুক ফুলিয়ে টিকিট ব্ল্যাকের কারবার চলে ময়দানের বটতলায়। মাঝেমধ্যে দু-একটা গ্রেফতারি হয়। কিন্তু তাতে কয়েক গুণ বেশি দরে টিকিট বিক্রির কালোবাজারি বন্ধ করতে পারে না পুলিশ। কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর অধরা।

ঠিক তেমনই সিএবি কর্তাদের একাংশ প্রেস বক্সের টিকিট ব্ল্যাক কাণ্ডকে ধামাচাপা দিতে তৎপর কিনা সেই প্রশ্নেরও সদুত্তর মিলছে না। নাহলে একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে খামতি শুধরে সিস্টেম বদল হচ্ছে। কিন্তু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কিনা সে বিষয়টি স্পষ্ট করেনি সিএবি। সন্দেহ বাড়ছে তাতেই।
ঘটনা ৮ মে, কলকাতা নাইট রাইডার্স বনাম পাঞ্জাব কিংস ম্যাচ চলাকালীন। ভরা প্রেস বক্সে ঘটনাটি ঘটে। যেহেতু অন্যায়ের আঙুল উঠছে সাংবাদিকদের দিকেই, তাই ন্যায়-নীতি ভুলে সকলেই চুপ! তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন সাংবাদিকরাও নিয়ম-কানুন, আইনব্যবস্থার ঊর্ধ্বে নন।
দু-জন প্রেস বক্সের টিকিট নিয়ে প্রেস বক্সে ঢুকে নিজেদের সিট খুঁজছিলেন। সন্দেহ হয় কয়েকজন সাংবাদিকের। তাঁরা বিষয়টি সিএবির মিডিয়া ম্যানেজার অরিন্দম বসুর নজরে আনেন। যাঁরা টিকিট নিয়ে ঢুকেছিলেন তাঁরা জানান, এক ক্যামেরাপার্সনের কাছ থেকে ৫০০ টাকা দিয়ে এই টিকিট কিনেছেন।

মজার ব্যাপার হলো, এই টিকিটের উপরেই লেখা থাকে কমপ্লিমেন্টারি, নট ফর সেল! অর্থাৎ এই টিকিট কোনও মূল্যেই বিক্রি হওয়ার কথাই না। প্রথমে একটি বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যম সন্দেহের তালিকায় এলে পরে জানা যায় অপকর্মটি অন্য একটি বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধির। ওই চ্যানেলের এক রিপোর্টারই নাকি ম্যাচ ডে টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন।
সিএবির মিডিয়া ম্যানেজারকে অভিযুক্ত ক্যামেরাপার্সন জানিয়েছেন, তিনি ইডেনের উল্টোদিকে ব্ল্যাকারের কাছ থেকে টিকিট কেনেন এবং তা বিক্রি করেন। অপরাধের মাত্রাটা সহজেই অনুমেয়। কোথায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ঘেরাটোপ। প্রেস বক্স বা ভিআইপি বক্সে তো অবাধে ঢুতে পারতে পারেন কোনও জঙ্গি বা জুয়াড়ি! বিশ্বকাপের আগে যা অস্বস্তির।

বিসিসিআইয়ের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে, আইপিএল চলাকালীন সকলকেই গলায় অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ঝুলিয়ে থাকতে হবে। ফলে কার্ড ছাড়াই দুজন যেভাবে প্রেস বক্স অবধি পৌঁছে গেলেন তাতে গাফিলতির প্রমাণ স্পষ্ট। টিকিট ইস্যু হয়েছে সিএবি মিডিয়া ম্যানেজারের তত্ত্বাবধানে। সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।
যে বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের কর্মীর নাম টিকিট ব্ল্যাকের কাণ্ডে জড়িয়েছে ওই সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টার অন্য চ্যানেলের অ্যাঙ্করকে আইপিএলের কার্ড ছাড়াই প্রেস বক্সে নিয়ে গিয়েছেন বলেও অভিযোগ। নিরাপত্তারক্ষী বাধা দিলেও সিএবির একাংশ ও বিসিসিআইয়ের প্রাক্তন কর্তার হাত মাথায় আছে এমন ইমেজের দাপট দেখান অ্যাঙ্কর-সঙ্গী ওই রিপোর্টার।

বিসিসিআই কোনও ধরনের অপরাধকে আড়াল করে না। ঋদ্ধিমান সাহার অভিযোগের তদন্ত করে বোরিয়া মজুমদারকে নির্বাসিত করেছে। তেমনই সচিন তেন্ডুলকরের শেষ টেস্টের সময় মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়েতে এক ক্যামেরাপার্সন শরদ পাওয়ারের বাইট নেওয়ার সময় নিয়ম ভেঙে ধরা পড়েন। কার্ড কেড়ে সাময়িক ওই চ্যানেলকে ব্যান করেছিল বোর্ড।
সিএবির প্রেস বক্সে ১৪০টি আসন রয়েছে। সেখানে ১৪৫ নম্বর টিকিট কীভাবে বাইরে গেল তা নিয়ে সন্দিহান সিএবি কর্তারাও। সিএবি সভাপতি স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায় প্রশাসক হিসেবে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছেন। প্রেস বক্সের টিকিট ব্ল্যাকের বিষয় সামনে আসতেই তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, ম্যাচ ডে টিকিট দেওয়ার সময় টিকিট নম্বর, ফোন নম্বর লিখে রাখার।

বাইরের কেউ কার্ড ছাড়া যাতে প্রেস বক্সে যেতে না পারেন তা সুনিশ্চিত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আজ থেকে ম্যাচ ডে টিকিট প্রদানের পদ্ধতিতেও বদল আসছে। কেন পুরানো প্রথা তুলে দেওয়া হয় এবং ফের সেই প্রথায় আস্থা? সদুত্তর মেলেনি। বিসিসিআইয়ের দৃষ্টান্ত সামনে রেখে অভিযুক্ত বা তাঁর সংবাদমাধ্যমের বিষয়ে কোনও শাস্তিমূলক পদক্ষেপও হয়নি।
ক্যালকাটা স্পোর্টস জার্নালিস্ট ক্লাবের সভাপতি শুভেন রাহা ওয়ানইন্ডিয়াকে বলেন, এই অভিযোগের কথা শুনেছি। এটা সত্যি হলে তা চরম লজ্জার। প্রেস বক্সের টিকিট কীভাবে বাইরে চলে যায়! গোটা ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা উচিত সিএবির। একইসঙ্গে কাউকে প্রমাণ ছাড়া সন্দেহ করাটাও ঠিক নয়। আশা করি, সিএবি যথোপযুক্ত পদক্ষেপ করবে।

সিএবির অন্দরমহলের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের প্রশ্ন থাকছে মিডিয়া ম্যানেজারের ভূমিকা নিয়েও। অভিযোগ, প্রেস বক্সে বা প্রেস কনফারেন্সে কেউ কার্ড ছাড়া থাকলেও তাঁকে কিছু বলেন না মিডিয়া ম্যানেজার। কোনও অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে সক্রিয়তার নিরিখেও দ্বিচারিতা ও স্বজনপোষণের অভিযোগও রয়েছে।
প্রেস বক্সের টিকিট ব্ল্যাক কাণ্ডকে ধাপাচাপা দেওয়ার তৎপরতাও কোনও কোনও মহল থেকে শুরু হয়েছিল বলে সিএবি কর্তাদের একাংশের দাবি। কিন্তু সভাপতির নজরে আসতেই তিনি উপযুক্ত পদক্ষেপ করেন। তবে তদন্ত প্রক্রিয়া ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ সম্পর্কে ধোঁয়াশা রয়েই গিয়েছে। বড় কারও আশীর্বাদের হাত অভিযুক্তর মাথায় থাকা নিয়ে জল্পনা রয়েছে।
সেই কারণেই সিএবি শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করতে পারছে না? সন্দেহ থাকছেই। তবে অনেকেই আবার সেই সন্দেহ দূরে রেখে বলেছেন, স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায় নিশ্চিতভাবেই দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ করবেন। সিএবির অন্দরমহলের খবর, যে চ্যানেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাঁরই এক শীর্ষকর্তা সিএবিতে পদ-প্রত্যাশী ছিলেন। তাই মেপে পা ফেলতে হচ্ছে।
যাতে ওই চ্যানেলের শীর্ষকর্তা ভবিষ্যতে সিএবির বর্তমান ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার তত্ত্ব খাড়া করতে না পারেন। মনে করা হচ্ছে, আইপিএলের লিগ পর্ব শেষ হলেই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করতে পারেন সিএবি সভাপতি। তাঁর প্রতি সিংহভাগ মানুষেরই আস্থা রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরাও চাইছেন দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ।
সিএবিতে বিসিসিআই বা আইপিএলের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বিতরণেও স্বচ্ছতা না থাকার অভিযোগ রয়েছে। বোর্ড অনুমোদিত ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম ছাড়া বাকিদের এই কার্ড দেওয়া হয় না, এটাই রীতি। কিন্তু এমন বহু সংবাদমাধ্যম রয়েছে যারা আদৌ কলকাতার নয়, অস্তিত্ব টিকে শুধু ফেসবুক বা ইউটিউবে। তারা কার্ড পেয়ে গিয়েছে।
দেশের প্রথম সারির ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমকে ব্রাত্য রাখা হয়েছে কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে। আবার অনেকে পেয়েও গিয়েছে। কোনও কোনও নিউজ অ্যাপ, ফেসবুক বা ইউটিউব চ্যানেল নিজেদের ইলেকট্রনিক মিডিয়া দেখে কার্ড পেয়েছে বলে অভিযোগ। গোটা বিষয়টি বিসিসিআইয়ের দিকে ঠেললেও সিএবি-র বেতনভোগী মিডিয়া ম্যানেজার দায় এড়াতে পারেন?

ইডেনে প্রেস বক্সের টিকিট ব্ল্যাক কাণ্ড নিয়ে শোরগোল। সিস্টেমে বদলও আনা হলো। কিন্তু অভিযুক্ত সংবাদমাধ্যমকে কেন বাঁচানোর তৎপরতা চলছে তা বোধগম্য হচ্ছে না কারও। নীতি-নৈতিকতার বিসর্জন এটা যে ভালো দৃষ্টান্ত হচ্ছে না সেটাও মনে করছেন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন অনেকেই।
সিএবির আশ্বাস, গোটা বিষয়টি দেখা হচ্ছে। শাস্তির বিষয়ে অবশ্য সকলেই নীরব! টিকিট ব্ল্যাক কাণ্ডে যেখানে অভিযুক্ত সংবাদমাধ্যম, সেখানে কোন স্বার্থে নীরবতা তা নিয়ে থাকছে প্রশ্ন। সিএবি এই বিষয়ে তদন্ত করলে বা ব্যবস্থা নিয়ে প্রেস বিবৃতি দিলে তা তুলে ধরা হবে ওয়ানইন্ডিয়ায়।
(ছবি- সিএবি ফেসবুক)
আইপিএলের সব খবরের আপডেট, স্কোর, স্ট্যাটিসটিক্স, ছবি, ভিডিও একনজরে












Click it and Unblock the Notifications