IPL 2022: শাহবাজ আহমেদের পিকচার অভি বাকি! হরিয়ানা থেকে আরসিবির যাত্রাপথে বাধাগুলি কাটল কীভাবে?
রাজস্থান রয়্যালস চলতি আইপিএলে প্রথমবার হারের সম্মুখীন হয়েছে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের বিরুদ্ধে। ১১ বলে ৭ রানের ব্যবধানে চার উইকেট হারিয়ে বেকায়দায় পড়া আরসিবিকে জয়ের দিকে নিয়ে যায় দীনেশ কার্তিক ও শাহবাজ আহমেদের জুটি। তাঁরা দুজনে যোগ করেন ৩৩ বলে ৬৭ রান। শাহবাজ দলের হয়ে ২৬ বলে সর্বাধিক ৪৫ রান করেন, চারটি চার ও তিনটি ছয়ের সাহায্যে। কার্তিক ২৩ বলে ৪৪ রানে অপরাজিত থাকেন, আরসিবি জেতে ৪ উইকেটে।
|
পিকচার অভি বাকি
ম্যাচের শেষে সতীর্থ হর্ষল প্যাটেল শাহবাজকে বলেন, আগের ম্যাচে ট্রেলার ছিল, এই ম্যাচে পিকচার দেখা গেল। এরপর নিশ্চয়ই লম্বা পিকচার বাকি রয়েছে? শাহবাজ বলেন, প্র্যাকটিস চালিয়ে যাচ্ছি। সেটা হলে দলের পক্ষেই ভালো। তবে কঠিন পরিস্থিতি থেকে দলের জয় নিশ্চিত করায় অবদান রাখতে পেরে ভালো লাগছে। ঠিক করেছিলাম, স্পিনারদের উইকেট দেব না। শিশির পড়ায় বল ব্যাটে আসছিল, তাই জোরে বোলারদের আক্রমণের রাস্তা বেছে নিই। দীনেশ কার্তিকের ঝোড়ো ব্যাটিং মোমেন্টাম তৈরি করে দেয়। ম্যাচের বয়স বাড়তেই খেলাও ক্রমে সহজ হয়ে যায়। ট্রেন্ট বোল্ট ১৮তম ওভার করতে আসার আগে আরসিবির ৩ ওভারে ২৮ দরকার ছিল। শাহবাজ প্রথম বলে রান পাননি, পরের তিনটি বলে চার, ছয় ও দুই রান নেন, পঞ্চম বলে আউট হন। ট্রেন্ট বোল্ট বাঁহাতি হওয়ায় সুবিধা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন শাহবাজ। বলেছেন, বড় শট নিতেই হতো। সেটা পারায় লক্ষ্যের দিকে আমরা আরও এগিয়ে যাই।

প্রশংসিত শাহবাজ
দলকে জিতিয়ে আসতে না পারার জন্য আক্ষেপ রয়েছে শাহবাজের। হর্ষল প্যাটেল শাহবাজকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছেন, আরও লম্বা ইনিংসের সাক্ষী থাকতে চাই আমরা। বিরাট কোহলিও শাহবাজের ইনিংসের প্রশংসা করেছেন। বাংলার অলরাউন্ডারের প্রশংসা করেছেন অধিনায়ক ফাফ দু প্লেসিও। তিনি বলেন, শাহবাজ বড় শট খেলতে পারদর্শী। বল হাতেও তিনি কার্যকরী ভূমিকা নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। উল্লেখ্য, ২০২০ সালের আইপিএলে ২ ম্যাচে ২টি এবং গত মরশুমে ১১ ম্যাচে ৭টি উইকেট নিয়েছিলেন শাহবাজ। তার মধ্যে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষাতে ১৭তম ওভার করতে এসে প্রথম, দ্বিতীয় ও শেষ বলে যথাক্রমে জনি বেয়ারস্টো, মণীশ পাণ্ডে ও আব্দুল সামাদকে আউট করেছিলেন। ২ ওভারে ৭ রান দিয়ে নেন ৩ উইকেট। বিরাট কোহলির আস্থার পূর্ণ মর্যাদা দিয়েছিলেন। চলতি আইপিএলে পাঞ্জাব কিংস ম্যাচে ৬ রান ও কেকেআর ম্যাচে ১৬ রান দিয়ে উইকেট পাননি। রয়্যালস ম্যাচে বোলিং করেননি। তবে আরসিবি অধিনায়ক যে শাহবাজকে বল করানোর পরিকল্পনা রাখছেন তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
|
দুরন্ত ছন্দে
কলকাতা নাইট রাইডার্স ম্যাচে শাহবাজ তিনটি ছয়ের সাহায্যে ২০ বলে ২৭ রান করেছিলেন। তবে গতকাল চাপের মুখে ওই ইনিংস নিঃসন্দেহে তাঁর কেরিয়ারে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শাহবাজের খেলায় খুশি কলকাতায় তাঁর প্রথম ও একমাত্র ক্লাবের অধিনায়ক ধর্মেন্দ্র সিং। শাহবাজ ২০১৫ সালে কলকাতায় আসেন। হরিয়ানার মেওয়াটে জন্ম শাহবাজের। তবে ২০১৮ সালের নীতি আয়োগের রিপোর্ট বলছে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে হরিয়ানার এই গ্রাম পিছিয়ে থাকা গ্রামগুলির তালিকায় ছিল। ক্রিকেট কেরিয়ার এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ভেবে পালোয়ালে চলে আসেন। গুরগাঁও জেলার হয়ে খেলেন। তবে সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না। প্রমোদ চাণ্ডিলার কাছে কলকাতার ক্লাব ক্রিকেট পরিকাঠামোর কথা শোনেন। এরপর বাবা-মায়ের হাত ধরে মিশন কলকাতা।

তপন মেমোরিয়ালকে ছাড়েননি
কলকাতায় তপন মেমোরিয়ালের দরকার ছিল একজন বাঁহাতি স্পিনার, যিনি ব্যাটিংও করতে পারেন। এই ক্লাবেই খেলা হরিয়ানার এক ক্রিকেটারের মাধ্যমে শাহবাজের ভিডিও দেখে পছন্দ হয় ক্লাবকর্তাদের। ধর্মেন্দ্র সিং তখন দলের অধিনায়ক। তিনি জানিয়েছেন, শ্রীরামপুর কোর্টের কাছে রায়ঘাটে আমার বাড়িতে থেকেই কলকাতায় খেলা শুরু শাহবাজের। তবে পরে যখন বাংলা দলে সুযোগ পান তখন ক্লাবের ক্রিকেট সচিব পার্থপ্রতিম রায়চৌধুরীর বাড়িতে থেকেই প্র্যাকটিসে যেতে হতো। কেন না, বাংলার প্র্যাকটিস হতো সকালে, শ্রীরামপুর থেকে ট্রেনে এসে পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। তবে একটা কথা ভেবে খুব ভালো লাগে, বাংলা দলের সেরা অলরাউন্ডার হওয়ায় বড় ক্লাবের অফার থাকা সত্ত্বেও শাহবাজ তপন মেমোরিয়াল ছাড়েননি। এখনও কোনও ভুলত্রুটি শোধরাতে সতীর্থরা পরামর্শ দিলে মন দিয়ে তা শোনেন। নিজেকে নিখুঁত করতে ফোনও করেন সিনিয়র সতীর্থ ও কোচদের। ধর্মেন্দ্র আরও জানালেন, বড় দলের বিরুদ্ধে ম্যাচ থাকলেই শাহবাজ যে কোনও মূল্যে জয় ছিনিয়ে নিতে চান। ম্যাচ রিডিংও যথেষ্ট ভালো। একটাই কথা, দাদা উনকো হারানা হ্যায়!

কঠিন সময়
শাহবাজের ক্রিকেট কেরিয়ার অবশ্য অন্য খাতে বইতে পারতো। হয়তো ক্রিকেট ছেড়ে তিনি ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার দিকে এগোতেন। শাহবাজের পছন্দের বিষয় ক্যালকুলাস। বাংলার ক্রিকেটে বহিরাগত হিসেবে অভিযুক্ত হয়ে মাস চারেক ক্রিকেটের বাইরে থাকতে হয়েছিল শাহবাজকে। সিএবি তদন্ত কমিটি গড়ার পর অভিযোগ থেকে মুক্তিও পান, ফেরেন ক্রিকেটে। বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেটার ধর্মেন্দ্র সিং জানান, শাহবাজের জন্ম হরিয়ানায়। তবে কেরিয়ার এগিয়ে নিয়ে যেতে তাঁর বাংলায় আসা। আমারও আদি বাড়ি বিহারে। এখানে আমার মতো শাহবাজের আধার কার্ড, ভোটার কার্ড সব রয়েছে। শাহবাজ নিজেও জানিয়েছিলেন, বাংলায় ক্রিকেট খেলার লক্ষ্যপূরণ হয়েছে। তাই ওই খারাপ তথা কঠিন সময়ের অভিজ্ঞতা মাথায় রাখতে চান না। রঞ্জিতে হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিকও রয়েছে। বহুবার বল ও ব্যাট হাতে বাংলার জয়ে ভূমিকা নিয়েছেন। আরসিবিতে বিরাটদের সঙ্গে ড্রেসিংরুম শেয়ারের অভিজ্ঞতায় ভর করে শাহবাজের পরের টার্গেট, জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়া। শাহবাজের সাফল্যে গর্বিত তপন মেমোরিয়াল, সেই সঙ্গে শ্রীরামপুরও।
(ছবি- শাহবাজ আহমেদের ইনস্টাগ্রাম)












Click it and Unblock the Notifications